মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের সামনে ১৫ মিনিট ধরে উপুড় হয়ে আছে ১১ বছরের শিশু শান্ত ইসলাম। পরনে লাল-খয়েরি রঙের প্যান্ট আর সাদা ফুলহাতা গেঞ্জি। গেঞ্জির পেছনে জায়গায় জায়গায় ছোপ ছোপ রক্ত। পাশে একটি বাটি।
বাবার জন্য ওই বাটিতে করে ভাত নিয়ে গিয়েছিল শান্ত। ফেরার পথে জামায়াত-শিবিরের কর্মী ও পুলিশের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে যায় সে। মাথা ও পিঠে গুলিবিদ্ধ হয়ে ওই বাটি নিয়ে সড়কে মুখ থুবড়ে পড়ে শিশুটি। শেষমেশ মো. জুয়েল নামের এক শিশু শ্রমিক তাকে কোলে তুলে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করে। তার দেখাদেখি ছুটে আসেন কয়েকজন। শান্তকে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পুলিশের ছোড়া শতাধিক ছর্রা গুলি শান্তর মাথা, বুক ও পিঠে বিদ্ধ হয়। গত ১৩ ডিসেম্বর ঘটে এই দুর্ঘটনা।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানা এলাকায় মা আসমা বেগমের সঙ্গে থাকে শান্ত ও ছোট ভাই শাওন ইসলাম। বাবা মো. সোবহান মতিঝিলের আইডিয়াল স্কুলের সামনে চায়ের দোকানদারি করেন। রূপগঞ্জের স্থানীয় একটি স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীর পরীক্ষা সবে শেষ করেছে সে। ভাই শাওনও একই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে। পরীক্ষা শেষে মায়ের সঙ্গে ফকিরাপুলের কমিশনার গলিতে খালার বাসায় বেড়াতে এসেছিল শান্ত। বাবাকে খাবার দিয়ে ফেরার পথে সে এই দুর্ঘটনার শিকার হয়। শান্ত বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে আছে সে।
গত ২১ নভেম্বর বুধবার দুপুরে তেজগাঁওয়ে শাহিনবাগ সিভিল অ্যাভিয়েশন কোয়ার্টারের পাশে আবর্জনার স্তূপ থেকে বল মনে করে ককটেল কুড়িয়ে নেয় ১০ বছরের শিশু তোফাজ্জল হোসেন। হাতে নেওয়ার পরপরই ককটেলটি বিস্ফোরিত হয়। গুরুতর আহত তোফাজ্জলকে ভর্তি করা হয় জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল)। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ককটেলের আঘাতে অকেজো হয়ে গেছে তোফাজ্জলের ডান হাতের তিনটি আঙ্গুল। সুস্থ হতে তিন চার মাস সময় লাগবে। সেই সঙ্গে অকেজো হয়ে যাওয়া আঙ্গুলগুলোতে চামড়া প্রতিস্থাপন করতে হবে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক নম্বর ওয়ার্ডের একটি বিছানায় শুয়ে চিৎকার করে কাঁদছে একটি শিশু। নাম নাহিদুল ইসলাম (৫)। কচি দুটি হাত সাদা ব্যান্ডেজে জড়ানো। একটিতে আঙুল আছে। আরেকটিতে নেই। কবজির ওপর থেকে কেটে ফেলা হয়েছে। সারা মুখ রক্তাক্ত। স্প্লিন্টারে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। ডান চোখের ওপর থেকে রক্ত ঝরছে। গত ২২ ডিসেম্বর উপশহর নিউমার্কেট এলাকায় রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের উত্তরাঞ্চলীয় শাখা কার্যালয়ের বারান্দায় খেলার সময় পড়ে থাকা ককটেলের বিস্ফোরণে ওর এ অবস্থা হয়েছে।
গত বছর শিশুদের সুরক্ষায় শিশু আইন পাস হলেও সারা বছর ধরে শিশুরা ছিল অরক্ষিত। নানা কারণে শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বিশেষ করে বছরের শেষ দিকে এসে রাজনৈতিক বিভিন্ন কর্মসূচি যেমন টানা হরতাল, অবরোধের জের ধরে শিশুরা প্রাণ হারিয়েছে। অনেক শিশুর অঙ্গহানি হয়েছে। এ ছাড়া এসব ঘটনায় গুরুতর আহত শিশুর সংখ্যাও অনেক। বিশেষজ্ঞ ও পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, গত বছর শিশুদের সার্বিক পরিস্থিতি উদ্বেগজনক ছিল।
বছরজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় শিশুদের মৃত্যু ও আহত হওয়া ছাড়াও পারিবারিক কলহের জেরে হত্যা, অপহরণের পরে হত্যা, সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে গত ২৬ অক্টোবর থেকে শেষ দিন পর্যন্ত পর্যন্ত বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোটের ডাকা হরতাল ও অবরোধে ককটেল বিস্ফোরণ ও পরিবহনে আগুন দেওয়ার ঘটনায় অন্তত ৩০ শিশু হতাহত হয়েছে। এদের অনেকেই ককটেলকে খেলনা ভেবে হাতে নিয়ে বিস্ফোরিত হয়ে হতাহত হয়েছে। অনেকে সহিংসতার মধ্যে পড়ে আহত হয়েছে।
হরতালের আগের দিন গত ৩ নভেম্বর নেত্রকোনা থেকে দাদির সঙ্গে বাসে চড়ে রাজধানীর উত্তরায় ফুফুর বাসায় বেড়াতে আসছিল সুমি। বাসটি জয়দেবপুর চৌরাস্তায় এলে কয়েকজন আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে সুমি ও তার দাদি দুজনই দগ্ধ হয়। পরে তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নেয়।
গাজীপুর সদর উপজেলার ঢাকা-বাইপাস সড়কের মোগরখাল এলাকায় ১০ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে একটি কাভার্ড ভ্যানের সামনের অংশে পেট্রলবোমা হামলা চালানো হয়। কাভার্ড ভ্যানে ছিলেন আদম আলী ও তাঁর স্ত্রী সুমি আক্তার (২৮), মেয়ে সানজিদা (৮) ও সাদিয়া (২)। পেট্রলবোমার আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে কাভার্ড ভ্যানের সামনের আসনে থাকা সুমি ও সানজিদা পুড়ে মারা যায়। আদম আলী ও তাঁর আরেক মেয়ে এবং চালক ও তাঁর সহযোগীও অগ্নিদগ্ধ হন। এই রাজনৈতিক সহিংসতায় শিশুদের হতাহতের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার কর্মীরা।
