নিজেদের শরীর ক্ষতবিক্ষত করে ২০ কিশোরের কর্তৃপক্ষের নির্যাতনের প্রতিবাদ করার খবর পত্রিকায় পড়ে অভিভাবকেরা গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে গাজীপুরের টঙ্গীতে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে ছুটে যান। কিন্তু বেলা তিনটার আগে কাউকে কিশোরদের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি।
কেন্দ্রের সূত্র নিশ্চিত করেছে, সেখানে কোনো চিকিৎসক নেই। কিন্তু গতকালও তাদের বাইরে থেকে কোনো চিকিৎসক নিয়ে দেখানো হয়নি। গত মঙ্গলবার রাতে এই কিশোরেরা ধারালো ব্লেডজাতীয় কিছু দিয়ে মাথার তালু থেকে কপাল পর্যন্ত এবং দুই বাহু থেকে কনুইয়ের দিকে লম্বালম্বি কেটে ফেলে। কাটার গভীরতা বেশি হওয়ায় প্রত্যেক কিশোরকে সেলাই দিতে হয়েছে বলে জানান টঙ্গী সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক ও সেবকেরা। তবে গতকাল পর্যন্ত এ বিষয়ে স্থানীয় থানাকে অবহিত করেনি কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ।
কেন্দ্রটিতে বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত ৩০৯ জন কিশোরকে রাখা হয়েছে। বয়স কম বলে তাদের কারাগারে না রেখে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে রাখা হয়। এদের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া ও নিরাপদ হেফাজতের জন্য রাখা আছে ১৪ জন। গতকাল কেন্দ্রটি পরিদর্শনে গেছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের একজন সদস্যও।
প্রতিবাদকারী কিশোরেরা দাবি করেছে, কেন্দ্রে তাদের পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হয় না। নানাভাবে নির্যাতন করা হয়। তাদের অভিযোগের আঙুল ছিল কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়কের দিকে।
গতকাল কেন্দ্রটির ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। গাজীপুর জেলা প্রশাসন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে প্রধান করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি করেছে। ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত এ ব্যাপারে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুলও জারি করেছেন।
উদ্বিগ্ন অভিভাবক: ‘পেপারে দেইখা একজনে কইছে, শুইনা পুলারে দেখতে আইছি। সকাল থেইকা বইসা রইছি। তিনটা বাইজা গেল। এখনো দেখা করতে দেয় না।’
২০ কিশোরের একজনের বাবা মো. ইদ্রিস এভাবে প্রথম আলোর কাছে তাঁর অসহায়ত্ব জানালেন। তিনি রাজধানীর শ্যামপুর থানার ফরিদাবাদ থেকে গতকাল সকাল নয়টায় কেন্দ্রে এসেছেন।
বিকেল পৌনে চারটায় সন্তানকে দেখে এসে ইদ্রিস বললেন, ‘আমার ছেলের গর্দানে কাটা। দুই জায়গায় ব্যান্ডেজ করা। ছেলে কইল, “খাওয়া নিয়া ঝগড়া লাগছে। আমাগো খাওয়া-দাওয়ার একটু কষ্ট আরকি।”’
গাজীপুরের শ্রীপুর মাওনা চৌরাস্তা এলাকা থেকে এসেছেন প্রতিবাদী আরেক কিশোরের মা আছিয়া বেগম এবং তার নানি। সকাল থেকে প্রতীক্ষার পর তাঁরাও বিকেল সাড়ে তিনটায় সাক্ষাতের সুযোগ পান। তাঁদেরকে কিশোরদের আবাসিক ভবনে নেওয়া হয়। সন্তানকে দেখে এসে আছিয়া বেগম কেন্দ্রের একজনকে অনুরোধ করেন, ‘আমি এক কেজি বেদানা কিনা দেই, আমার পুলারে নিয়া দেন।’ তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছেলের মাথা ব্যান্ডেজ দিয়ে সম্পূর্ণ মোড়ানো। হাতেও ব্যান্ডেজ করা।’
আছিয়া বেগমের কিশোর ছেলে ডাকাতি ও অস্ত্র মামলার আসামি হিসেবে ১৪ মাস ধরে এখানে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার পুলায় সাংবাদিকগো সাথে কিছু বলবার চায়।’
চাঁদপুরের মতলবের টরকিকান্দা গ্রামের আবদুল হালিম এসেছেন তাঁর ছেলের খবর নিতে। তিনি তখনো জানতেন না, ২০ কিশোরের মধ্যে তাঁর ছেলেও রয়েছে। তিনি বলেন, দুই মাস পূর্বে পুলিশ ছেলেকে বাড়ি থেকে আটক করে। পরে থানায় নিয়ে হরতালে বোমা মামলায় জড়িয়ে এখানে পাঠায়।
রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর এলাকার আবদুল জব্বারের ছেলেকে গত ৩১ জানুয়ারি নিজ বাসা থেকে আটক করা হয়। জব্বারের স্ত্রী বলেন, ‘টাকাই আমার ছেলের জন্য কাল হয়েছে। পুলিশ আমার ছেলেকে আটক করে ১২ লাখ টাকা দাবি করে। দিতে রাজি হই নাই। পরে অস্ত্র মামলা দিয়ে হাজতে দিছে।’
নরসিংদীর ঘোড়াশাল থানার মিয়াপাড়ার মো. শহিদের কিশোর ছেলেও ২১ মাস ধরে এখানে আছে। পলাশ থানার একটি মাদক মামলায় সে গ্রেপ্তার হয়েছে। তবে আহতদের মধ্যে তাঁর ছেলে নেই।
কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া থানার আবদুর রাশেদের ছেলেও ২০ কিশোরের একজন। আবদুর রাশেদ বলেন, ‘প্রায় চার মাস আগে ছেলেকে একটি ডাকাতি মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনা আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। আমার ছেলে নিজে নিজে কেন শরীর কাটবো। ছেলেও কিছু বললো না। কেমন জানি হইয়া যাইতেছে।’
