একজন নারী তাঁর জীবনের বিভিন্ন স্তরে এমন কিছু অস্বস্তিকর সমস্যায় পড়েন, যা নিয়ে কথাই বলতে চান না। লজ্জা পান, বিব্রত বোধ করেন। আবার হয়তো জিইয়ে থাকা এমন কিছু রোগে ভোগেন যা তাঁর জীবনটাকেই দুর্বিষহ করে তোলে।
সম্প্রতি সিঙ্গাপুরের গ্লেনেগেলস হসপিটাল নারীদের এমন কিছু রোগে ও এর চিকিৎসা নিয়ে আয়োজন করেছিল প্রতিষ্ঠানটির ১৬তম সম্মেলন। সম্মেলনের আয়োজকেরা বলছিলেন, ‘উওমেন থ্রু দ্য এজেস’ এ শিরোনামটি তাঁরা বেছে নিয়েছেন দুটি বিষয়কে মাথায় রেখে। জীবনের বিভিন্ন ধাপে নারীরা কী কী শারীরিক সমস্যার মুখে পড়েন, সে বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে। আর দেখা গেছে, এ রোগগুলোতেই যুগে যুগে নারীরা ভুগছেন। এসব রোগের যে সমাধান আছে, না থাকলেও অন্তত ভালো থাকার উপায় আছে, তা বোঝানোই ছিল সেমিনারটির উদ্দেশ্য।
সেমিনারে প্রধাণত ঋতুস্রাব বন্ধের পর নারীরা যেসব রোগে ভোগেন, সেগুলো উঠে এসেছিল। এ রোগগুলোর মধ্যে আছে নারীদের হাড় ক্ষয়ে যাওয়া, মুখে মেছতাসহ নানা রকম দাগ হওয়া, হৃদ্রোগ, হজমে সমস্যা, বিষণ্নতা ও স্তন ক্যানসার।
কিন্তু সবচেয়ে ভীতিকর তথ্য দিয়েছেন হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ জেরেমি চোও ও স্ত্রী-ক্যানসার বিশেষজ্ঞ বার্থা উন। জেরেমি বলেন, অল্পবয়সী এবং সুঠাম দেহের অধিকারী নারীরা হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন না বলে একটা প্রচার আছে। এটা একদম ভিত্তিহীন। ১৯৮৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত পুরুষের তুলনায় হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে নারীদের মৃত্যুর ঘটনা বেশি ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ৩১ জনে একজন স্তন ক্যানসারে ভুগলেও হৃদ্রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন প্রতি তিনজনে একজন। সারা বিশ্বে কমপক্ষে ৯০ শতাংশ নারী হৃদ্রোগ হতে পারে এমন কারণগুলোর একটি বা অন্যটির ঝুঁকিতে আছেন।
অন্যদিকে বার্থা উন বলছেন, খুব দ্রুত নির্ণয় করা গেলে স্তন ক্যানসার হচ্ছে সবচেয়ে ভালোগোছের ক্যানসার। সিঙ্গাপুরে দ্রুত রোগ নির্ণয় হলেও গোটা বিশ্বের চিত্র আলাদা। সবচেয়ে ভীতিকর ব্যাপার হচ্ছে, সব রকম স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরও অল্পবয়সী নারীরা স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন। তাঁর কাছে আসা রোগীদের তালিকায় ১৭ বছরের মেয়েও আছে।
সেমিনারের একপর্যায়ে সম্মেলন পরিচালনা কমিটির অন্যতম চেয়ার ও ইউরোগাইনোকোলজি বিভাগের চিকিৎসক ক্রিস্টোফার চং প্রথম আলোকে বলেন, শ্রীলঙ্কার ডাকসাইটে এক মন্ত্রীর স্ত্রী তাঁর কাছে চিকিৎসা করাতে এসেছিলেন। বেশ কিছু শারীরিক জটিলতা ছিল তাঁর। কিন্তু একটা বিষয় বারবারই চেপে যাচ্ছিলেন। তাঁর হাঁচি-কাশির সঙ্গে প্রস্রাব ঝরত। তিনি জানান উন্নয়নশীল দেশগুলোয় যে নারীরা অনেক সন্তানের জন্ম দেন তাঁদের অনেকেই জীবনভর মুখ বঁুজে এই সমস্যা সয়ে যান।
