'আমাকে বাড়ি নিয়ে যাও। সারা দিনেও ডাক্তারের দেখা নাই। কিছু বললেই নার্সদের দুর্ব্যবহার। দেড় মাস ধরে চিকিৎসা নিয়েও ভালো হইনি। এর মধ্যে আশপাশের লোকজন একের পর এক মারা যাচ্ছে। এসব দেখে আর ধৈর্য ধরতে পারছি না। প্রতিদিন এক হাজার টাকা খরচ। এখন বাঁচা-মরা নিয়ে ভাবি না, বাড়ি গিয়ে মরে গেলেও কোনো দুঃখ নাই।' চলমান রাজনৈতিক সহিংসতার আগুনে দগ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন কুমিল্লার অটোরিকশাচালক রুবেল মিয়া এভাবেই নিজের ক্ষোভের কথা বলছিলেন।
গত ২৬ নভেম্বর রুবেল মিয়া (৪৫) দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে দগ্ধ হন। এরপর থেকেই তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় বেডে শুয়ে আছেন রুবেল মিয়া। পাশেই বসা তাঁর স্ত্রী নাসিমা বেগম জানান, সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক রুবেল মিয়া পরিবারের একমাত্র উপার্জক্ষম। তিন ছেলে-মেয়ে নিয়ে অভাবের সংসার তাঁদের। দেড় মাস ধরে হাসপাতালের বিছানায় থাকায় চিকিৎসার খরচসহ সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। আবার চিকিৎসকরা মাঝে মধ্যেই উচ্চমূল্যের ওষুধ লিখে দেন। এগুলোও তাঁদের পক্ষে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই বেঁচে থাকবেন না মরে যাবেন সেটা জানা না থাকলেও অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে রুবেল এখন বাড়ি ফিরতে চান। রুবেলের মতো আরো কয়েকজন রোগীর স্বজনও চিকিৎসাসেবা নিয়ে অভিযোগ করেন।
রোগীর চাপ ও জনবল সংকটে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের চিকিৎসাসেবা ভেঙে পড়েছে। অনেক রোগীই এখন চলে যেতে চায়। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, নানা সীমাবদ্ধতার পরও তারা আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
রুবেল মিয়ার স্ত্রী হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে অভিযোগ করে বলেন, 'দেড় মাসেও আমার স্বামীকে ভালো করে তুলতে পারলেন না ডাক্তাররা। এর মধ্যে পাশের বেডে ১৫ থেকে ১৬ জনকে মরতে দেখে আমরা আরো হতাশ হয়ে পড়েছি। ডাক্তাররা তিনবার অপারেশনের তারিখ দিয়েও অপারেশন করেননি। আমি ধারদেনা করে এতদিন চিকিৎসা চালিয়েছি, এখন আর পারছি না। ' তিনি আরো বলেন, 'আমরা এখানে আর একদিনও থাকতে চাই না। আমার স্বামী যদি বাড়িতে গিয়ে মারা যায় তবে সেটাকে নিয়তি ধরে নিব। এখন চলে যেতে পারলেই বাঁচি।'
হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা নিয়ে নাসিমা বলেন, 'আমার স্বামীর ২৩ ভাগ শরীর পোড়া হলেও তাঁকে ভালো করতে পারলেন না তাঁরা। ঠিকমতো চিকিৎসা করা হলে এত দিনে আমার স্বামী ভালো হয়ে যেত।' আরেক রোগীর সন্তান জানান, তাঁর বাবার পেট ফুলে গেছে কয়েকবার। ডাক্তারকে বারবার জানালেও তাঁরা গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
বার্ন ইউনিটে থেকে সেবা গ্রহণকারী গীতা সেন বলেন, 'এ ইউনিটের সেবায় আমরা পুরোপুরি খুশি হতে পারিনি। সেবার মান আরো বাড়ানো প্রয়োজন। প্রয়োজনীয়সংখ্যক ডাক্তার ও নার্স পাওয়া যায়নি।'
এদিকে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে দাবি করেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান।
সূত্র - দৈনিক কালের কণ্ঠ

