পেটের টিউমারের চিকিত্সা করাতে গত মাসে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছিলেন সবজি বিক্রেতা তাবেদুল মিয়া। ভর্তির পরই চিকিত্সকরা পরামর্শ দেন সিটিস্ক্যান পরীক্ষার। তাবেদুলের স্ত্রী হাসপাতালের রেডিওলজি বিভাগে গেলে জানানো হল পরীক্ষাটি করাতে ৫ হাজার টাকা ফি লাগবে। সরকারি হাসপাতালে একটি পরীক্ষার মূল্য এত টাকা কেন— প্রশ্নের উত্তর জানার চেষ্টা করেছিলেন তাবেদুলের স্ত্রী। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে উত্তর পাননি। চিকিত্সার খরচ কুলাতে না পেরে হাসপাতাল ছেড়ে স্বামীকে নিয়ে গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হন তিনি। কয়েকদিন পর স্বামী বিনাচিকিত্সায়ই মারা যান।
এত গেল তাবেদুলের কথা। এমন কোনও গরিব রোগী নেই যে সরকারি বা প্রাইভেট হাসপাতালে এসে বিনামূল্যে সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিত্সা করাতে পারছেন। জটিল রোগের চিকিত্সা করাতে হয় জমি-জমা বিক্রি করে নিঃস্ব হচ্ছেন, নয় ধার-দেনার ফাঁদে পড়ছেন। আর যাদের সম্পদ নেই তাদের মরতে হচ্ছে বিনাচিকিত্সায়। কারণ বড় রোগের বড় খরচ জোগাড় করা সম্ভব নয় তাদের পক্ষে। মরণাপন্ন রোগী হলে তো আর কথাই নেই। না পাচ্ছেন সরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে সিট, না পারছেন প্রাইভেট হাসপাতালে লাখ লাখ টাকা খরচ করতে।
দেশের আপামর জনগণের প্রশ্ন— প্রাইভেট হাসপাতালে টাকা ছাড়া চিকিত্সা না হওয়া স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নিলেও সরকারি হাসপাতালে চিকিত্সা করাতে এসে কেন এমন ভাগ্যবরণ করতে হচ্ছে? অবশ্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, তিনি গরিবের স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সরকারি হাসপাতালে দরিদ্র মানুষের যেকোনও বড় রোগের চিকিত্সা যাতে ভালোভাবে করাতে পারেন সেজন্য স্বাস্থ্যবিমা চালু করার উদ্যোগ নেবেন। নাসিম বলেন, গরিব ও মধ্যবিত্তদের শেষ ভরসা সরকারি হাসপাতাল। কিন্তু হাসপাতালের সম্পদের তুলনায় রোগীর চাপ এত বেশি যে চিকিত্সক-নার্স হিমশিম খাচ্ছেন। সব চিকিত্সা বিনামূল্যে দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না।
জানা গেছে, আইসিইউ, হূদরোগ, কিডনি, ক্যান্সার, স্নায়ুরোগ, ফুসফুসের চিকিত্সায় সব থেকে বেশি টাকা লাগছে। সরকারি হাসপাতালগুলোয় প্রায় সব ধরনের অপারেশন বিনামূল্যে করা হলেও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় টাকা লাগছে। বেশিরভাগ ওষুধ কিনতে হচ্ছে বাইরের ফার্মেসি থেকে। রোগীদের কিছু পরীক্ষা বিনামূল্যে করানোর নিয়ম রাখা হলেও তা আদায় করতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে। এর স্বাক্ষর, তো ওর স্বাক্ষর নিতে নিতেই মরিমরি অবস্থা। বিনামূল্যে পরীক্ষার কথা বললে অনেকটা গোস্বা করে বসে থাকেন চিকিত্সক ও টেকনোলজিস্টরা। বিশেষ করে রেডিওলজি, প্যাথলজিসহ বেশ কয়েকটি বিভাগেই এমন দৃশ্য বেশি দেখা যাচ্ছে। কারণ পরীক্ষার আয়ের ২৫ ভাগ পাচ্ছেন ওইসব বিভাগের চিকিত্সক-টেকনোলজিস্ট ও কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাই বিনামূল্যে পরীক্ষা করালে তো তাদের মাথায় হাত পড়বেই। এই অবস্থায় গ্রামের মানুষ এসব ঝামেলা পোহাতে চান না। বাধ্য হয়ে টাকা দিয়েই পরীক্ষা করান। ঝামেলামুক্ত থাকেন। আবার নিরক্ষর গরিব রোগীরা জানতেই পারছেন না বিনামূল্যে পরীক্ষার কথা। সব কিছুই টাকা দিয়ে করান। একসময় গাঁটের টাকা শেষ তো বাড়ি ফিরে মর।
