সরকার দেশের স্বল্প ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য দুটি প্রধান খাদ্যসহায়তা কর্মসূচি প্রায় বন্ধ করে রেখেছে। এর একটি সুলভ মূল্যের কার্ডের (ফেয়ার প্রাইস কার্ড বা এফপিসি) মাধ্যমে সহায়তা। অপরটি খোলা বাজারে বিক্রি বা ওএমএস।
এর মধ্যে এফপিসির মাধ্যমে প্রায় ৮০ লাখ দরিদ্র মানুষকে খাদ্যসহায়তা দেওয়ার বিষয়টি গত মহাজোট সরকারের একটি বড় সাফল্য ও অর্জন হিসেবে দেখানো হয়। বহুল আলোচিত বিলবোর্ডের মাধ্যমে সরকারি সাফল্য প্রচারেও এ বিষয়টি অন্যতম প্রধান ছিল।
কিন্তু বাস্তবে মহাজোট সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদে মাত্র তিন মাস এই সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তা-ও ৮০ লাখ মানুষকে নয়। এরপর দীর্ঘদিন ধরে এই সহায়তা কর্মসূচি সম্পূর্ণ বন্ধ করে রাখা হয়েছে। সরকারিভাবে বলার চেষ্টা করা হয়, দীর্ঘদিন ধরে বাজারে চালের দাম কম ও স্থিতিশীল থাকায় মানুষ এই কার্ডের মাধ্যমে চাল নিতে আগ্রহী হয়নি। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
যেমন, আমনের এই ভরা মৌসুমেও দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে চালের দাম বেশি এবং বাড়ছে। এ কারণে আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকসহ (আখানি) খাদ্য অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা খাদ্যসহায়তা কর্মসূচি চালু করার জন্য অধিদপ্তরকে চিঠি দিচ্ছেন। খাদ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে সীমিত আকারে চালু রাখা ওএমএসের চাহিদা বাড়ছে। প্রতিদিন সকাল থেকে অনেক দরিদ্র মানুষ লাইন দিয়ে ওএমএসের চালের জন্য অপেক্ষা করে।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আহমদ হোসেন খান প্রথম আলোকে বলেন, চালের দাম আর যেন না বাড়ে, সেই লক্ষ্যে শিগগিরই ওএমএস চালু করার বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে কথাবার্তা হচ্ছে। আর সরকার সিদ্ধান্ত নিলে যেকোনো সময় এফপিসি চালু করার প্রস্তুতি অধিদপ্তরের রয়েছে।
তবে অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য সূত্র জানায়, মূলত সরকারি খাদ্য মজুত প্রয়োজনের তুলনায় কম (বর্তমান মজুত নয় লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন) থাকায় সহায়তা কর্মসূচিগুলো চালু রাখা যায়নি। এখন আবার আমন সংগ্রহ হওয়ায় ওএমএস চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বাজারে দাম বেশি থাকায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে ন্যায্যমূল্যের চালের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। ঢাকায় এখন প্রতিদিন ৬০ ট্রাক চাল ওএমএসের মাধ্যমে বিক্রি করা হচ্ছে। তবে চাহিদা প্রতিদিন ১২০ ট্রাক পর্যন্ত রয়েছে।
একইভাবে এফপিসির মাধ্যমে চাল দেওয়া হলেও একই রকম চাহিদা বলে সূত্রগুলোর ধারণা। কারণ, ওএমএস কিংবা এফপিসির প্রতি কেজি চালের দাম ২৪ টাকা। বর্তমানে বাজারে মোটা চালের কেজি ৩২-৩৩ টাকা। দামে এ রকম ব্যবধান থাকলে সহায়তা কর্মসূচির চালের দাম বাড়ার ঘটনা আগেও দেখা গেছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ‘প্রফেসারিয়াল ফেলো’ আসাদুজ্জামান বলেন, খাদ্যসহায়তা না পেলে অনেক মানুষ আধপেটা খেতে বাধ্য হবে। ফলে তাদের পুষ্টির সমস্যা হবে। কাজ ঠিকমতো করতে পারবে না। আয় আরও কমবে। সরকারের খাদ্য ব্যবস্থাপনায় অনেক দিন ধরেই সমস্যা চলেছে। এদিকে বিশেষ নজর দেওয়া দরকার।
২০০৯ সালের জানুয়ারিতে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসেই তাদের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ভর্তুকিমূল্যে ৮০ লাখ পরিবারকে প্রতি মাসে ২০ কেজি করে খাদ্যসহায়তা প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির সভায় স্বল্প ও সীমিত আয়ের মানুষের মধ্যে কম দামে খাদ্যপণ্য সরবরাহের লক্ষ্যে এফপিসি দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে। সরকারের অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সুবিধাভোগীদের কার্ড প্রাপ্তির বাইরে রাখা হয়।
ইউনিয়ন পর্যায়ে ৬৭ লাখ, জেলা ও মহানগর পর্যায়ে নয় লাখ ৫০ হাজার এবং চতুর্থ শ্রেণীর সরকারি কর্মচারী ও গ্রাম পুলিশের প্রায় তিন লাখ পরিবারকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হয়। প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে এঁদের প্রত্যেকের জন্য সরকারি বিজি প্রেস থেকে কার্ড ছাপিয়ে বিলি করা হয়।
এঁদের মধ্যে খাদ্যসহায়তা বণ্টনের জন্য দেশব্যাপী ১১ হাজার ৩৪ জন ডিলার নিয়োগ করা হয়। তাঁদের প্রত্যেকের কাছ থেকে জামানত বাবদ ২৫ হাজার করে টাকা নেওয়া হয়। দেশের সব ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও মহানগরে দরিদ্রবান্ধব এই কর্মসূচি চালু করা হয়। তবে মাস তিনেক পর হঠাৎ করে এফপিসির কার্যক্রম স্থগিত করে খাদ্য বিভাগ। ওই তিন মাসেও কার্ডধারী সবাইকে খাদ্যসহায়তা দেওয়া হয়নি।
২০১০ সালের ৯ আগস্ট খাদ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক ওই বছরের ১৬ আগস্ট থেকে এফপিসির মাধ্যমে পুনরায় চাল বিক্রির ঘোষণা দিয়ে বলেছিলেন, ভবিষ্যতে এই কর্মসূচি স্থায়ী রূপ পাবে। তবে সেই ঘোষণা বাস্তবায়িত হয়নি। ওই কর্মসূচি স্থায়ী রূপ তো পায়ইনি, বরং আর চালুই হয়নি। ইতিমধ্যে ডিলারদের অনেকেই জামানতের টাকা তুলে নিয়ে গেছেন।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ মাহবুব হোসেন বলেন, মোটা চালের দাম এখন বাড়ছে। এ সময় দরিদ্র মানুষের জন্য ওএমএস দরকার ছিল। তবে সরকারের মজুত অনেক কম। আর ফেয়ার প্রাইস কার্ডের মতো রেশনিং ব্যবস্থায় অনেক অব্যবস্থাপনা হয়। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেও এগুলো ব্যবহূত হয়, দেখানো হয়।
সূত্র - প্রথম আলো

