পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের ঘোষণার পর কাজে যোগ দিয়েছেন বারডেমের চিকিৎসকরা। বিকালে তারা কাজে যোগ দিলেও দিনভর কর্মবিরতি পালন করায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় রোগীদের। গতকাল অভিযুক্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদকে প্রত্যাহারের ঘোষণার পর থেকে চিকিৎসকরা কর্মবিরতি প্রত্যাহার করেন। এর আগে ‘আগে গ্রেপ্তার পরে চিকিৎসা’- এ দাবিতে রাস্তায় আন্দোলনে নেমেছিলেন বারডেম হাসপাতালের চিকিৎসকরা। এতে চিকিৎসাসেবা না পেয়ে দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীর স্বজনরা দুর্ভোগের শিকার হন।
এ দিকে গতকাল দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সচিব ডা. দীন মোহাম্মদ, বিএমএ’র সভাপতি মাহমুদ হাসান, ভাইস-প্রেসিডেন্ট প্রফেসর কামরুল আহসান, মহাসচিব ডা. জামিল আহম্মেদ বারডেম পরিচালক এবং আন্দোলনকারী চিকৎসকেরা বারডেম মিলনায়তন ভবনে দীর্ঘ সময় ধরে বৈঠকে বসে আলোচনা করেন। কিন্তু আলোচনায় ফলপ্রসূ কোন অগ্রগতি না হওয়ায় আন্দোলনকারীরা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। এর আগে সকালে সাংবাদিক সম্মেলন করেন বারডেম ভারপ্রাপ্ত নিবন্ধক সালাম মীর। এ সময় তিনি ইনডোর চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম শুরু করার ঘোষণা দেন। তিনি দাবি করেন, চিকিৎসকরা চিকিৎসাসেবা দিতে চান। তারা চান না কোন রোগী দুর্ভোগের শিকার হোক। কিন্তু এ মুহূর্তে চিকিৎসকেরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বিধায় এ পরিস্থিতিতে সঠিকভাবে চিকিৎসা দেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, রোগীর পরিবারের অভিযোগ ভুল চিকিৎসা ও অবহেলা সত্য নয়। মৃত সিরাজুল ইসলাম জটিল রোগে ভুগছিলেন। গত মার্চ মাসে বারডেমে ভর্তি হন। তিনি ৯ই এপ্রিল বমি ও ডায়রিয়া নিয়ে হাসপাতালের অন্য একটি বিভাগে ভর্তি হন। তিনি দাবি করেন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা গেছেন। তাকে বাঁচানোর জন্য চিকিৎসকেরা সব চেষ্টা চালিয়েছেন। সংবাদ সম্মেলন থেকে চিকিৎসকেরা অভিযোগ করেন, দুর্বৃত্তরা চিকিৎসকদের মারধরের সময় পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তারা ছিলেন নীরব দর্শকের ভূমিকায়। তারা কর্তব্যরত পুলিশের বিচার দাবি করেন। এর পরে চিকিৎসকরা দুপুর ১২টা থেকে ১২টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত শাহবাগে সড়ক অবরোধ করে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন। এ দিকে বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসক ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে অপ্রীতিকর ঘটনার সূত্রে গত দু’দিন ধরে অচল ছিল চিকিৎসা কার্যক্রম। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় রাজধানী ও তার আশপাশের জেলা সদর থেকে আসা অসংখ্য রোগী রীতিমতো অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগী ও তার স্বজনরা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় তাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। হাসপাতালে ভর্তি অথচ চিকিৎসা নেই- এমন অনেক রোগী বাধ্য হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরে যাচ্ছেন। গতকাল সরজমিনে বারডেম হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, এক দিকে চলছিল চিকিৎসকদের আন্দোলন, অন্যদিকে রোগী ও তার স্বজনদের ভিড়। ১৬ নম্বর কাউন্টারে নতুন রোগীদের ভর্তি করা হয়। কিন্তু কাউন্টার ছিল ডিউটি শূন্য। ৬২ নম্বর ওয়ার্ডের ৬২৮ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন টঙ্গীর শাহনাজ পারভিন। তার ছেলে বউ স্বপ্না জানান, প্রায় এক মাস ধরে তার শাশুড়ি বারডেমে চিকিৎসাধীন। কিন্তু গত দু’দিন ধরে তার শারীরিক অবস্থা মারাত্মক খারাপ ছিল। কিন্তু একটি বারের জন্য কোন চিকিৎসক তাকে দেখতে আসেনি। ৬২৯ নম্বর বেডে ক্যানসারে আক্রান্ত দক্ষিণ খানের ফাহিমা। তার স্বামী ওহাব জানান, অপারেশন রোগী জানার পরেও চিকিৎসকেরা তার স্ত্রীকে সেবাদান থেকে বিরত থেকেছেন। তিনি বলেন, গতকাল একজন চিকিৎসক তাকে দেখতে আসা মাত্র অপর এক আন্দোলনকারীর জন্য তড়িঘড়ি করে তার স্ত্রীকে সেবা দেয়া হয়। মেডিসিন ওয়ার্ডের ৭২৪ নম্বর বেডের রোগী মোকসেদ আলী (৭৫)। তার ছেলে বউ নাজমা জানান, চিকিৎসাসেবা সঠিকভাবে তারা পাচ্ছেন না। এ জন্য নিজেরাই বাধ্য হয়ে বারডেম ত্যাগ করছেন বলে জানান। বারডেমের ভিআইপি কেবিনে, মোট সিট ১৪টি। সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, ৯টি বেডে রোগী থাকলেও বাকিগুলো শূন্য রয়েছে। তবে রোগীরা জানিয়েছেন, গত দু’দিনের বারডেম হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা মারাত্মকভাবে ব্যবহৃত হওয়ায় অসংখ্য রোগী হাসপাতাল ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। গত ১৩ই এপ্রিল অ্যান্ডোক্রাইনোলজি বিভাগে চিকিৎসাধীন জাতীয় প্রেস ক্লাবের কর্মচারী ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রাত আটটায় মারা যান। তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্বজন নামধারী দুর্বৃত্তরা হাসপাতালে হামলা ও ভাঙচুর করে। ঢাকা অঞ্চলের সহকারী পুলিশ সুপার মাসুদ ও সাবেক এক মন্ত্রীর এপিএস পরিচয়ে এসএম বাবুর ইন্ধনে ডা. আনোয়ার হোসেন ও কল্যাণ দেবনাথের ওপর হামলা করার ঘটনায় বারডেম হাসপাতালের চিকিৎসকরা কর্মবিরতি শুরু করেন।
সূত্র - দৈনিক মানবজমিন