এমনটি ঘটছে জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে চিকিত্সা করাতে আসা রোগীদের কারও কারও ক্ষেত্রে। এখানে দরিদ্র রোগীদের ১০ হাজার টাকায় হার্টের ভাল্ব এবং ৫ হাজার টাকায় রিং দেওয়া হলেও বাইপাসসহ একেকটি অপারেশনে ওষুধ ও আনুষঙ্গিক খরচ পড়ে ৫০ হাজার টাকা। আর ভাল্ব ও রিং কোম্পানির কাছ থেকে কিনতে লাগছে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা। তখন খরচ গিয়ে দাঁড়ায় এক থেকে দুই লাখ টাকায়। গরিব রোগীরা এই খরচ বহন করতে না পেরে বাড়ি ফিরে বিনাচিকিত্সায় মরছেন।
চিকিত্সা ব্যয় বেশি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালেও। এখানে ৫০ ভাগ বেড ফ্রি থাকলেও ৫০০ টাকার বেশি মূল্যের পরীক্ষা করাতে পয়সা দিতে হয়। ফলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতেই সব টাকা শেষ হয়ে যায় গরিব রোগীদের। এমনই একজন রোগী আব্দুল আহাদ। এক সপ্তাহ ঘুরে গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগে ফ্রি বেড পেলেও ইআরসিপি পরীক্ষা করাতে লাগছে সাড়ে ১২ হাজার টাকা। একইভাবে গরিব-ধনী সবারই ৫ হাজার টাকা গুণতে হচ্ছে এমআরআই পরীক্ষায়ও। এ প্রসঙ্গে বিএসএমএমইউ’র নব-নিযুক্ত প্রো-ভিসি অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুল্লাহ সিকদার বলেন, শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও চিকিত্সার মান উন্নত করলেই চলবে না, গরিব রোগীদের বিনামূল্যে চিকিত্সাসেবা দেওয়াও নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়টি সুরাহার চেষ্টা করবেন বলে জানান তিনি।
জানা গেছে, গরিব রোগীদের বিনামূল্যে চিকিত্সা ও অন্যান্য খরচ মেটাতে সরকার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে প্রতি অর্থবছরে ৯ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে। প্রাইভেট হাসপাতালকে শর্ত দেওয়া আছে ৫ ভাগ বেডে গরিব ও দুঃস্থ রোগীকে বিনামূল্যে চিকিত্সা প্রদানের।
দেশের চিকিত্সাব্যবস্থা নিয়ে অসন্তুষ্ট স্বাস্থ্যমন্ত্রী
মহাজোট সরকারের আমলের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী স্বাস্থ্য খাতের ব্যাপক প্রশংসা করে গেলেও বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ঠিক তার উল্টো। তিনি বলেছেন, দেশের চিকিত্সাব্যবস্থা নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট নন। তাই আত্মীয়কে বিদেশে চিকিত্সা করিয়েছেন। ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন ও বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে গতকাল সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। আগামী ৫ এপ্রিল সারা দেশে শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস ৭ এপ্রিল। -
সূত্র - দৈনিক আমাদের সময়

