চিকিৎসার পর আশা নিয়ে আয়নার সামনে তাকালেও তা দুমড়ে যায়। এই চেহারা কীভাবে মানুষকে দেখাব? অমঙ্গলের চিহ্ন মনে করে বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠান কোথাও যেতে দেওয়া হয় না। রাস্তায় মুখ ঢেকে বের হতে হয়। স্কুলের বন্ধুরা পাশে বসতে চায় না। বীভৎস চেহারার জন্য চাকরিও হারাতে হয়।
১৯৯৮ সালে অ্যাসিডদগ্ধ রুনা লায়লা এভাবেই বলে যাচ্ছিলেন। তিনি বলতে থাকেন, অ্যাসিডদগ্ধ হওয়ার পর বেশির ভাগ মেয়ে বিয়ের মুখোমুখি হতে চান না। অনেকে বিয়ে করলেও নতুন করে বিশ্বাসভঙ্গের যন্ত্রণাটাই শুধু তীব্র হয়। আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়। ঘুমালেও দুঃসহ স্মৃতি পিছু ছাড়ে না। আত্মহত্যার চিন্তা মাথায় আসে। মানুষের প্রতি বিশ্বাস থাকে না। পরিবারের অসহায়ত্বে একসময় নিজেকেই অপরাধী মনে হতে থাকে।
আজ সোমবার বিকেলে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অ্যাসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশন (এএসএফ) আয়োজিত চার দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে রুনা তাঁর নিজের এবং অন্যদের জীবনের কাহিনি শোনাতে থাকেন।
অ্যাসিডদগ্ধদের মনো-সামাজিক পরিচর্যা বিষয়ক সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে রুনা লায়লার ওই বক্তব্যই বলে দেয় কেন এই মানুষগুলোর জন্য মনো-সামাজিক সেবা আবশ্যক। রুনা বলেন, ‘এই ধরনের অপরাধের জন্য যারা দায়ী তারা যদি শাস্তি পেত মনের যন্ত্রণা কিছুটা কমত। কিন্তু সমাজের সবকিছুই তাদের পক্ষে। সন্ত্রাসীর সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব আসে। বলে দেওয়া হয়, হয় আপস কর, নইলে সমাজ ছেড়ে চলে যাও। চোখ অন্ধ বা মুখের বীভৎস চিহ্নতেও কিছুই হয় না।’
সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে মনো-সামাজিক ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার মান নির্ণয় ও নির্দেশিকা তৈরির লক্ষ্যে সম্মেলন থেকে প্রাপ্ত ফলাফলের উপস্থাপনা তুলে ধরেন যুক্তরাজ্যের ওয়েস্ট ইংল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডায়না হারকোর্ট। তিনি অ্যাসিডদগ্ধদের মনো-সামাজিক সেবা আবশ্যক বলে উল্লেখ করেন। এ ছাড়া পরিবার ও সমাজে যাতে ওই ব্যক্তিদের পুনর্বাসন করা সম্ভব হয় সে ধরনের পরিবেশ তৈরির বিষয়টিতে গুরুত্ব দেন। তবে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশেই এ ধরনের পরিবেশ তৈরি হয়নি। মনো-সামাজিক সেবার কোনো মানদণ্ডও নির্ধারণ করা হয়নি।
এএসএফের চেয়ারম্যান ইফতেখারুজ্জামান এতে সভাপতিত্ব করেন। সম্মেলনে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টি সেক্টরাল প্রকল্প এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বিভাগ সহায়তা করে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, কম্বোডিয়ার অ্যাসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি এবং যুক্তরাজ্যের দুইজন বিশেষজ্ঞ সম্মেলনে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি অ্যাসিডদগ্ধদের উদ্দেশে বলেন, মুখের সৌন্দর্যই সবকিছু নয়। আপনাদের ভেতরের যে প্রতিভা তা নষ্ট হয়নি। প্রতিভাকে কাজে লাগাতে হবে। নিজেদের একা ভাবারও কোনো কারণ নেই।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব তারিক-উল ইসলাম, অস্ট্রেলিয়ান হাই কমিশনের (ডিপার্টমেন্ট কো-অপারেশন) কাউন্সিলর প্রিয়া পাওয়েল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এএসএফের নির্বাহী পরিচালক সেলিনা আহমেদ।
অ্যাসিডদগ্ধদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।
সূত্র - প্রথম আলো

