টিকা খুব চমৎকারভাবে কাজ করে। এটি রোগের আক্রমণ প্রতিরোধ করে, রোগাক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নেওয়ার চেয়ে যা একটি ভালো পন্থা। টিকা সরবরাহ করাও তুলনামূলকভাবে সস্তা ও সহজ। তার পরও কোটি কোটি শিশু টিকা পাচ্ছে না। বিষয়টি সব সময়ই আমার কাছে ধাঁধার মতো মনে হয়। ১৫ বছর আগে আমরা যখন গেটস ফাউন্ডেশন শুরু করি, আমাদের মনে হয়েছিল, সব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়ে গেছে। এখন আমাদের হয়তো আরও ব্যয়বহুল ও অপরীক্ষিত বিষয়ের সমাধানে কাজ করতে হবে। আসলে অত্যাবশ্যক টিকা সরবরাহ এখনো আমাদের জন্য সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর অন্যতম।
আমি যখন ২০১৪ সালের দিকে তাকাই, অগ্রগতির ব্যাপারে আমাদের এ প্রত্যাশা আগের চেয়ে আরও বাড়ে যে, টিকার ক্ষমতা ব্যবহার করে আমরা প্রতিটি শিশুর—তা তারা যেখানেই বসবাস করুক না কেন—স্বাস্থ্যকর জীবন শুরু করে দিতে পারব। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে উদারমনা দাতাদের কাছ থেকে আমাদের কাছে নতুন নতুন সাহায্য এসেছে। শিশুদের প্রাণঘাতী রোগ থেকে রক্ষার জন্য আমরা আরও কার্যকর নতুন টিকা তৈরি করেছি। এসব টিকা, বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে, আরও ভালোভাবে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আমরা নতুন পদ্ধতি প্রবর্তনের চেষ্টা করছি।
আশার ব্যাপার হলো, আর বেশির ভাগ সময়ই তা কারও চোখে পড়ে না যে সব শিশুর জন্য প্রতিষেধক পাওয়ার সুযোগ করে দিতে বিশ্বপ্রচেষ্টার অগ্রগতিতে উদীয়মান টিকা সরবরাহকারী দেশগুলোর ভূমিকা ক্রমে বাড়ছে। ব্রাজিল, চীন ও ভারত নিজেরাই অনেক স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন সমস্যা মোকাবিলা করেছে, এ ক্ষেত্রে অনেক অগ্রগতিও তাদের হয়েছে। অন্যান্য দেশের একই রকমের অগ্রগতির জন্য এখন তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও কারিগরি সামর্থ্য প্রয়োগ করছে।
অনেকেই হয়তো বহু ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির নাম কখনো শোনেননি—সিরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া, ভারত বায়োটেক, বায়োলজিক্যাল ই, চায়না ন্যাশনাল বায়োটেক গ্রুপ এবং ম্যাঙ্গুইনহোসের মতো অল্প কয়েকটির নাম শুধু এখানে করা যায়—বিশ্ব স্বাস্থ্য খাতে যারা আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হয়েছে। যে নতুন উৎসাহ উদীয়মান বাজারকে গাড়ি থেকে শুরু করে কম্পিউটারসহ সব ধরনের পণ্যের কেন্দ্রে রূপ দিয়েছে, একই প্রণোদনা কাজে লাগিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান অল্প দামে বিশ্বকে উচ্চমানসম্পন্ন টিকা সরবরাহ করায় নেতৃত্ব দিয়ে চলেছে।
এসব প্রতিষ্ঠান যে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা ও নতুন উৎপাদন দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি করেছে, তার ফলে মাত্র ৩০ ডলারের বিনিময়ে টিটেনাস, হুপিং কাশি, পোলিও, যক্ষ্মাসহ বড় আটটি রোগ থেকে শিশুদের সুরক্ষা দেওয়া গেছে। সিরাম ইনস্টিটিউট বিশ্বের যেকোনো প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে টিকা উৎপাদন করে। টিকার মূল্য কমাতে এবং উৎপাদিত টিকার পরিমাণ বাড়াতে প্রতিষ্ঠানটি মূল ভূমিকা পালন করেছে।
এসব প্রতিষ্ঠানের প্রচেষ্টা এবং গাভি অ্যালায়েন্স, বহুজাতিক টিকা উৎপাদক ও আন্তর্জাতিক দাতাদের সঙ্গে অংশীদারির জন্য তাদের ধন্যবাদ জানাই। কারণ, এর ফলে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বছরে ১০ কোটির বেশি শিশুকে প্রতিষেধক দেওয়া গেছে। বাজারে আরও সরবরাহকারী এলে এবং তাদের নতুন উৎপাদন-কৌশলের মাধ্যমে প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে তোলা গেলে টিকার দাম আরও কমে আসবে।
