উৎকণ্ঠার সময়গুলোকে মেডিকেল বুলেটিন যেন বাঁচিয়ে রেখেছে। দিনে কয়েকবার হাসপাতালের পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যমকে জানানো হচ্ছে মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের শারীরিক অবস্থার সর্বশেষ পরিস্থিতি। হাসপাতালের পাশেই নির্ধারিত স্থানে গণমাধ্যমকর্মীরা অবস্থান করছেন উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা নিয়ে। সর্বশেষ খবর হলো, মহানায়িকার অবস্থা এখনো সংকটজনক। গতকাল সোমবার রাত সাড়ে আটটায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত হাসপাতাল সূত্রের শেষ খবর এটাই।
‘মাঝ আকাশে যান্ত্রিক ত্রুটি নিয়ে যাত্রীবোঝাই বিমান ঝোড়ো হাওয়ার কবলে পড়লে পাইলটের যা দশা হয়, এখন আমাদেরও ঠিক সেই অবস্থা।’ হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে এ কথা বলছিলেন একজন চিকিৎসক। প্রচণ্ড ভিড়ে তাঁর নাম জানা যায়নি। তিনি সেই মেডিকেল বোর্ডের সদস্য, যাঁরা কদিন ধরে নাওয়া-খাওয়া ভুলে চিকিৎসার লড়াই জিইয়ে রেখেছেন। তাঁর এই মন্তব্যে আর বুঝতে বাকি রইল না মহানায়িকা ঠিক কোন অবস্থায় আছেন।
কলকাতার আচার্য জগদীশ চন্দ্র বোস রোডের পাশে মিন্টো পার্ক এলাকায় এই বেসরকারি হাসপাতাল। এ নিয়ে মহানায়িকা পঞ্চমবারের মতো এখানে ভর্তি হয়েছেন। এর আগে প্রতিবারই সুস্থ হয়ে ফিরেছিলেন। কিন্তু এ যাত্রায় অবস্থা দিনে দিনে সংকটের গভীরে যাচ্ছে। গতকাল তাঁর এন্ডোট্র্যাকিয়াল টিউব খুলে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক সুব্রত মৈত্র, যিনি সুচিত্রার দীর্ঘদিনের চিকিৎসক। তিনি জানান, শুরু হয়েছে ফিজিওথেরাপি। তবে চিন্তা দূর হওয়ার কোনো কারণ নেই। রক্তে অক্সিজেনের মাত্রার ঘন ঘন ওঠানামা তো আছেই, সঙ্গে ফুসফুসে জমা ফ্লুইড তাঁদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। প্রথম দিকে ফ্লুইড বের করা গেলেও পরে তা বের করতে সমস্যা দেখা দেয়। ওষুধের মাধ্যমে হূৎস্পন্দন ও রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে। রোববার সন্ধ্যা ও গভীর রাতে তাঁর অবস্থার কিছুটা অবনতি হয়। রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যেতে থাকে। হূৎস্পন্দনও বেড়ে যায়। চিকিৎসকদের মতে, এন্ডোট্র্যাকিয়াল টিউব ব্যবহারে সমস্যা হতে পারে। ক্রমাগত এই টিউব ব্যবহারে ফুসফুস ও পাকস্থলীতে সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। সংক্রমণের আশঙ্কায় গতকাল সোমবার মেডিকেল বোর্ডের বৈঠকের পর বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ এন্ডোট্র্যাকিয়াল টিউব খুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকেরা। চিকিৎসক সুব্রত মৈত্র জানান, ওই টিউব খুলে নেওয়ার পর মহানায়িকার ফুসফুসে অক্সিজেনের মাত্রা সন্তোষজনক।
মেডিকেল বোর্ডের প্রধান সুব্রত মৈত্র বলছিলেন, ‘দিনে ২০ ঘণ্টা কাজ করতে হচ্ছে। মহানায়িকাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি অন্য রোগীদেরও দেখতে হচ্ছে। এর মধ্যেই গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলা, মহানায়িকাকে দেখতে আসা ভিআইপিদের অভ্যর্থনা—সবই করতে হচ্ছে। ঘুমানোরও সময় মিলছে না।’
গতকাল সকালে হাসপাতালে যান রাজ্যের বিরোধী দলের নেতা সূর্যকান্ত মিশ্র। তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, তিনি মহানায়িকাকে বিব্রত করতে চাননি। সে কারণে দেখা না করে চিকিৎসক সুব্রত মৈত্রের কাছে শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন। এদিন সকালেই সুব্রত মৈত্রের কাছে ফোনে মহানায়িকার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সন্ধ্যায় এসেছিলেন হাসপাতালে। আগের রাত থেকে ছিলেন মেয়ে মুনমুন সেন। গতকাল পালাক্রমে এসেছিলেন রিয়া ও রাইমা।
সন্ধ্যায় মানুষের ভিড় সামলাতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করতে হয়। সাধারণ মানুষেরে চেয়ে যেন সেখানে সংবাদকর্মীই বেশি। অনেকে দিনের পর দিন আছেন সেখানে। কেউ টানা ৭২ ঘণ্টা জেগে। কেউ কেউ চার দিন বাড়ি যাননি। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ টিকে আছে স্রেফ মুঠোফোনে।
এদিকে হাসপাতালের সব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের গত কয়েক দিনের ধ্যানজ্ঞান আবর্তিত হচ্ছে সুচিত্রাকে ঘিরে। তাঁদের সঙ্গে সুচিত্রার সংকটমুক্তির যুদ্ধে শামিল সেবিকা থেকে শুরু করে হাসপাতালের বিভিন্ন স্তরের কর্মীরা। সুচিত্রার ইচ্ছায় তাঁর পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা তিনজন সেবিকার ছুটি বাতিল হয়েছে ইতিমধ্যে। মহানায়িকা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অন্য কাউকে পাঠানো যাবে না। ওই তিনজনকেই আসতে হবে। সচরাচর অন্য কাউকে তাঁর কেবিনে পাঠায় না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু দু-একবার অন্য লোক পাঠাতেও হয়েছিল। কিন্তু প্রতিবারই অপরিচিত কেউ ঘরে ঢুকলেই তিনি দ্রুত চাদর দিয়ে মুখ ঢেকে নেন।
সূত্র - প্রথম আলো