সেমিনারে চং জানান, ১০ মিনিটের ছোট্ট একটা অস্ত্রোপচার এই রোগ থেকে মুক্তি দিতে পারে। তিনি অস্ত্রোপচারের একটি ভিডিও দেখান। যোনিপথের দুপাশে ছোট্ট দুটি ছিদ্র করে জরায়ু ও মূত্রথলির কাছে একটি পাতলা ফিতার মতো জাল ঢুকিয়ে এই বিরক্তিকর সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। তিনি বলেন, কখনো সন্তান হয়নি, কিন্তু ভারী কাজ করতে হয়, এমন নারীরাও ভুগতে পারেন এই সমস্যায়।
গ্লেনেগেলস হসপিটালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কেলভিন ফ্লোনস বিস্ময়কর যে তথ্যটি জানান তা হলো, উন্নয়নশীল দেশগুলোয় নারীরা যেসব রোগে ভুগছেন তার মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বিষণ্নতা। নারীরা প্রতি মাসে ঋতুস্রাবের আগে, গর্ভকালীন সময়ে, সন্তান জন্ম দেওয়ার পর, ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে ও মেনোপজের সময়ে বিষণ্নতায় ভোগেন। সাইকোথেরাপি বা ওষুধে রোগটি ভালো হয়। ফ্লোনস বলেন, বিষণ্নতায় ভোগা নারীদের এক বা একাধিক শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনেক নারীই জানেন না বিষণ্নতায় ভোগার কারণে তাঁদের নানা শারীরিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সাইকোথেরাপি ও সামান্য কিছু ওষুধেই রোগটি সারতে পারে।
অনেক নারী ত্বকের সৌন্দর্য নিয়ে অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়েন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বক ঔজ্জ্বল্য হারায়, মেছতা বা কালো দাগ পড়ে। গ্লেনেগেলস হসপিটালের চিকিৎসক চ্যান ইয়ন শোয়ে জানিয়েছেন, ত্বক ফরসা করার ক্রিম বা অ্যান্টি এজিং ক্রিম কতটা কার্যকর তা নিয়ে বিতর্ক আছে। অনেক সময় ত্বক ফরসা করার ক্রিম ব্যবহারে চামড়ার উপকারের চেয়ে অপকার হয় বেশি। তিনি নারীদের রোদ এড়িয়ে চলা, ভালো কোনো সানস্ক্রিন নির্দিষ্ট পরিমাণে ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন। রোগ জটিল হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সেমিনারে উত্থাপিত প্রায় সব রোগেরই চিকিৎসা থাকলেও, হাড় ক্ষয়ে যাওয়া বা অস্টিওপোরোসিস রোগ পুরোপুরি সারার কোনো উপায় এখনো আবিষ্কৃত হয়নি বলে জানান চিকিৎসকেরা। এ রোগে হুটহাট যেমন নারী আছাড় খেয়ে পড়তে পারেন, হাড়গোড় ভেঙে যাওযার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। একই হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জন রোল্যান্ড চং বলেন, চিকিৎসকের দেখিয়ে দেওয়া কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করলে, আর হাড় ক্ষয়রোধী ওষুধ খেলে রোগটি নিয়ন্ত্রণে থাকে। এতে করে অন্তত হুটহাট পড়ে যাওয়ার ভয় থাকবে না। ৩৫ বছর বয়সের পর থেকেই নারীদের এ বিষয়ে মনোযোগী হওয়া দরকার বলে তিনি উল্লেখ করেন।
চিকিৎসকেরা নারীদের স্বাস্থ্যের প্রতি মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন গ্লেনেগেলস হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী ভিনসেন্ট চিয়া। উপস্থিত ছিলেন সিঙ্গাপুরসহ আরও বেশ কিছু দেশের চিকিৎসক ও সাংবাদিকেরা।
সূত্র - প্রথম আলো