এসব জীবন রক্ষাকারী টিকার অগ্রগতির কথা শুধু ভেবে দেখুন। মাত্র এক ডোজ টিকা ডিপথেরিয়া, টিটেনাস, হুপিং কাশি, হেপাটাইটিস বি ও হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ বি (হিব) থেকে শিশুকে রক্ষা করে। ২০০১ সালে গাভি অ্যালায়েন্স যখন তা প্রথম উদ্ভাবন করে, তখন তারাই এর একমাত্র সরবরাহকারী ছিল। প্রতি ডোজের দাম তখন ছিল সাড়ে তিন ডলার। টিকার চাহিদা বাড়তে থাকলে গাভি অন্য সরবরাহকারীদেরও বাজারে আসতে উৎসাহ দেয়। তাতে টিকার দাম কমে যায়। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এখন পাঁচটি। এ বছর ভারতীয় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি বায়োলজিক্যাল ই ঘোষণা দিয়েছে, তারা প্রতি ডোজ টিকা মাত্র ১ দশমিক ১৯ ডলারে সরবরাহ করতে পারবে।
বাংলাদেশের চট্টগ্রামে টিকা সরবরাহ করা হচ্ছেএ ছাড়া আমরা দেখেছি, উদীয়মান বড় দেশগুলো নতুন টিকা সরবরাহের জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোয় বায়োমেডিকেল টেকনোলজিতে বিনিয়োগ করছে। এ বছর ভারতের ডিপার্টমেন্ট অব বায়োটেকনোলজি এবং ভারত বায়োটেক রোটাভাইরাসের প্রতিষেধক টিকার প্রতি ডোজ মাত্র এক ডলারে সরবরাহ করার পরিকল্পনা জানিয়েছে, প্রতিবছর যা লাখ লাখ শিশুর মৃত্যুর জন্য দায়ী। বর্তমান টিকার চেয়ে এ ঘোষিত টিকার দাম অনেক কম। একইভাবে একটি চীনা বায়োটেক প্রতিষ্ঠানও জাপানিজ এনকেফেলাইটিস রোগ প্রতিরোধের জন্য উন্নত মানের টিকা বাজারে আনতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন পেয়েছে। একই মাসে ব্রাজিলের শীর্ষস্থানীয় বায়োমেডিকেল গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র বায়োম্যাঙ্গুইনহোস গেটস ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যৌথভাবে হাম ও রুবেল টিকা উৎপাদনের পরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছে।
১৫ বছর আগে আমি যখন বিশ্ব স্বাস্থ্যের ব্যাপারে জড়িত হয়েছিলাম, তখন এ ধরনের ঘোষণা ছিল বিরল। টিকা উৎপাদন নিয়ন্ত্রিত করত শুধু ধনী দেশের হাতে গোনা গুটি কয়েক বহুজাতিক ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি। পুরো খাতটিতে প্রতিযোগিতা বলতে কিছু ছিল না। বর্তমানে উদীয়মান টিকা উৎপাদনকারী দেশগুলো উন্নয়নশীল বিশ্বে ব্যবহারের জন্য জাতিসংঘের কেনা প্রায় ৫০ শতাংশ টিকা উৎপাদন করে থাকে। ১৯৯৭ সালে এর পরিমাণ ছিল ১০ শতাংশের কম।
উদীয়মান টিকা উৎপাদনকারী দেশগুলো উন্নয়নশীল দেশের টিকা উৎপাদনকারীদের কাজকে পরিপূর্ণতা দেয়। আসলে বেশ কিছু নতুন চিন্তা এসেছে তাদের যৌথ প্রচেষ্টা থেকে। সিরাম ইনস্টিটিউট ও ওলন্দাজ টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সিনকো বায়ো পার্টনার্সকে একটি কম দামি টিকা উৎপাদনের যৌথ প্রকল্পে গেটস ফাউন্ডেশন সহযোগিতা করেছিল, যা আফ্রিকার ৪৫ কোটি মানুষকে মেনিনজাইটিস থেকে রক্ষা করেছে। বায়োলজিক্যাল ই এ বছর বহুজাতিক টিকা উৎপাদনকারীদের সঙ্গে দুটি বড় যৌথ প্রকল্পের ঘোষণা দিয়েছে। গ্লাক্সোস্মিথক্লাইনের সঙ্গে তাদের একটি যৌথ প্রকল্প ‘একের মধ্যে ছয়’ টিকা উৎপাদন, শিশুদের যা পোলিও ও অন্যান্য সংক্রামক রোগ থেকে বাঁচাবে। নোভারটিসের সঙ্গে তাদের আরেকটি প্রকল্প এমন দুটি টিকা উৎপাদন করবে, উন্নয়নশীল বিশ্বের লাখ লাখ মানুষকে যা রক্ষা করবে টাইফয়েড ও প্যারাটাইফয়েড থেকে।
এসব অগ্রগতির পরেও জীবন রক্ষাকারী টিকা না পাওয়া দুই কোটি ২০ লাখ শিশু, বিশেষ করে যারা দরিদ্র দেশে বাস করা শিশুদের কেন্দ্র করে পরিকল্পনা নিতে হবে। হাম, নিউমোনিয়া বা রোটাভাইরাসের মতো প্রাণঘাতী রোগ থেকে সুরক্ষা না পাওয়ায় বহু শিশু সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার ও স্কুলে যাওয়ার অধিকার হারায় এবং আনন্দময় জীবন থেকে বঞ্চিত হয়। তাদের দেশও এতে ক্ষতির শিকার হয়। রোগ দরিদ্র দেশের শক্তি ও মানুষের মেধা হরণ করে। এ ছাড়া রোগ চিকিৎসাব্যয় বাড়ায় এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করে।
আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করি, যেখানে এসব অবিচার শোধরানোর অধিকার আমাদের আছে। কার্যকর টিকা উৎপাদন, একে ক্রয়সীমার মধ্যে রাখা এবং যে শিশুদের এসব দরকার, তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়া আমাদের জানা। উদীয়মান টিকা সরবরাহকারী দেশগুলো এ প্রক্রিয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ অংশগ্রহণের জন্য তাদের অভিনন্দন। আমরা এমন একটি দিনের দিকে এগোচ্ছি, শিশুরা যখন একটি স্বাস্থ্যকর জীবন শুরু করতে পারবে।
সূত্র - প্রথম আলো

