মার্কিন লেখিকা পার্ল এস বাকের পুলিত্জার পুরস্কার পাওয়া বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য গুড আর্থ’। সেই উপন্যাসে আমরা ও-লান নামের এক হতদরিদ্র চীনা নারীকে দেখতে পাই, যাঁকে দ্বিতীয় স্বামীর ঘরে ক্রীতদাসীর জীবন যাপন করতে হয়। ঘরের আর সব কাজের পাশাপাশি জমিতেও স্বামীর সঙ্গে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হয়। এমনকি গর্ভে সন্তান নিয়েও তাঁকে অবিরাম কাজ করে যেতে হয়।
এই একবিংশ শতাব্দীতে নেপালের গ্রামাঞ্চলে ও-লানের মতো অসংখ্য নারীর দেখা মিলবে যারা গর্ভে সাত মাসের সন্তান নিয়েও উদয়াস্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। আজ সোমবার বিবিসি ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমনই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
গর্ভবতী মায়েদের দুঃসহ পরিশ্রম: নেপালের পাওয়াতি গ্রামের বাসিন্দা জানুকা রাসায়েলি। তিনি যখন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা তখনো তাঁকে রোজ ভোর ছয়টায় ঘুম থেকে উঠতে হয়েছে। কাক ডাকা ভোর থেকে শুরু হতো তাঁর কাজ। তপ্ত সূর্যের নিচে জমিতে ফসল ফলানো, কাঠ কাটা, ছাগল চরানো, ঘরের কাজসহ ইত্যাকার নানা কাজে পুরোটা দিন কীভাবে পার হয়ে যায়, টেরই পেতেন না জানুকা। রাত ১০টার দিকে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এক দণ্ড বিশ্রামের সুযোগ হতো না তাঁর।
ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই সন্তান জন্ম দেন তিনি। তবে মৃত সন্তান।
জানুকার মতো নেপালের অসংখ্য দরিদ্র কৃষক নারীর এভাবেই দিন কাটে। মৃত সন্তান প্রসবের কিছুদিন আগে জানুকা বিবিসির প্রতিবেদককে বলেছিলেন, ‘অন্যান্য কাজের পাশাপাশি প্রতিদিন সাত থেকে আট ঘণ্টা জমিতে কাজ করি আমি। গর্ভের শিশুটি ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগ পর্যন্ত এভাবেই কাজ করে যাব।’
যখন মাঠের কাজ থাকত না, তখনো জানুকাকে রান্না ঘরের ধোয়া ও ছাইয়ের মধ্যে লাকড়ির চুলায় রান্না করতে হতো। ‘সারা দিনের খাটুনির ফাঁকে যদি একটু বিশ্রাম নিতে পারতাম’ এমনটা ভেবে নিজের অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসত জানুকার বুক থেকে।
জানুকা তখন বলেছিলেন, ‘আমার পিঠে ব্যথা করে, পাকস্থলীতেও ব্যথা করে। ধান ও ভুট্টা চাষ করতে গিয়ে আমার পা ফুলে শক্ত হয়ে গেছে। সারা শরীরেও ক্রমাগত ব্যথা করতে থাকে।’
জানুকা যেবার প্রথম গর্ভধারণ করেন, সেবার তাঁর স্বামী মাধব গ্রামের বাইরে দূরে কাজ করতেন। এবার জানুকাকে কাজে সাহায্য করতে তিনি গ্রামে ফিরে আসেন।
মাধব বলেন, ‘আমার স্ত্রী যখন মাঠে কাজ করে তখন তাঁর পাকস্থলীতে ব্যথা হয় শুনে ঘাবড়ে গিয়েছিলাম।’
এত পরিশ্রম সত্ত্বেও জানুকার দাবি, ‘প্রথমবার যখন গর্ভবতী ছিলাম, তখন এর চেয়ে ঢের বেশি কাজ করেছি। এখন তো সে তুলনায় প্রায় কিছুই করি না।’
দিন গড়িয়ে জানুকার সন্তানের ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসে। সময়ের আগেই প্রসব বেদনা ওঠায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়নি। ঘরেই তাঁর সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। কিন্তু সে সময় কোনো ধাত্রী ছিল না জানুকার পাশে। সন্তানটি নাড়িতে জড়িয়ে পড়ায় শেষ মেষ একটি মৃত সন্তানের জন্ম দেন জানুকা।
জানুকার মতো অসংখ্য নারীর কপালে এমনটা প্রতিদিনই ঘটছে। গর্ভাবস্থায় তাঁদের কাজ করতে হচ্ছে। ফলে গর্ভকালীন মৃত্যুর মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের। অনেক সময় জন্ম নেওয়া শিশু প্রতিবন্ধী হয়ে যাচ্ছে।
আরজু রানা দেউবা নামের একজন নারী সাংসদ ও নারী স্বাস্থ্য আন্দোলনকর্মী বিবিসিকে বলেন, অনেকটা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বা স্থানীয় রেওয়াজ হিসেবে নারীরা স্বামীদের কৃষিকাজে সাহায্য করে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে গর্ভকালেও তাঁদের কাজ করতে হয়। তবে এ অবস্থার পরিবর্তনে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে।
সূত্র - প্রথম আলো

