বাড়তি অর্থ খরচ হবে জেনেও বিড়ম্বনামুক্ত ভালোমানের চিকিত্সার জন্য বরাবরই রোগীদের পছন্দ প্রাইভেট হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এ ক্ষেত্রে রাজধানীর কিছু প্রতিষ্ঠান কিছুটা আস্থার পরিচয় দিলেও অধিকাংশ হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারই হরহামেশা রোগীদের প্রতারণার মাধ্যমে লুটে নিচ্ছে সর্বস্ব। এ যেন মরণফাঁদ। সুচিকিত্সার পরিবর্তে চলছে অপচিকিত্সা। নিরাময়যোগ্য রোগ-ব্যাধি নিয়ে এসে লাশ হয়ে ঘরে ফেরার আশঙ্কা থাকে এসব হাসপাতালে ভর্তি হলে। এখানেই শেষ নয়। লাশ ঘরে আনতেও কাঁড়ি-কাঁড়ি টাকার বিল পরিশোধ করতে হয় স্বজনদের।
মানহীন এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকরা সরকারি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে সেবার নামে চালাচ্ছেন চিকিত্সা-বাণিজ্য। সবচেয়ে বেশি প্রতারণার শিকার হচ্ছেন গ্রাম থেকে আসা সহজ-সরল মানুষ। তাদের বেশিরভাগই সরকারি হাসপাতালে চিকিত্সার জন্য এসে দালালদের খপ্পরে পড়ে প্রাইভেট হাসপাতালে যাচ্ছেন। শুধু দালালই নয়, এর সঙ্গে সম্পৃক্ত সরকারি হাসপাতালের কিছু অসাধু চিকিত্সক, নার্স ও কর্মচারী। তাদের কেউ কমিশনের বিনিময়ে উল্লিখিত সেবাকেন্দ্রগুলোয় রোগী পাঠাচ্ছেন, আবার কেউ শেয়ারে হাসপাতাল খুলে ব্যবসা করছেন, রোগীও দেখছেন। অনেকটা এক ঢিলে দুই পাখি শিকার।
এসব হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে প্রায়ই রোগীদের ভুল রিপোর্ট দিচ্ছে। অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ ডায়াগনস্টিক টেস্টের ক্ষেত্রেই এমনটি বেশি ঘটছে। টেকনোলজিস্টরাই রোগীর রক্ত পরীক্ষা করে রিপোর্ট দিচ্ছেন। রিপোর্টে স্বাক্ষর দেখানো হচ্ছে বিশেষজ্ঞ প্যাথলজিস্ট চিকিত্সকের। ভুল রিপোর্ট ও অপচিকিত্সার কারণে নীরবেই ঝরে যাচ্ছে অনেক প্রাণ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে প্রাইভেট হাসপাতাল বা ক্লিনিকের সংখ্যা ৩ হাজার ৭৯০টি এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টার ৮ হাজার ৩৮টি। এগুলোর অধিকাংশেরই সেবামান যথাযথ নয়।
আমাদের সময়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নিয়ম অনুসারে হাসপাতালগুলোয় প্রতি রোগীর জন্য ৮০ বর্গফুট জায়গা থাকার কথা থাকলেও নেই। নেই জেনারেটর ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অপারেশন থিয়েটার। বিশেষজ্ঞ সার্জন ছাড়াই অপারেশন চলছে অনেকগুলো হাসপাতালে। রয়েছে চিকিত্সা-সরঞ্জামের সংকট। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে রোগ-ব্যাধি সারানো তো দূরের কথা, উল্টো নতুন রোগ-জীবাণুয় সংক্রমিত হচ্ছেন রোগীরা, চিকিত্সাশেষে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে ফিরছে বাড়ি।
একই অবস্থা ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোরও। অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেই বিশেষজ্ঞ প্যাথলজিস্ট ও রেডিওলজিস্ট, দক্ষ টেকনোলজিস্ট, উন্নত ল্যাবরেটরি। কিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টার এতটাই ঘিঞ্জি এলাকায় অবস্থিত যে, অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত সেখানে পৌঁছতে পারে না। মরণাপন্ন রোগীদের কোলে করে হাসপাতালের ভেতরে নিয়ে যেতে হয়। বেশিরভাগেরই নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। এ রকম অসংখ্য নামসর্বস্ব হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার ছড়িয়ে আছে তিলোত্তমা ঢাকা মহানগরীর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে, অলি-গলি, পাড়া-মহল্লায়।
