‘এই বাসায় আমি কাজ করি সাত মাস ধইরা। এই বাসার মামায় (গৃহকর্তা) রাত কইরা মদ খাইয়ে বাসায় ফেরে। মাইজে-মদ্যেই রাতে আই গুমের মধ্যে আইসা আমারে ধরে। আমি এ বাসায় আর কাজ করবার চাই না। কিন্তু মায় কইছে, এই কথা যেন কাউরে না কই। আমি বাড়িত ফিরি গেলি মায় কইছে মারব।’ কথাগুলো বলছিল মুক্তি (ছদ্মনাম)। বয়স ১২ বছর। চার বোন ও তিন ভাইয়ের মধ্যে মুক্তি তৃতীয়। গত সপ্তাহে কথা হয় তার সঙ্গে। মুক্তি জানায়, অভাবের কারণে পরিবার তাকে পড়লেখা করাতে পারেনি। ঢাকার ফার্মগেটের একটি বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজ করতে এসে তিনবেলা খাবার জুটছে ঠিকই কিন্তু গৃহকর্তার লালসার হাত থেকে তার মুক্তি মেলেনি। তাই ভয়ে থাকে সারাক্ষণ। মুক্তি বাড়িতে ফিরে যেতে চায়।
গত ৩ জুনের ঘটনা। ছোট দুহাতে প্লেট ধুচ্ছিল ময়না (১০)। হঠাৎ হাত থেকে একটি প্লেট মেঝেতে পড়ে ভেঙে যায়। ছুটে আসেন গৃহকর্ত্রী। এরপর ময়নার ওপর নেমে আসেন অকথ্য নির্যাতন। মারধরের পাশাপাশি গরম খুন্তি দিয়ে শরীরে বারবার ছেঁকা দেন। সৃষ্টি হয় সারা শরীরে দগদগে ঘায়ের। তার চিৎকারে পাশের বাড়ির এক নারী ছুটে এসে ময়নাকে উদ্ধার করেন। ওই নারী প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাকে গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দেন।
ময়না ও মুক্তির মতো এ রকম বহু শিশু বাসাবাড়িতে কাজ করতে এসে নির্মম শারীরিক নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। নির্যাতনে অনেক সময় তাদের মৃত্যুও হচ্ছে। গত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মাত্র চার মাসেই রাজধানীর বিভিন্ন বাসাবাড়ি থেকে শতাধিক গৃহকর্মীর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এসব ঘটনায় মামলা হলেও আসামিদের কখনো সাজা হয় না। দারিদ্র্যের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই মামলার বাদীরা নির্যাতনকারীদের সঙ্গে রফা করে মামলা তুলে নিতে বাধ্য হন।
১৩ বছরের ফাতেমার কাহিনি আবার একটু অন্য রকম। রাজধানীর রামপুরা এলাকার একটি ফুটপাতে তার বসবাস। ফাতেমা বলে, ‘রাত হলেই আশাপাশের ব্যাডারা আসি আমারে জাবরাই ধরে। একবার তো এক ব্যাডা আমারে জোর কইরা ধইরা নিয়া যাইবার লাগছিল। আমার চিক্কুরে হগ্গলের ঘুম ভাইঙ্গা গেলে ব্যাডা পলাইয়া যায়। কী করুম, রাস্তায় থাহি। আমগো এসব দেখনের সময় কি কারও আছে?’
কমলাপুরের আবদুল্লাহ অ্যান্ড সন্স নামে একটি ওয়েল্ডিংয়ের কারখানায় কাজ করে রাকিব (১১)। সকাল নয়টা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত তাকে কাজ করতে হয়। মাস শেষে বেতন পায় মাত্র ৮০০ টাকা। একে তো কম মজুরি, তার ওপর একটু ভুলচুক হলেই মালিক তাকে মারধর করেন। আবার কখনো কখনো বেতনও কাটেন। কিন্তু সংসারের অভাবের কথা ভেবে চাকরিটা আর ছাড়তে পারে না রাকিব।
জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ রক্ষায় ৫৪টি ধারার মধ্যে সরাসরি শিশুর সুরক্ষাবিষয়ক ২৪টি ধারা রয়েছে। ধারা ৩২-এর ১-এ বলা আছে, ‘শরীক রাষ্ট্রসমূহ অর্থনৈতিক শোষণ থেকে শিশুর অধিকারকে রক্ষা করবে এবং শিশুর শিক্ষায় ব্যাঘাত সৃষ্টিকারী কিংবা তার স্বাস্থ্য অথবা শারীরিক, মানসিক, আত্মিক, নৈতিক বা সামাজিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর কাজ করানো না হয়, সে ব্যবস্থা নেবে।’
এই শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী ১৯১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। কিন্তু এখনো এ দেশে এই সনদের বাস্তবায়ন হয়নি। শিশুরা এখনো অরক্ষিত। দেশে শিশুদের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় এখনো গড়ে ওঠেনি।
গত বছরের জুন মাসে জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে শিশু আইন ২০১৩। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ওপর ভিত্তি করে এ আইন পাস হয়েছে। এ আইনেও শিশুদের সুরক্ষা দেওয়ার ব্যাপারে নানা বিধিবিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু আইনের প্রয়োগ ঘটছে না।
জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী বাংলাদেশের শিশুরা সুরক্ষা পাচ্ছে না কেন—এ প্রশ্নের জবাবে সাবেক মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ বলেন, ‘আসলে শিশুদের বিষয়গুলোতে আরও নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। সরকার, পরিবারসহ সমাজের সব স্তরের মানুষকে এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুদের নিয়োগ নিষিদ্ধ হলেও বহু শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুদের শারীরিক ও মানসিক দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। যেসব শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে, তাদের পরিবারকে আমরা নিষেধ করলেও শুনবে না। কারণ, সংসারে দরিদ্রতা আছে। আবার এসব শিশুর মা-বাবাকে যদি আমরা আইনের আওতায় নিয়ে আসতে চাই, তো তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্র এখনো আর্থসামাজিকভাবে সুদৃঢ় অবস্থানে যায়নি।’
মেহের আফরোজ আরও বলেন, ‘শিশুর সুরক্ষা রক্ষার্থে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। শিশুনীতি ২০১১ প্রণীত হয়েছে এবং শিশু আইন ২০১৩ প্রণীত হয়েছে। আশা করা যায়, শিশুদের সুরক্ষায় বাংলাদেশ আরও পদক্ষেপ নেবে। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ বাস্তবায়নের জন্য আমাদের চারপাশের লোকজনেরও শিশুর স্বার্থ রক্ষায় স্বচ্ছ ধারণা ও সদিচ্ছা প্রয়োজন।’
এ ব্যাপারে পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন স্বদেশ উন্নয়ন কেন্দ্রের নিলুফা নাসরিন বলেন, সুরক্ষিত নয় এমন শিশুদের শিক্ষার আওতায় নিয়ে না আসা গেলে তাদের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম সমাজের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। এসব শিশুর শিক্ষাভাতা প্রদানের মধ্যমে শিক্ষার আওতায় আনতে পারে সরকারের পাশাপাশি এনজিওগুলো।
সূত্র - প্রথম আলো

