রাজশাহী জেলা ও মহানগরীর ১৩০টি ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে ১০৫টিই চলছে মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স দিয়ে।
ক্লিনিক মালিকদের অভিযোগ, লাইসেন্স নবায়নের জন্য সংশ্লিষ্টরা যথাসময়ে আবেদন করলেও পরিদর্শন করে সেগুলো নবায়নের ব্যবস্থা করছে না সিভিল সার্জন অফিস।
অন্যদিকে জেলা প্রশাসনের অভিযোগ, সিভিল সার্জন কার্যালয়ের অসহযোগিতার কারণে প্রশাসন অভিযোগ প্রাপ্তির পরও সংশ্লিষ্ট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে না।
তবে রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. শহীদুল ইসলাম বলেন, রাজশাহীতে ১২৫ থেকে ১৩০টি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিদর্শন, দেখভাল এবং পরিচালনায় কোনো সমস্যা হচ্ছে না।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের লাইসেন্স ছাড়াই রাজশাহী মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় গত ৫ বছরে গড়ে উঠেছে অন্তত ২০টি বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। চিকিৎসার নামে এসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিকরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছেন বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
সরকারি নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও লাইসেন্স ছাড়া ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। অভিযোগ উঠেছে, অনেকে শুধু সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনের ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার খুলে বসছেন। মনিটরিং না থাকায় অভিজ্ঞতা ছাড়াই অনেকে এই ব্যবসায় নেমে পড়ছেন।
তবে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, সিভিল সার্জন কার্যালয়ের অসহযোগিতার কারণে তারা চাইলেও যথাসময়ে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেন না।
ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্র জানায়, সম্প্রতি মহানগরীর কয়েকটি ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের যৌথ অভিযানকালে কাশিয়াডাঙ্গার দবিরউদ্দিন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বেহাল অবস্থার বিষয়টি নজরে আসে।
ভ্রাম্যমাণ আদালত সেখানে অব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন অনিয়ম দেখতে পায়। সেটির অনুমোদনের কাগজপত্রও ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ। ১০ শয্যার হাসপাতাল অনুমোদনের বিপরীতে ছোট্ট একটি কক্ষে ৮টি শয্যাসহ ২০টি শয্যা দেখতে পায় ভ্রাম্যমাণ আদালত। অস্ত্রোপচার কক্ষের সার্চলাইটের ১২ বাল্বের ৫টিই ছিল অকেজো। আলো-আঁধারে চলতো অস্ত্রোপচার।
প্রতিষ্ঠানের প্যাথলজির টেকনিশিয়ান হারুন অর রশিদ রক্ত পরীক্ষার রিপোর্টে স্বাক্ষর করেন।
ভ্রাম্যমাণ আদালত জানতে পারে, তিনি (হারুন) মহানগরীর উপশহর এলাকার একটি বেসরকারি হেল্থ ইনস্টিটিউটের ছাত্র। মাত্র তিনজন নার্স দিয়ে চলছিল রোগীর সেবা। প্রতিষ্ঠানের মালিক মেসবাহউদ্দিনের ৩০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে ১৫ দিনের কারাদণ্ডের রায় দেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট আলমগীর কবির। মালিক তাৎক্ষণিক জরিমানার টাকা পরিশোধ করে রক্ষা পান।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, মহানগরীর লক্ষ্মীপুর গ্রেটাররোডে ইবনেসিনা ক্লিনিক স্বাস্থ্য অধিদফতরের লাইসেন্স না নিয়েই সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ৫ বছর থেকে কার্যক্রম চালাচ্ছে।
তবে মালিক সুমন মোল্লার দাবি, তারা লাইসেন্সের জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরে আবেদন করেছেন।
ইবনেসিনার পাশেই দেশ ডায়াগনস্টিক সেন্টার ৫ বছর ধরে চললেও সিভিল সার্জন অফিসের তালিকায় নাম নেই।
কাজীহাটার সুলতান ডায়াগনস্টিক সেন্টারও চলছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের লাইসেন্স ছাড়া। এ প্রতিষ্ঠানের মালিক ডা. সালাম দাবি করেন, তারা শুধুমাত্র আল্ট্রাসোনোগ্রাফ করেন। এর জন্য লাইসেন্স লাগে না।
সিভিল সার্জন অফিসের রেজিস্ট্রেশন তালিকার বাইরে মহানগরীতে এমন অনেক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে।
এর মধ্যে মহানগরীর লক্ষ্মীপুরে মা প্যাথলজি, প্লাজমা ডায়াগনস্টিক, সেবা ডায়াগনস্টিক, ডক্টরস ক্লিনিক, প্রগতি প্যাথলজি, যমুনা ক্লিনিক, সেবা ডায়াগনস্টিক, লাইফ গার্ড ডায়াগনস্টিক, জনস্বাস্থ্য ক্লিনিকসহ ৩০টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে বলে জানা গেছে।
এসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসার আড়ালে প্রতারণার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ভুক্তভোগীরা জানান, প্যাথলজি বিভাগে যন্ত্রপাতির অভাব, প্রয়োজনের তুলনায় নার্সের স্বল্পতা ও ভুল রিপোর্ট দিয়ে প্রতারণা করা হয়। অনেক চিকিৎসক ছুটি ছাড়াই কর্মস্থল ছেড়ে এসব প্রতিষ্ঠানে রোগী দেখেন।
ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে উল্লেখিত ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো সম্পর্কে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্রমতে, গত তিন মাসে ভ্রাম্যমাণ আদালত মহানগরীর বিভিন্ন ক্লিনিকে অভিযান চালিয়ে ১১টি ক্লিনিক সিলগালা ও প্রায় ১৫ লাখ টাকা জরিমানা আদায়, ৪ জনকে আটক ও ২ চিকিৎসককে সতর্ক করেছে। তবে সেগুলো আবারো চালুও হয়েছে।
এছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানে ভুয়া চিকিৎসক ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়। এক্ষেত্রে নামীদামী চিকিৎসকদের নামের সিল-প্যাড ব্যবহার করে পরীক্ষার রিপোর্ট দেয়ার অভিযোগও রয়েছে।
গত বছর ১৫ জুলাই ভ্রাম্যমাণ আদালত মহানগরীর লক্ষ্মীপুরের একটি ক্লিনিক থেকে নুরুল ইসলাম জনি ও আবু আহম্মেদ বাপ্পী নামের দুই ভুয়া চিকিৎসককে গ্রেফতার করে। এ ঘটনায় মহানগরীর রাজপাড়া থানায় মামলা হয়।
সরকারি নীতিমালায় একটি ১০ শয্যার ক্লিনিক পরিচালনায় ৩ জন এমবিবিএস ডাক্তার, ৬ জন ডিপ্লোমা নার্স, ৬ জন আয়া এবং ৩ জন সুইপার নিয়োগের বিধান রয়েছে। কিন্তু ক্লিনিক পরিচালনায় সরকারি নীতিমালা অনেক মালিক বিভিন্ন অজুহাতে মানতে চান না।
তবে রাজশাহী ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক এসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুল মান্নান সাংবাদিকদের বলেন, লাইসেন্স নবায়নে মালিকরা যথাসময়ে আবেদন করলেও সিভিল সার্জনের কার্যালয় পরিদর্শন করে না। ফলে মহানগরীর ৩৫টি অনুমোদিত ক্লিনিক ও ৭০টি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বেশিরভাগই চলছে মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স দিয়ে।
সূত্র - risingbd.com

