তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ১৮-দলীয় জোট দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছে। নির্বাচনে যায়নি সিপিবিও। তবু রক্ষা পায়নি সাতকানিয়া উপজেলা সিপিবির নেতা ও চিকিৎসক আবদুস সালামের মালিকানাধীন হাসপাতাল।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার কেরানীহাটের শাহ আমানত হাসপাতালে দুবার সশস্ত্র হামলা হয়েছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগের রাতে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা মুহুর্মুহু ককটেল ও পেট্রলবোমা ফাটিয়ে হাসপাতালটি অচল করার চেষ্টা করে। গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারিও অনুরূপ হামলা হয়েছিল এই হাসপাতালটিতে।
হামলার বর্ণনা দিয়ে সিপিবির নেতা ও চিকিৎসক আবদুস সালাম বলেন, ‘ওরা নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর বলে স্লোগান দিয়ে ৪ ডিসেম্বর রাতে সংঘবদ্ধভাবে ককটেল ও পেট্রলবোমা হামলা চালিয়েছে। চিকিৎসক ও রোগী যে যার মতো করে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে প্রাণ বাঁচায়।’
হামলাকারীদের চিনেছেন কি না, জানতে চাইলে সালাম বলেন, ‘ওরা তো এলাকার লোক। তাদের মধ্যে একজন কিশোর ছিল, যার জন্ম আমারই তত্ত্বাবধানে হয়েছিল। ২৮ তারিখের হামলার পর একবার আহত হয়ে সে আমার হাসপাতালে এসেছিল চিকিৎসা নিতে। তখন মাথা নিচু করে ছিল। আমরা তাকে কিছু বলিনি। চিকিৎসা দিয়েছি। আমার কাজ রোগীদের কম খরচে চিকিৎসা দেওয়া।’
হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানে কেন বারবার হামলা হলো, জানতে চাইলে সালাম বলেন, ‘সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় জামায়াত-শিবির ছাড়া আর কেউ থাকতে পারবে না। এটাই তাদের নীতি বলে মনে হচ্ছে। আমি সিপিবি করি (সভাপতি ছিলেন, বর্তমানে উপজেলায় দলের কমিটি নেই)। কিন্তু নির্বাচনে সিপিবি অংশ নেয়নি। তার পরও আমার হাসপাতালে হামলা হয়েছে।’ আবদুস সালাম বলেন, ৪ ডিসেম্বর দিবাগত রাত দেড়টার দিকে জামায়াতের সাবেক সাংসদ শামসুল ইসলামের কাছে ফোন করে তিনি হাসপাতালে হামলার বর্ণনা দেন। তিনি সাংসদকে মুঠোফোনে বলেন, ‘সাতকানিয়া-লোহাগাড়াকে পাকিস্তান বানানোর ক্ষেত্রে আমি সালাম যদি বাধা হয়ে থাকি, তাহলে আপনি যেখানেই যেতে বলবেন, আমি সেখানে চলে যাব। এমপি সাহেব আমার কথা শুনেছেন, কিন্তু কিছু বলেননি।’
এ ব্যাপারে জানতে শামসুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাঁর মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া গেছে। সর্বশেষ হামলার পর স্থানীয় জামায়াত-শিবির এই সিপিবি নেতাকে বাইরে চলে যাওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিল। সালাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মরলে নিজ এলাকায় মরব। এলাকাছাড়া হব কেন?’ শাহ আমানত হাসপাতালে দুই দফার হামলায় অন্তত ১০-১১ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। হাসপাতালে গিয়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ কাচ, নিচতলা ও দোতলায় পেট্রলবোমার দাগ দেখা গেছে। হাসপাতালটি এখন রোগীশূন্য। এই হাসপাতালে পালাক্রমে ১০ জন চিকিৎসক কাজ করতেন।
