রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকায় হঠাৎ ডায়রিয়ার প্রকোপ দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন সাত শতাধিক রোগী আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। এদের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ তীব্র ডায়রিয়া বা কলেরার রোগী।
হঠাৎ করে গরম বেড়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতি হয়েছে বলে মনে করছেন আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানীরা। রোগীর চাপ সামলাতে রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত আইসিডিডিআরবি হাসপাতালে তাঁবু টানিয়ে শয্যাসংখ্যা বাড়ানো হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার বেলা একটা পর্যন্ত মহাখালীর আইসিডিডিআরবির হাসপাতালে ৩৩০ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়। বিকেল চারটা পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৩৪ জনে। গত সোমবার ২৪ ঘণ্টায় এই হাসপাতালে ভর্তি হয় ৭১৬ জন। একই দিনে আইসিডিডিআরবির মিরপুরের হাসপাতালে ভর্তি হয় ১৩৪ জন।
আইসিডিডিআরবির ডায়রিয়া বিভাগের প্রধান আজহারুল ইসলাম খান প্রথম আলোকে জানান, ভর্তি হওয়া রোগীদের ৪০ শতাংশ শিশু। রোগীদের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ তীব্র ডায়রিয়া বা কলেরায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আসছে।
হঠাৎ ডায়রিয়ার প্রকোপের কারণে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও পুষ্টিবিদেরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ও খাবারের ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়ার জন্য মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, মানুষকে সঠিক তথ্য দিতে ও সচেতন করতে সরকারের স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোকে এখনই উদ্যোগী হতে হবে।
গতকাল মহাখালীর আইসিডিডিআরবিতে গিয়ে দেখা যায়, রোগীর চাপ সামলাতে হাসপাতালের সামনে তাঁবু টানিয়ে অস্থায়ীভাবে শয্যাসংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। তাঁবুর নিচে জনা পঞ্চাশেক রোগী। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করছে, এ বছর ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়বে। গত বছরের এই সময় রোগীর সংখ্যা এত ছিল না।
রোগীর সংখ্যা বাড়লে তা মোকাবিলারও প্রস্তুতি নিচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তাঁবুতে ইতিমধ্যে ৬০টির মতো শয্যা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া, আরও তাঁবু টানানোর প্রস্তুতি চলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডায়রিয়া পানিবাহিত রোগ। আজহারুল ইসলাম খান বলেন, হঠাৎ গরম বেড়েছে। বাসাবাড়ির পানির উৎস, রাস্তার ও হোটেলের বাসি-পচা ও অপরিষ্কার খাবার থেকে ডায়রিয়া ছড়াচ্ছে।
তাঁবুতে চিকিৎসাধীন যাত্রাবাড়ীর বাদল হাসানের (২০) হাতে স্যালাইনের সুচ লাগানো। গতকাল বেলা ১১টায় তিনি ভর্তি হয়েছেন। তাঁর মা পাশে বসে আছেন। বাদল বললেন, পরশু অনেকবার পাতলা পায়খানা হয়েছে। ভয়ে হাসপাতালে চলে এসেছেন।
মোহাম্মদপুরের নাজমা বেগম সাড়ে তিন বছরের মেয়ে সানজিদাকে গতকাল হাসপাতালে ভর্তি করেছেন। মেয়ের তিনবার পাতলা পায়খানা আর ১০ বার বমি হয়েছিল। মধ্য বাড্ডার বেপারীপাড়া থেকে দেড় বছরের মেয়ে মুক্তামণিকে নিয়ে এসেছেন পারভীন আক্তার। মেয়ের পাতলা পায়খানার সঙ্গে বমি হচ্ছিল বারবার। হাসপাতালে এরা এখন নিরাপদ বোধ করছে।
করণীয়: বিশিষ্ট পুষ্টিবিদ এস কে রায় এ পরিস্থিতিতে মায়েদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ছয় মাসের কম বয়সী শিশুকে এ সময়ে শুধু বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। ছয় থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের বুকের দুধের পাশাপাশি টাটকা পরিপূরক খাবার খাওয়াতে হবে। গরমের সময় ফিডার বা বোতলের দুধের মাধ্যমে শিশুদের বেশি ডায়রিয়া হয়।
এ সময়ে বাসি খাবার, রাস্তার খাবার, বিশেষ করে শরবত, আখের রস না খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এস কে রায় ও আজহারুল ইসলাম খান। তাঁরা বলেছেন, শিশুকে খাওয়ানোর আগে প্রতিবার মাকে হাত পরিষ্কার পানিতে ধুতে হবে, শিশুর হাত ধুইয়ে দিতে হবে।
এ অবস্থায় সরকারকে বিশেষ ভূমিকা নিতে হবে বলে মনে করেন এস কে রায়। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য সরকার দেশব্যাপী ইপিআই কেন্দ্রের মাধ্যমে লিফলেট বিলি করতে পারে। ডায়রিয়া সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার জন্য রেডিও ও টেলিভিশনে সঠিক তথ্য প্রচার করতে হবে। তবে দুজনই বলেছেন, ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে রোগীকে স্যালাইন খাওয়াতে হবে। তাতে কাজ না হলে কোনো ঝুঁকি না নিয়ে রোগীকে হাসপাতালে আনতে হবে।
সূত্র - প্রথম আলো

