জনবলের অভাবে চিকিত্সাসেবা বৃদ্ধি করতে পারছে না ঢাকার শেরেবাংলা নগরের জাতীয় নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। স্নায়ুরোগীদের জন্য বিশেষায়িত এ হাসপাতাল উদ্বোধনের দেড় বছর পরও চালু করা যায়নি স্নায়ুরোগীদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) এবং হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিট (এইচডিইউ)। সেই সঙ্গে পুরোপুরিভাবে চালু হয়নি জরুরি বিভাগ। শয্যা সংখ্যাও প্রয়োজনের তুলনায় কম।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধনের পর ১৯২টি শয্যা নিয়ে চিকিত্সা সেবা দেওয়া শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। ক্রমান্বয়ে ৫০০ শয্যার হাসপাতাল করার কথা থাকলেও দেড় বছরেও শয্যা সংখ্যা বাড়েনি। হাসপাতালের অষ্টম এবং নবম তলায় শয্যা তৈরির কাজ সম্পূর্ণ হলেও ওই তলাগুলোতে রোগীদের ভর্তি শুরু হয়নি। শয্যা সংখ্যা কম থাকায় প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে রোগী এসে ফিরে যাচ্ছেন। ওই দু’তলা চালু হলে আরও প্রায় একশ’ রোগীকে চিকিত্সা দেওয়া সম্ভব হবে।
স্নায়ুরোগে আক্রান্ত রোগীদের মস্তিষ্কে অথবা শরীরের অন্য কোথাও অস্ত্রোপচারের পর পূর্ণ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) রাখার নিয়ম থাকলেও এখানে আইসিইউ নেই। কিছুটা কম ঝুঁকির মধ্যে থাকা রোগীদের জন্য হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিট (এইচডিইউ) চালু করার কথা থাকলে সেটাও এখনও চালু করা সম্ভব হয়নি। পরীক্ষামূলকভাবে চলছে স্বল্প পরিসরে সকাল ৭টা থেকে দুপুর ৩ পর্যন্ত জরুরি বিভাগের কার্যক্রম। বর্তমানে সেখানে মাত্র ১২টি বেডে রোগীদের চিকিত্সার ব্যবস্থা রয়েছে। আটটি অপারেশন থিয়েটারের মধ্যে চারটিতে অস্ত্রোপচার করা হয়।
হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগী এবং তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাসপাতালে ভর্তি হতে এক থেকে দুই মাস পর্যন্ত সময় লাগে। তবে সুপারিশ থাকলে আরও কম সময়েও ভর্তি হওয়া যায়। কিন্তু অস্ত্রোপচার করতে বেশ সময় লেগে যায়। সেখানেও এক সপ্তাহ থেকে দেড় মাস পর্যন্ত লেগে যায়। তবে ভর্তির পর হাসপাতালের পরিবেশ ও চিকিত্সা সেবার মান নিয়ে সন্তুষ্ট রোগীরা।
শেরপুর থেকে আসা ভর্তি রোগীর ভাই লুত্ফর রহমান বলেন, এ হাসপাতাল অনেক পরিচ্ছন্ন এবং চিকিত্সা সেবার মান দেশের যেকোনো সরকারি হাসপাতালের চেয়ে ভালো। পরিবেশ দেখে মনে হয়, কোনো বেসরকারি হাসপাতালে চিকিত্সা নিচ্ছি। যদি ভর্তি হতে সময় কম লাগত এবং অপারেশন করতে দেরি না হতো, তবে এ হাসপাতালের চিকিত্সা সেবা হতো অনন্য। কম খরচে এত ভালো পরিবেশে ভালো চিকিত্সা আমাদের মতো মানুষদের অনেক বেশি প্রয়োজন।
স্ট্রোক করা চিকিত্সাধীন এক রোগীর ছেলে বলেন, আমার বাবা স্ট্রোক করার পর তার জন্য আইসিইউ অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়েছিল। কিন্তু এখানে আইসিইউ সুবিধা না থাকায় তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এতে প্রতিদিন প্রায় ১৫ হাজার টাকা করে খরচ হয়েছে। কিন্তু এই হাসপাতালে আইসিইউ ব্যবস্থা থাকলে বড়জোড় প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকা লাগত।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ হাসপাতালে বর্তমানে চিকিত্সকের সংখ্যা ১৩০ জন, নার্স ১৩০ জন, অস্থায়ীভাবে আরও ১৮৯ জন কাজ করেন। সম্প্রতি আরও ৭২ জন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী (টেকনিশিয়ান ও মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট) নিয়োগ দেওয়া হয়। চারটি অপারেশন থিয়েটারে প্রতিদিন গড়ে পাঁচটির মতো অপারেশন করা হয়।
