ভেজাল খাদ্য, প্রসাধনী, ইলেকট্রনিক পণ্য এবং ওষুধের পর এবার অতি প্রয়োজনীয় জীবন রক্ষাকারী দ্রব্যও ভেজাল ও নকল তৈরি করা হচ্ছে। মানবদেহের অতি প্রয়োজনীয় উপাদান রক্ত, জীবন রক্ষাকারী পানি, অতি প্রয়োজনীয় হেপাটাইটিস-বি'র ওষুধ ও খাবার স্যালাইনে এখন ভেজাল মেশানো হচ্ছে। অতি নিম্নমানের কাঁচামালে তৈরি হচ্ছে হেপাটাইটিস-বি'র ওষুধ। গ্লুকোজ-লবণ মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে নকল খাবার স্যালাইন। পরীক্ষা ছাড়াই মাদকাসক্তদের রক্ত হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোতে বিক্রি হচ্ছে। আর মিনারেল ও ফিল্টার পানির নামে যত্রতত্র এখন বিক্রি হচ্ছে জীবাণুযুক্ত ওয়াসার সরাসরি ট্যাপের পানি। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, মানুষের প্রয়োজনীয়তাকে পুঁজি করে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী এসব দ্রব্যে ভেজাল মেশাচ্ছে। এতে ব্যবহারকারীর জীবন ঝুঁকিতে পড়ছে। একই সঙ্গে তারা নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
রাজধানীর বিভিন্ন ক্লিনিক-হাসপাতালে এখন বিক্রি হচ্ছে পরীক্ষাবিহীন মাদকাসক্তদের রক্ত। ঢাকা মেডিকেল কলেজের কাছে গড়ে ওঠা বেসরকারি ব্লাড ব্যাংকে সম্প্রতি পাওয়া যায় মাদকাসক্ত ও পেশাদার রক্তদাতাদের পরীক্ষাবিহীন রক্ত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে দেখা যায়, এসব ব্লাড ব্যাংকগুলোতে রিপোর্টে চিকিৎসকের স্বাক্ষর জাল করে রক্ত বিক্রি করা হচ্ছে। রক্তের জন্য বাধ্যতামূলক এইডস, হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি, সিফিলিস এবং ম্যালেরিয়ার পরীক্ষা ছাড়াই রক্তের গ্রুপ মিলিয়ে পেশাদার রক্তাদাতা ও মাদকসেবীদের থেকে রক্ত নেওয়া হচ্ছে। দক্ষ টেকনিশিয়ান, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ছাড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ব্লাড ব্যাংক পরিচালিত হচ্ছে।
জানা যায়, মাদকসেবীরা বিভিন্ন ক্লিনিক ও হাসপাতালে মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ টাকার বিনিময়ে রক্ত বিক্রি করছে। আর রোগীরা এ রক্ত কিনছে এক থেকে দেড় হাজার টাকায়। এমনকি স্যালাইন মিশিয়ে এক ব্যাগ রক্ত দুই ব্যাগ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এ এইচ এম আনোয়ার পাশা জানান, মানুষের রক্ত দেওয়ার ভীতি ও অবহেলার কারণে এ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসা বেড়েই চলছে। সম্প্রতি অবৈধ ব্লাড ব্যাংকে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এদিকে অতি অপ্রয়োজনীয় স্যালাইনেও ভেজাল মেশানো হচ্ছে। মিটফোর্ডে বিক্রি হচ্ছে আইসিডিডিআরবির নকল কলেরা স্যালাইন। নোংরা পরিবেশে নিম্নমানের কাঁচামাল দিয়ে আইসিডিডিআরবির নকল প্যাকেটে স্যালাইন তৈরি হচ্ছে। খরচ কমাতে কল-কারখানায় ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থ নিয়ে স্যালাইন তৈরি করা হচ্ছে। এ ছাড়া নিম্নমানের গ্লুকোজের সঙ্গে লবণ মিশিয়ে পুরান ঢাকার বেশকিছু