শরীরে জ্বালাপোড়া। চিৎকার-আর্তনাদ। স্বজনদের দুর্বিষহ নির্ঘুম রাত। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন হরতালের আগুনে দগ্ধ মানুষ ও তাঁদের স্বজনদের এমন দুর্দশা এখন নিত্যসঙ্গী। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রক্ত কেনা নিয়ে বাড়তি দুশ্চিন্তা। কারণ, রক্ত কিনতে এ হতদরিদ্র মানুষগুলোকে গুনতে হচ্ছে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা।
গতকাল রোববার বার্ন ইউনিটে গেলে ওই দগ্ধ মানুষ ও তাঁদের স্বজনেরা বললেন, এমনিতেই আর্থিক অনটন। অর্থ সাহায্য যা মিলেছে, রক্ত কিনতেই চলে যাচ্ছে তার বেশ কিছু অংশ। আবার পরিশুদ্ধ রক্ত মিলছে কি না, তা নিয়েও সংশয় আছে।
ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিট ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, গত ২৬ অক্টোবর থেকে ২১ নভেম্বর পর্যন্ত হরতালের আগুন, পেট্রলবোমা বা ককটেল বিস্ফোরণে আহত হয়েছেন অন্তত ৮০ জন। তাঁদের মধ্যে ৩০ জন অগ্নিদগ্ধসহ অন্তত ৫০ জন ঢাকা মেডিকেল থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। বর্তমানে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে ১৪ জন অগ্নিদগ্ধ ব্যক্তি ভর্তি আছেন। চিকিৎসকেরা বলছেন, অধিকাংশের শরীরে রক্ত দিতে হয়েছে। ভবিষ্যতেও লাগতে পারে।
বার্ন ইউনিটের চিকিৎসক পার্থ শংকর পাল প্রথম আলোকে বলেন, রক্তে অ্যালবুমিন নামের যে প্রোটিন থাকে, অনেক সময় আগুনে পুড়ে তা বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন হাত-পা ফুলে যাওয়াসহ শারীরিক বিভিন্ন সমস্যা দেখা যায়। এতে জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। এ কারণে অধিকাংশ দগ্ধ ব্যক্তির জন্য সাদা রক্তের (ফ্রেশ ফ্রোজেন প্লাজমা) প্রয়োজন হয়।
৯ নভেম্বর রাতে ময়মনসিংহের জিলা স্কুল মোড়ে মাইক্রোবাসে হরতালকারীদের দেওয়া আগুনে ঝলসে যায় চালক হারুনুর রশিদের শরীর। ১০ নভেম্বর থেকে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন তিনি। গতকাল বার্ন ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, শয্যায় কাত হয়ে ঘুমাচ্ছেন হারুনুর। আর পাশে বসে আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছছিলেন স্ত্রী ফরিদা বেগম।
ফরিদা প্রথম আলোকে বলেন, এ পর্যন্ত হারুনুরের শরীরে আট ব্যাগ সাদা রক্ত দেওয়া হয়েছে। রাজধানীর শান্তিনগরে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের রক্তদানের শাখা থেকে প্রতি ব্যাগ ৮০০ টাকা করে কিনে আনতে হয়েছে তাঁদের।
কাঁদতে কাঁদতে ফরিদা বেগম বলেন, দুই সন্তানের পরিবারের খরচ তো আছেই, মা-ভাইদের জন্যও সিলেটে টাকা পাঠাতেন হারুনুর। কিন্তু তাঁর এ দশায় বন্ধ হয়ে গেছে উপার্জন। ধারদেনা ও অর্থ সাহায্য যা পেয়েছেন, তা-ও ওষুধ ও রক্ত কেনার জন্যই লেগেছে বেশি।
এরই মধ্যে ১২ ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়েছে গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানার পিকআপ ভ্যানের চালক রোকনুজ্জামানের শরীরে। ৩ নভেম্বর রাতে গাজীপুর চৌরাস্তায় পিকআপ ভ্যানে দেওয়া আগুনে পুড়ে যান তিনি। ওই কারখানার কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন থেকে চার ব্যাগ সাদা রক্ত তাঁরা কিনেছেন। বাকি আট ব্যাগ রক্ত দিয়েছেন কারখানার শ্রমিকেরা। কিন্তু ওই রক্তকে সাদায় রূপান্তরের জন্য কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনকে একইভাবে ৮০০ টাকা দিতে হয়েছে। অবশ্য কারখানা কর্তৃপক্ষ এসব খরচ বহন করছে।
৩ নভেম্বর রাতে দাদি রহিমা বেগমের সঙ্গে নেত্রকোনা থেকে উত্তরায় ফুফুর বাসায় বেড়াতে আসার সময় গাজীপুরের জয়দেবপুরে বাসে অগ্নিসংযোগে আহত হয় সুমি। আহত হন রহিমাও। রহিমার রক্ত না লাগলেও সুমির জন্য কিনতে হয়েছে তিন ব্যাগ রক্ত।
রক্ত কেনার সমস্যায় আছেন মিষ্টির দোকানের কারিগর রানা খান। ১১ নভেম্বর রাতে মেহেরপুরে অটোবাইকে দেওয়া আগুনে দগ্ধ হন তাঁর স্ত্রী মুনিয়া বেগম। রানা বলেন, তিন হাজার ২০০ টাকা দিয়ে তিনি এরই মধ্যে কোয়ান্টাম থেকে তিন ব্যাগ সাদা রক্ত কিনেছেন। আরও লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
চিকিৎসক পার্থ শংকর বলেন, বিশেষ প্রক্রিয়ায় লাল রক্ত থেকে সাদা রক্ত তৈরি করার ব্যবস্থা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেই। কোয়ান্টাম ছাড়াও বারডেম হাসপাতালে সাদা রক্ত প্রক্রিয়াজাত করা হয়। লাল রক্ত যে কেউই দিতে পারলেও সাদা রক্তের জন্য ওই দুই জায়গায় ইচ্ছুক ব্যক্তিরা যোগাযোগ করতে পারেন।
কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছা রক্তদান কর্মসূচির সংগঠক খান এ আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘হতদরিদ্র কেউ এসে রক্ত চাইলে আমরা বিনা মূল্যেও দিয়ে থাকি।’
সূত্র - প্রথম আলো