সন্তানদের খবর নিতে এসেছেন নারায়ণগঞ্জের নান্নু বেপারি ও কুমিল্লার রহিমা খাতুন। তাঁরাও পত্রিকার মাধ্যমে ঘটনা জেনেছেন। কিন্তু দেখাব-দেখাচ্ছি বলে তত্ত্বাবধায়ক বেলা সাড়ে তিনটায় অভিভাবকদের সাক্ষাৎ করানো শুরু করেন।
আহত কিশোরদের শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করতে গতকালও কোনো চিকিৎসক আনা হয়নি। কেন্দ্রের একজন কম্পাউন্ডার তাদের দেখভাল করছেন।
থানায় জানানো হয়নি: দুপুর ১২টায় টঙ্গী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইসমাইল হোসেন কেন্দ্র পরিদর্শনে আসেন। তিনি জানান, ঘটনার দেড় দিন গত হলেও কর্তৃপক্ষ থানায় বিষয়টি জানায়নি। পত্রিকায় দেখে এবং গোয়েন্দা মাধ্যমে জেনে তিনি খোঁজ নিতে এসেছেন। তিনি আহত কিশোরদের সঙ্গে কথা বলেন।
ওসি সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুজন কিশোর তত্ত্বাবধায়ক আনোয়ারের মারধরের বিষয়টি আমাকে বলেছে। আহত সব কিশোরের সাথেই দেখা করেছি। কয়েকজন জানিয়েছে, ওরা দীর্ঘদিন পরিবারের সাথে দেখা করার সুযোগ পায় না। অভিভাবকরা সাক্ষাৎ করতে আসলে তাদের সাথেও দুর্ব্যবহার করা হয়। কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক প্যারেড-পিটির সময় মারধর করেন। এসবের প্রতিবাদ করতে নিজেদের শরীর নিজেরা কেটেছে।’
জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি: গাজীপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। বেলা তিনটায় কেন্দ্র পরিদর্শনে আসা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শাহনেওয়াজ দিলরুবা খান বলেন, ‘কিশোররা এখন ভালো আছে। আমি তাদের সব কথা শুনেছি। কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক ও অন্য কর্মকর্তারা কিশোরদের সাথে খারাপ আচরণ করে, এই কথাটা সবাই বলেছে।’ তিনি বলেন, ‘এটা কোনো কারাগার না, কিশোরদের মানসিক উন্নয়ন কেন্দ্র। লঘু সাজাপ্রাপ্ত কিশোরের পাশাপাশি অনেক পিতা-মাতা বিপথগামী সন্তানকে এখানে দিয়ে যান। তবে কিশোররা গতকালের ঘটনায় নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমাও চেয়েছে।’
মানবাধিকার কমিশনের পরিদর্শন: জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, প্রথম আলোয় ‘২০ কিশোরের ভয়ংকর প্রতিবাদ’ শীর্ষক প্রতিবেদন দেখে গতকাল বিকেল চারটায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সার্বক্ষণিক সদস্য এবং কমিশনের শিশু অধিকারবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র পরিদর্শন করেন।
কিশোরেরা কাজী রিয়াজুল হকের কাছে বলেছে, কেন্দ্র সুপার অসদাচরণ করেন। শারীরিকভাবে নির্যাতন করেন। খারাপ ব্যবহার করেন। তাঁর অপমানজনক আচরণের প্রতিবাদেই তারা নিজেদের আহত করেছে।
কমিশন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বলেছে। কিশোরদের অভিযোগের কারণ অনুসন্ধান ও প্রতিকারে স্থানীয় জেলা প্রশাসককে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সাময়িক বরখাস্ত: সমাজসেবা অধিদপ্তর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক এস এম আনোয়ারুল করিমকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব পালন করবেন কেন্দ্রের সাইকিয়াট্রিক সোশ্যাল ওয়ার্কার জিয়াউর রহমান চৌধুরী।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক আইয়ুব হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, অধিদপ্তরের বিভিন্ন কর্মকর্তা কেন্দ্রে অবস্থান করে সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করছেন।
তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ: ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি করে এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি এ বি এম আলতাফ হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত রুলের সঙ্গে এই আদেশ দেন। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নেতৃত্বে ওই কমিটিতে থাকবেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার।
‘২০ কিশোরের ভয়ংকর প্রতিবাদ’ শিরোনামে প্রথম আলোয় ছাপা প্রতিবেদনটি আদালতের নজরে আনেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আসাদুজ্জামান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিত রায়।
আইনজীবীরা জানান, রুলে কেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা রোধে নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না এবং অব্যবস্থাপনা রোধে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। সমাজকল্যাণসচিব, সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার, ওই কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়কসহ বিবাদীদের দুই সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
সূত্র - প্রথম আলো