কারখানায় তৈরি হয় খাবার স্যালাইন। সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানির প্যাকেট নকল করে তা তৈরি হয়। কোম্পানির নাম, প্যাকেটের রং, লোগো ও ছবি মিল রাখা হয়। যেমন সোশ্যালের সঙ্গে মিলিয়ে রাখা হয় 'সুপার মার্কেটিং কোম্পানি'। তৈরি হয় টেস্টি স্যালাইনের নামে নকল স্যালাইন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ ও প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীরা যে ওষুধগুলো বিক্রি বেশি সে ওষুধের প্রয়োজনীয় ও নির্দিষ্ট কাঁচামালের পরিবর্তে নিম্নমানের পদার্থ মিশিয়ে আসল ওষুধের প্যাকেট বা নাম দিয়ে নকল ওষুধ তৈরি করছেন। ব্যবসায়ীরা মুনাফালোভী চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগসাজশ করেই এ অপকর্ম করছেন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আনোয়ার পাশা জানান, গরমে খাবার স্যালাইনের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এ সময় ভেজাল স্যালাইন তৈরি বেড়ে যায়। এ ছাড়াও বেসরকারি পর্যায়ে কিছু টিকা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের হেপাটাইটিস-বি ভ্যাকসিন প্রদানের কাজ করে। আর এদেরই হাত হয়ে এখন বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে নকল হেপাটাইটিস-বি ভ্যাকসিন নামক প্রয়োজনীয় ওষুধটি। ২৪ মার্চ বনানীর সফুরা টাওয়ারে ভ্যাকসিন দেওয়ার সময় ঊহমবৎরী-ই নামের নকল ইনজেকশনসহ সরবরাহকারীকে গ্রেফতার করে র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। হেলথ ভিশন নামের একটি কোম্পানি এ কাজে জড়িত ছিল।
ক্যাবের প্রকল্প কর্মকর্তা উদয় চ্যাটার্জি জানান, দুর্বল ওষুধনীতির কারণেই মানহীন ও নকল ওষুধের ব্যবসা বন্ধ করা যাচ্ছে না। বড় ওষুধ কোম্পানিগুলোর ওষুধ নকল করে ছোট ও অনুমোদনহীন কোম্পানি নকল ওষুধ তৈরি করে বাজারে বিক্রি করছে। তবে ভেজালের তালিকা থেকে এখন বাদ যাচ্ছে না তৃষ্ণা নিবারণকারী পানিও। র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে জানা যায়, বোতলজাত ও জারের পানিতে সরাসরি ঢুকানো হচ্ছে দূষিত পানি। এতে আমাশয়, কলেরা, টাইফয়েড, জন্ডিসসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। ওয়াসার লাইন থেকে পানি ভরে মিনারেল ওয়াটার হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী প্রতি জার ফিল্টার পানি অফিস-আদালত, হোটেল ও রেস্টুরেন্টে ২০ থেকে ২৫ টাকায় সরবরাহ করছে। নিয়মানুযায়ী প্রতিটি জার পানি পূর্ণ করার আগে জীবাণুনাশক দিয়ে জীবাণুমুক্ত করার বাধ্যতামূলক হলেও তা হয় না। ২-১টি ছাড়া কারখানাগুলোতে বিশুদ্ধ পানি উৎপাদনের সময় থাকে না কেমিস্ট। শুধুই ছাকনি দিয়ে ছেকে জারে পানি ভরছে। অনেক কারখানার বিএসটিআইয়ের লাইসেন্স নেই। র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আনোয়ার পাশা জানান, ইতোমধ্যে নগরীতে প্রায় ১৫০টি কারখানার বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে। এতে অসাধু ব্যবসায়ীরা নড়েচড়ে বসেছে।
সূত্র - বাংলাদেশ প্রতিদিন

