রাজধানীর মহাখালী এলাকায় র্যাবের অভিযানে সিলগালাকৃত ভুয়া কান্সার হাসপাতালের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি চক্র জড়িত ছিল। ছিলেন সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকও। জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ওয়ার্ডবয় মাহাবুব সর্দার ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্টেনো টাইপিস্ট লায়েক আলী ওরফে লাল ভাইকে সাসপেন্ড করেছে কর্তৃপক্ষ। এদিকে, খোদ জাতীয় ক্যানসর গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. শেখ গোলাম মোস্তফার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় ওই ভুয়া ক্যানসার হাসপাতাল কার্যক্রম চলতো বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরজমিন ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মহাখালীর টিবি গেটের ৩৬/৬ চিশতিয়া হোটেলের দোতালায় অবস্থিত ওই ভুয়া ক্যানসার হাসপাতালটি সিলগালা অবস্থায় রয়েছে। র্যাবের অভিযানের পর আশপাশের বিভিন্ন ওষুধ ফার্মেসি ও হোটেল ব্যবসায়ীরা আগের চাইতে অনেক সতর্ক। জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের অভ্যর্থনা বিভাগের ওয়ার্ডবয় মো. আরকান আহমেদ মানবজমিনকে জানান, ‘চিশতিয়া হোটেলের দোতালার ওপর ‘ ডক্টর্স চেম্বার’ নামে ওই ভুয়া ক্যানসার হাসপাতালটি চারজনের মাধ্যমে পরিচালিত হতো। তারা হলেন, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. শেখ গোলাম মোস্তফা, ওই হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. রফিকুল ইসলাম, ওয়ার্ড ইনচার্জ মাহাবুব সর্দার ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্টোনো টাইপিস্ট লায়েক আলী ওরফে লাল ভাই। এ চারজনের মধ্যে প্রধান কর্তা ছিলেন মাহাবুব সর্দার। তিনি আরো বলেন, মাহাবুব সর্দারের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার মোকসেদপুর এলাকায়। র্যাবের অভিযানের পর ওই ভুয়া হাসপাতালটি সিলগালা হওয়ার পর তিনি পলাতক রয়েছেন। মাহাবুব ২০০৭ সালে জাতীয় কান্সার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ওয়ার্ড বয় হিসাবে যোগদান করেন। তিনি অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করায় তার এখানে তদবিরের মাধ্যমে চাকরি হয়। তিনি আরও বলেন, ২০১০ সালে মাহাবুব হাসপাতালের ওয়ার্ড ইনচার্জ নির্বাচিত হয়। ওয়ার্ড ইনচার্জ হওয়ার পরেই তিনি ওই হাসপাতালে নিজস্ব একটি গ্রুপ গড়ে তুলেন। তার সঙ্গে আরও প্রায় ১০ জন দালাল জড়িত। হাসপাতালের বিভিন্ন টেন্ডার পেতে হলে তার দারস্থ হতে হয়। এ নিয়ে ওই হাসপাতালে বর্তমানে দু’টি বড় গ্রুপ গড়ে ওঠেছে। যেই কোন মুহূর্তে একটি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হতে পারে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, গুলশান থানার বর্তমান আওয়ামী লীগের সভাপতি জসীম উদ্দীন সরকারের সঙ্গে মাহাবুবের ভাল সম্পর্ক হওয়ার কারণে জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মচারী তাকে সমীহ করে চলতো। ওয়ার্ড বয় হওয়ার পরেই মাহাবুব চিশতিয়া হোটের দোতলায় অবস্থিত ডক্টর্স চেম্বার্স নামে ওই ভুয়া ক্যানসার হাসপাতালে যাতায়াত আরম্ভ করে। জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে গ্রাম থেকে চিকিৎসা নিতে আসা গরিব
ও অশিক্ষিত রোগীদের তারা ভাগিয়ে ওই ভুয়া ক্যানসার হাসপাতালে নিয়ে যেতো। উন্নত চিকিৎসা দেয়ার নামে তারা অসহায় রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা করতো। জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. শেখ গোলাম মোস্তফা ও চিকিৎসক রফিকুল ইসলাম ওই ভুয়া হাসপাাতলের সপ্তাহে দু’দিন চিকিৎসা নিতেন। সিলগালাকৃত ভুয়া ক্যানসার হাসপাতালের পাশের হোটেল কর্মচারী মো. রবিউল ইসলাম জানান, ‘ভুয়া ক্যানসার হাসপাতালের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। কেননা, ওই হাসপাতালের গরিব রোগীরা ভর্তি হতো। কিন্তু, অনেক টাকা-পয়সা খরচ করার পর রোগ ভাল হওয়ার কোন লক্ষণ দেখা দিতো না। তখন রোগীদের স্বজনদের সঙ্গে ওই ভুয়া ক্যানসার হাসপাতালের কর্মচারী ও কর্মকর্তার সঙ্গে ঝগড়া, তর্ক-বিতর্ক হতো। অনেক রোগীর স্বজনকে ওই ভুয়া হাসপাতালের লোকজন মারধর করতো। র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম বিভাগের পরিচালক কমান্ডার এ টি এম হাবিবুর রহমান জানান, ‘র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত ঘটনাস্থলে যাদের পেয়েছে তাদের তাৎক্ষণিক সাজা প্রদান করেছে। এ ঘটনার সঙ্গে আর কেউ জড়িত থাকলে কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। ওই ক্যান্সার হাসপাতালের সঙ্গে স্বাস্থ্য বিভাগের বড় একটি সিন্ডিকেট জড়িত এ বিষয়টি নিয়ে র্যাব তদন্ত করছে কিনা প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তরে বলেন, ‘এটি কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবেন।’ এ ব্যাপারে গুলশান থানার ওসি মো. রফিকুল ইসলাম জানান, ‘বিষয়টি পুলিশ তদন্ত করছে। জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. শেখ গোলাম মোস্তফার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোন কথা বলতে রাজি হননি। গুলশানে অবস্থিত তার বাসায় গেলে তিনি এ প্রতিবেদককে বলে এ বিষয়ে তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কোন কথা বলবেন না।
সূত্র - দৈনিক মানবজমিন

