অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে সংসার চালাতেন রহিমা বেগম (৪৪)। মোহামঞ্চদ আবদুল্লাহ (৪৭) চালাতেন রিকশা। পাশাপাশি গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (ভিডিপি) সদস্য হিসেবে সরকারি কাজে অংশ নিতেন তাঁরা। সরকারি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দুজনেই এখন হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন। চিকিৎসা আর সংসার খরচ নিয়ে চিন্তিত ভিডিপির এই দুই সদস্য ও তাঁদের পরিবার।
৫ জানুয়ারি নির্বাচনের দিন হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলা সদরের রায়পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নারী ভোটকেন্দ্রে শৃঙ্খলার দায়িত্বে ছিলেন স্থানীয় যাত্রাপাশা গ্রামের বাসিন্দা ভিডিপির সদস্য রহিমা। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ভোটকেন্দ্র লক্ষ্য করে নির্বাচন প্রতিরোধকারীরা পেট্রলবোমা হামলা চালায়। বোমাটি সরাসরি রহিমার ওপর পড়ে। এতে তাঁর মুখমণ্ডল ও ডান হাতের প্রায় ২৫ শতাংশ ঝলসে যায়।
গতকাল সোমবার হবিগঞ্জ জেলা আধুনিক হাসপাতালে রহিমা জানান, তিনি আরও দু-তিনবার এই দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু এবার এভাবে বিপদে পড়বেন, বুঝতে পারেননি। হাসপাতালে শুয়ে দিন কোনোমতে গেলেও রাতে শুরু হয় যন্ত্রণা। অসহ্য যন্ত্রণায় রাতে ঘুমাতে পারেন না।
রহিমার মেয়ে আমিনা খাতুন জানান, চার ভাইবোন আর মাকে নিয়েই তাঁদের সংসার। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে চলে গেছেন। সেই থেকে তাঁরা অন্যের বাড়িতে আশ্রয়ে আছেন। মায়ের উপার্জনই একমাত্র ভরসা। তিনি অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে সংসার চালান।
আমিনা জানান, তাঁর মা নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করে সরকারি ভাতা পেয়েছেন এক হাজার ৯৫০ টাকা। কিন্তু এখন চিকিৎসা বাবদ খরচ হচ্ছে তার কয়েক গুণ বেশি টাকা।
আবদুল্লাহ নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করেন উপজেলার স্বরূপখানি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে। উপজেলা সদরের নন্দীপাড়া গ্রামে তাঁর বাড়ি। ভোটের দিন ভোর পাঁচটার দিকে নির্বাচন প্রতিরোধকারীরা ওই কেন্দ্রে পেট্রলবোমা হামলা চালায়। এতে গুরুতর আহত হন তিনি। তাঁর মুখমণ্ডল, হাত-পা ও বুকের প্রায় ৪০ শতাংশ পুড়ে গেছে।
আবদুল্লাহকে ঢাকায় পাঠাতে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স বা পরিবহন—কিছুই পাওয়া যায়নি। পরে আনসার ভিডিপির জেলা কমান্ড্যান্টের পক্ষ থেকে ছয় হাজার টাকা দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে এবং একই বিভাগের সহকারী কমান্ড্যান্টের কাছ থেকে আরও তিন হাজার টাকা হাত খরচ দিয়ে তাঁকে ঢাকায় পাঠানো হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকেরা জানান, আবদুল্লাহর বিপদ এখনো কাটেনি। তাঁকে আরও বেশ কিছুদিন চিকিৎসা নিতে হবে। তাঁর ডান চোখের আঘাত গুরুতর।
আবদুল্লার শ্যালক আপন মিয়া জানান, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম তাঁর বোনজামাই। আবদুল্লাহর চার মেয়ে ও তিন ছেলে। রিকশা চালিয়েই সংসার চালান তিনি। পাশাপাশি ভিডিপির সদস্য হিসেবে সরকারি কাজে অংশ নেন।
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর হবিগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের জেলা কমান্ড্যান্ট মো. সিরাজুর রহমান ভুঞা জানান, জেলা প্রশাসক জয়নাল আবেদীনের সহযোগিতায় এই দুই পরিবারকে ১৫ হাজার টাকা করে মোট ৩০ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
সূত্র - প্রথম আলো

