দেশে গত পাঁচ বছরের মধ্যে এবার খাদ্য পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক অবস্থায়। দুই মাস ধরেই চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী। সরকারের খাদ্য মজুতও গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। বোরো সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। আমনে তিন লাখ টন লক্ষ্য থাকলেও গতকাল পর্যন্ত এক লাখ টনের সামান্য বেশি চাল সংগ্রহ হয়েছে।
গত বছরের একই সময়ে সরকারি গুদামে খাদ্য মজুত ছিল ১৩ লাখ টনেরও বেশি। আর এখন খাদ্য মজুত নয় লাখ ৪০ হাজার টন। এর মধ্যে চালের মজুত নেমে এসেছে সোয়া ছয় লাখ টনে। বাকি দুই লাখ ৬৮ হাজার টন গম।
খাদ্য মজুত পরিস্থিতি সম্পর্কে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী গতকাল সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, সরকার আমনের তিন লাখ টন লক্ষ্যমাত্রার পুরোটাই পূরণ করবে। বোরোতে এবার ভালো ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে গত পাঁচ বছরের মতো সামনের দিনগুলোতেও খাদ্য নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না।
সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম ও কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির সবচেয়ে উপযুক্ত সময় ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল। এই সময়ে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় অবকাঠামো মেরামত বেশি হয়। ফলে এই সময়ে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির জন্য স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি চাল-গম দরকার হয়।
ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ মাহবুব হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সরকারের খাদ্য মজুত সামনের দিনের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে খাদ্যের মজুত দ্রুত বাড়ানো। তিন বছর ধরে সরকারের সংগ্রহ অভিযান দেরিতে শুরু এবং ধীরগতিতে চলায় কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ফলে ভোক্তা আর কৃষকের স্বার্থের মধ্যে এখন ভারসাম্য আনাই হবে সবচেয়ে জরুরি কাজ।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত বোরো মৌসুমে খাদ্য বিভাগ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ধান-চাল সংগ্রহ করতে পারেনি। ১০ লাখ টন সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নিলেও শেষ পর্যন্ত আট লাখ ৩১ হাজার টন ধান-চাল সংগ্রহ করা হয়। বোরো সংগ্রহে ব্যর্থ হওয়ার পর আমনে তা পুষিয়ে নিতে গত ডিসেম্বর থেকে তিন লাখ টন আমন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছিল তারা। এর মধ্যে মাত্র এক লাখ নয় হাজার টন সংগ্রহ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘সামনের পাঁচ বছরে বাংলাদেশকে খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশে পরিণত করব। কিন্তু বর্তমান মজুত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন এবং এ নিয়ে পরিকল্পনা জানতে চাইলে আইন প্রতিমন্ত্রী থেকে খাদ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া কামরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি মাত্র দায়িত্ব নিয়েছি। এখনই এ ধরনের প্রশ্ন কেন করেন?’
চালের দাম বাড়ছে: সাধারণত সরকারি মজুত কমে গেলে বাজারে চালের দাম বেড়ে যায়। চাল পরিবহনে সমস্যা হলেও দাম বাড়ে। এ দুটি ঘটনা একসঙ্গে ঘটায় দুই মাস ধরেই চালের দাম নিয়মিতভাবে বাড়ছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে গত এক সপ্তাহে প্রতি কেজি চালের দাম এক থেকে দুই টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আর এক মাসের ব্যবধানে চালের দাম ২ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এক বছরে বেড়েছে ১২ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত।
টিসিবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাজারে প্রতি কেজি মোটা চাল ৩৪ থেকে ৩৬ টাকায়, মাঝারি মানের চাল ৪০ থেকে ৪৪ এবং সরু চাল ৪০ থেকে ৫৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। দেশের প্রধান ধান-চালের মোকামগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেখানে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা দরে।
কিন্তু ধান-চালের এই দর বৃদ্ধির সুফল কৃষকের হাতে পৌঁছাচ্ছে না। গত অক্টোবর-নভেম্বরে যে আমন ধান কাটা হয়েছিল, তা-ই এখন পর্যন্ত বাজারে বিক্রি হচ্ছে। আমন কাটার সময়ে প্রতি মণ মোটা চালের ধান বিক্রি হয়েছে ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকায়। ওই সময়ে সরকারি সংগ্রহ ধীরগতিতে হওয়ায় কৃষক কম দামেই ধান বিক্রি করে দেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর ৪৭ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে এক কোটি ৮৯ লাখ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে ১৭ শতাংশ জমিতে অর্থাৎ আট লাখ ২৭ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়ে গেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আশা করছে, এবার লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বোরোর চাষ হবে।
সূত্র - প্রথম আলো