জনবল সঙ্কটের বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় নিউরো সায়েন্স ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. বদরুল আলম সকালের খবরকে বলেন, নতুন বেড সংযোজন, আইসিইউ, এইচডিইউ, জরুরি বিভাগের সব চিকিত্সা সেবা চালু করতে হলে আমাদের চিকিত্সক এবং নার্সের সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে। বর্তমানের জনবলে রোগীর সংখ্যা বাড়লে সেবার মান ধরে রাখা যাবে না। আরও প্রায় ১০০ চিকিত্সক এবং ৩০০ নার্স থাকলে আমাদের চিকিত্সা সেবার পরিধি বাড়ানো সম্ভব। আমাদের যন্ত্রপাতির কোনো সমস্যা নেই, তবে লোকবলের কারণে সব কিছু পরিপূর্ণভাবে চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।
ভর্তি এবং অস্ত্রোপচারের বিলম্বের বিষয়ে তিনি বলেন, ভর্তি হতে সময় লাগে তার কারণ, হাসপাতালে রোগীদের এমআরআই পরীক্ষা করতে সিরিয়াল পেতে দেরি হয়। কারণ আমাদের যে উন্নত থ্রি টেসলা মেশিন রয়েছে তা আর কোনো হাসপাতালে নেই। রোগী অনেক তাই সিরিয়াল পেতে দেরি হয়। সিরিয়াল অনুযায়ী একটি মেশিন দিয়ে রোগীদের রোগ নির্ণয় করতে হয়। তাই সময় একটু বেশি লাগে। এ যন্ত্রের দাম প্রায় ১৫-২০ কোটি টাকা। চাইলেও এ রকম যন্ত্র বেশি করে ক্রয় করতে পারি না।
জানা যায়, হাসপাতালের পরিচালকের কার্যালয় থেকে ৮৩৭ জন লোকবল নিয়োগের জন্য মন্ত্রণালয়ে একটি চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। এটি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখানে প্রাথমিক বৈঠক সম্পন্ন হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত বৈঠকের পর এটিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এ মন্ত্রণালয়ে অনুমোদন পেলে হাসপাতালের জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে।
জানতে চাইলে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. শাহ্ আমিনুল হক চৌধুরী বলেন, বেডের সঙ্কটের কারণে অনেক সময় রোগী ভর্তি করতে কিছুটা বিলম্ব হয়। তা ছাড়া স্নায়ুরোগীর চিকিত্সা দীর্ঘমেয়াদি। কোনো রোগী ভর্তি হলে সে পুরোপুরি সুস্থ হতে অনেক সময়, প্রায় দু-তিন মাস সময় লেগে যায়। তাই পরিমিত বেড সংখ্যার সঙ্গে চাইলেও অতিরিক্ত রোগী ভর্তি করা সম্ভব হয় না। তবে আমাদের বেড সংখ্যা বাড়ানোর চিন্তা রয়েছে। আইসিইউ তৈরির কাজ প্রায় ৮০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি কাজ খুব শিগগিরই শেষ হবে। এখানে রোগীকে যে সেবা দেওয়া হয় তা আন্তর্জাতিক মানের।
ভর্তি হওয়া ও হতে না পারা রোগী এবং তাদের স্বজনদের সরকারের কাছে জোর দাবি, অতি শিগগিরই এ হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা বাড়ানো হোক। নিয়ে আসা হোক আরও নতুন তিনটি টেসটলা এমআরআই যন্ত্র। পূর্ণাঙ্গ জরুরি বিভাগ, আইসিইউ এবং এইচডিইউসহ সব আধুনিক চিকিত্সা ব্যবস্থা চালু করা হোক।
সূত্র - দৈনিক সকালের খবর