এসব সহিংসতায় মৃত্যুর বাইরে রয়েছে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে শিশুদের ব্যবহার। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াতের নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পরপরই সারা দেশে শিশুদের সহিংসতায় ব্যবহার করা হয়। বগুড়া, গাইবান্ধা, রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলায় সহিংসতায় শিশুদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। টাকার বিনিময়ে এসব কাজে ব্যবহার করা হয়েছে শিশুদের। হেফাজতের আন্দোলনেও শিশুদের ব্যবহার করতে দেখা গেছে।
এই বছরে রাজনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি পারিবারিক কলহ-দ্বন্দ্বের জের ধরে শিশু যেমন মারা গেছে, তেমনি অপহরণের পরে শিশুদের হত্যার মতো অমানবিক ঘটনাও ঘটেছে দেশের বিভিন্ন স্থানে।
চলতি বছরের ১৩ ডিসেম্বর সাতক্ষীরায় অপহরণের পর রিয়াদ হাসান নামের নয় বছরের তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ুয়া এক শিশুকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। বান্দরবানের রুমা উপজেলার আদিগা ত্রিপুরা পাড়া থেকে গত ২৬ জুন সঞ্জয় ত্রিপুরা নামের আট মাসের এক শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, পারিবারিক কলহের জের ধরে ওই শিশুটিকে হত্যা করা হয়েছে।
লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলায় মো. সোহেল নামের এক শিশুকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়।
এ ছাড়া ধর্ষণ করে শিশু হত্যার ঘটনা ঘটেছে বিভিন্ন স্থানে। পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বগা ইউনিয়নে একটি শিশুকে অপহরণের পর ধর্ষণ করে দুই প্রতিবেশী।
চট্টগ্রামে শাশুড়ি গালাগাল করায় প্রতিশোধ নিতে ছয় বছরের শিশু শ্যালিকাকে ধর্ষণের পর শ্বাস রোধ করে হত্যা করেন ভগ্নিপতি শাকিল। গত ১৫ ডিসেম্বর সোনিয়া আকতার (৬) নামের ওই শিশুর লাশ নগরের হালিশহর সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজের পাশের নালা থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। গ্রেপ্তার হওয়ার পর শাকিল আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে এ কথা স্বীকার করেন।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেছেন, গত বছর শিশুদের সুরক্ষার জন্য পাস হওয়া শিশু আইনটি আন্তর্জাতিক শিশু সনদের আদলে তৈরি করা হয়েছে। তারপরও অনেক শিশু যেমন পথশিশু, শিশু শ্রমিকসহ আরও অনেকে আইনি সুরক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছে। গত বছর শিশুদের ওপর বেশি অবিচার করা হয়েছে। তিনি বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক সহিংসতায় শিশুদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ইদানীং এই হার সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। এটি শিশু অধিকারের লঙ্ঘন। এর জন্য দোষী ব্যক্তিদের সাজা দিতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমান সহিংস পরিস্থিতিতে শিশুরা ভীতিকর পরিবেশের মধ্যে বড় হচ্ছে। বারবার তাদের পরীক্ষা পেছানোর কারণে লেখাপড়ার প্রতি তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। দেশের নেতিবাচক অবস্থায় তাদের মধ্যে দেশ সম্পর্কে খারাপ ধারণার জন্ম হচ্ছে, যাতে করে তাদের দেশপ্রেমে ভাটা পড়তে পারে। এই সবকিছুর দায়দায়িত্ব সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে নিতে হবে। এখনই যদি শিশুদের নিয়ে ভাবা না হয়, তাহলে দেশ ভবিষ্যতে অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
মানবাধিকারকর্মী ও আইন সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল বলেন, বর্তমান সহিংস রাজনীতি শিশুদের মনে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শিশু ঠিকমতো স্কুলে যেতে পারছে না। পরীক্ষা দিতে পারছে না, খেলতে পারছে না। ফলে তার স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে। তারা সহিংস রাজনীতি, জ্বালাও-পোড়াওসহ বিভিন্ন খারাপ পরিবেশের মধ্যে বড় হওয়ার কারণে এগুলোকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিচ্ছে। এতে তাদের কোমলতা নষ্ট হচ্ছে। একটা গাড়ি দেখলে হয়তো বলে উঠছে এই গাড়িতে কি এখন আগুন দেবে! এভাবে তাদের মানসিক অবস্থায়ও এমন একটি ভীতিকর পরিস্থিতি দেখার কারণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তিনি আরও বলেন, শিশুদের এই খারাপ অবস্থার দায় অবশ্যই রাজনৈতিক নেতাদের নিতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের সবাইকেও এর দায়িত্ব নিতে হবে। কেননা আমরাও তো শিশুদের জন্য কিছু করিনি। সবাই মিলে শিশুকে তার স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দিতে হবে।
সূত্র - প্রথম আলো