আট পরিবারের ঘরে আগুন: নির্বাচনের দিন সাতকানিয়ার নলুয়া ইউনিয়নের মরফলা গ্রামের মরিচ্চাপাড়া মৌলভী বাড়ির আটটি ঘর পুড়িয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। এই বাড়ির একজন ছাড়া আর কেউ রাজনীতি করেন না। বাড়ির বাসিন্দা মাওলানা আবুল হাশেম বলেন, ‘আমরা তো কাউকে দেখিনি। তবে যারাই করুক, তাদের ওপর আল্লাহর গজব নাজিল হবে।’ মাওলানা আবুল হাশেমের ভাতিজা আবুল হাসান নলুয়া ইউনিয়ন ৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তিনি বলেন, ‘আমার বাড়ির সবাই আলেম-ওলামা। আমি কেবল রাজনীতি করি। তাই জামায়াত-শিবির এই কাণ্ড ঘটাতে পারে বলে আমাদের আশঙ্কা।’ গত রোববার ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বেঁচে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলেন বাড়ির লোকজন। গাছ আর বাঁশ কেটে ভিটেবাড়িতে রাখা হয়েছে নতুন ঘর তৈরির জন্য।
নির্বাচনী কেন্দ্রে যাওয়ার কারণে সাতকানিয়ার ছদাহা ইউনিয়নের আজিমপুর গ্রামের বাসিন্দা আবদুল আউয়ালের বাড়িটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ঘটনার পর আবদুল আউয়াল এলাকাছাড়া।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান বলেন, ৫ জানুয়ারি জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা আউয়ালের বাড়িতে হানা দিয়ে তাঁর ছেলেকে অপহরণের চেষ্টা করে। আউয়ালের স্ত্রী চার হাজার টাকা দিয়ে ওদের হাত-পা ধরে সেই দফায় রক্ষা পান। কিন্তু রাতেই আউয়ালের বাড়িটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
ছদাহা ইউনিয়নের আজিমপুর গ্রামের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে স্থানীয় লোকজন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই প্রতিবেদককে সেখানে যেতে নিষেধ করেন। তাঁদের আশঙ্কা, সেখানে গেলে নিরাপদে ফেরা সম্ভব নাও হতে পারে। সাতকানিয়া থানার এসআই মো. নাজমুল হক বলেন, ‘২৮ ফেব্রুয়ারির পর ডজন খানেক বার আমরা ছদাহা এলাকায় অভিযান চালাই। প্রতিবারই আমাদের ওপর সশস্ত্র হামলা হয়েছে। জামায়াত-শিবির শত শত ককটেল ও বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো ছাড়াও আমাদের দিকে গুলিবর্ষণ এবং রকেটফ্লেয়ার ছুড়েছে।’ তিনি বলেন, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না নিয়ে কোনো সাংবাদিকের ওই এলাকায় যাওয়া নিরাপদ নয়। পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন জানান, ছদাহার আজিমপুর এলাকায় জামায়াত-শিবিরের চার শতাধিক ক্যাডার চারটি দলে বিভক্ত হয়ে পালাক্রমে পাহারা দিচ্ছে। অচেনা কেউ গেলে তাঁদের জেরার মুখে পড়তে হয়। এসআই মো. নাজমুল হক বলেন, এর পরও পুলিশ অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ধরতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলায় রায় ঘোষণার পর টানা এক সপ্তাহ কক্সবাজারকে চট্টগ্রামসহ সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে জামায়াত-শিবির। ওই সময়ে সাতকানিয়ার ছদাহা ইউনিয়নের হাসমতের দোকান এলাকায় তারা সশস্ত্র অবস্থান নেয়। গত বছরের ৩ মার্চ পুলিশ-বিজিবির সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয় এবং সংগঠনটির তিনজন নিহত হয়। পরে কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দিন নিজের কাছে রাখা বোমা বিস্ফোরণে জামায়াতের আরেক কর্মী নিহত হন এই এলাকায়।
সূত্র - প্রথম আলো