মোহাম্মদপুর এলাকার হুমায়ুন রোডের ফেমাস জেনারেল হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার এ ধরনেরই একটি চিকিত্সাকেন্দ্র। সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ বেশ কয়েকটি সরকারি হাসপাতালের কাছাকাছি এর অবস্থান হওয়ায় সহজে রোগী ভাগিয়ে সেখানে নিয়ে যাচ্ছে দালালরা। প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদনের মেয়াদ দীর্ঘদিন আগেই শেষ। এখানে নার্স থাকলেও নেই তাদের ডিপ্লোমা ডিগ্রি। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ। নিম্নমানের অপারেশন থিয়েটার। রয়েছে তীব্র জনবল-সংকট। গত সপ্তাহে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার উপ-পরিচালক স্বপন কুমার তফাদার ফেমাস হাসপাতাল পরিদর্শন করে অব্যবস্থাপনার অভিযোগে হাসপাতালটি বন্ধ রাখতে বলেছেন। কিন্তু গত শুক্রবার রাত ৮টায় আমাদের সময়ের প্রতিবেদক পরিচয় গোপন রেখে হাসপাতালটিতে গিয়ে সীমিত পরিসরে এখনও চিকিত্সা কার্যক্রম চালু থাকতে দেখেছেন।
কলেজগেট-সংলগ্ন আবেদীন হাসপাতালের বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে অপচিকিত্সার। এখন হাসপাতালটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে মালিহা হাসপাতাল। স্বত্বাধিকারীও ভিন্ন। নতুন মালিকানায় চিকিত্সা কার্যক্রম চালুর প্রস্তুতি চলছে। সাইফুল নামে এক ভুয়া এমবিবিএস চিকিত্সক অনেকদিন ধরেই এ হাসপাতালে অপারেশন করছেন। তার হাতে একাধিক রোগীর মৃত্যুর অভিযোগও ছিল। পরে র্যাবের হাতে আটক হওয়ার পর তিনি আর এখানে বসেন না।
অখ্যাত এই হাসপাতালগুলোর মতোই রাজধানীজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এগুলোর মধ্যে কোনওটির অনুমোদন নেই, কোনওটির পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর ও কোনওটির চিকিত্সার মান প্রশ্নবিদ্ধ। মোহাম্মদপুরের ভাইটাল ডায়াগনস্টিক তেমনই একটি। স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ দেখা গেছে একই এলাকার ইউনিক মেডিক্যাল সেন্টারে। নেই দক্ষ ও প্রয়োজনীয় চিকিত্সক-নার্স। রোগীকে বসিয়ে কল করে চিকিত্সক এনে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হচ্ছে। এ প্রতিবেদক রোগী সেজে আল্ট্রাসনোগ্রাম করাতে চাইলে অভ্যর্থনা ডেস্ক থেকে বলা হল, আপনি বসুন। কল করে চিকিত্সক আনতে হবে।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিদর্শক দল প্রতিদিনই অভিযান চালাচ্ছে হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোয়। গত মঙ্গলবার থেকে শেষ রোববার পর্যন্ত ২৬টি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিদর্শন করেছে দলটি। দু-একটি ছাড়া বেশিরভাগেরই সেবা সন্তোষজনক নয় বলে জানান তারা। পরিদর্শন দলসূত্রে জানা যায়, মান যথাযথ নয় বলে নোটিস দেওয়া হচ্ছে মেডিফোর্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ঢাকা ল্যাব, ফেয়ার ল্যাব লিমিটেড, কাশবি জেনারেল হাসপাতাল, হেলথ পয়েন্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টার, নিউ মেডিকম মেডিক্যাল সার্ভিসেস, আলমানার হাসপাতালসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে। এর মধ্যে মেডিফোর্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ল্যাবরেটরি একেবারেই মানসম্মত নয়। বাইরে কোঁচার পত্তন ভেতরে ছুঁচোর কেত্তন মার্কা রাজধানীর কিছু নামি-দামি হাসপাতালের বিরুদ্ধেও অপচিকিত্সার অভিযোগ আছে। এগুলোর শীর্ষে আছে গুলশানে অবস্থিত ইউনাইটেড হাসপাতাল। এত কিছুর পরও ১৯৮২ সালের বেসরকারি চিকিত্সাসেবা অধ্যাদেশ দিয়েই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ডিজিটাল যুগের চিকিত্সা কার্যক্রম। ৩ বছর আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অধ্যাদেশ হালনাগাদকরণের প্রস্তাব পাঠানো হলেও আজও তা আলোর মুখ দেখেনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবদুল হান্নান জানান, কেবল ঢাকা শহরই নয়, অখ্যাত প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে সারা দেশেই। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের নির্দেশে অভিযান শুরু হয়েছে।
সূত্র - দৈনিক আমাদের সময়

