বাংলাদেশে অনুমোদিত ও অননুমোদিত কয়েকশ ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব ওষুধের মান-নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। নকল ও ভেজাল ওষুধে বাজার ছেয়ে গেছে। নকল ওষুধ প্রস্তুতকারীরা বাজারে নামি-দামি কোম্পানির ভালো ব্র্যান্ডের ওষুধগুলো হুবহু নকল করে বাজারে ছেড়ে থাকে। অসাধু ওষুধ ব্যবসায়ীরা বেশি লাভের আশায় এসব ওষুধ জেনে-শুনে দোকানে রাখে বিক্রির জন্য। এছাড়া ক্যালসিয়াম ভিটামিনজাতীয় ফুড সাপ্লিমেন্ট— যেগুলো ওষুধের সংজ্ঞায় পড়ে না, এর কিছু আমদানি করে বিদেশ থেকে এবং তা অতি উচ্চমূল্যে বিক্রি করে থাকে তারা। এসব ফুড সাপ্লিমেন্ট বাংলাদেশের ভালো কোম্পানিগুলো তৈরি এবং স্বল্পমূল্যে বিক্রি করছে। এসব ফুড সাপ্লিমেন্ট আমদানি করা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত, তা আমাদের ভেবে দেখতে হবে। এসব সত্যিই বিদেশ থেকে আসে, নাকি দেশেই তৈরি করে বিদেশি সিল মারা হয় অথবা জিঞ্জিরায় তৈরি হয়— তা দেখার কেউ আছে কি?
বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হলেও এ কথা স্বীকার করতেই হবে, আমাদের চিকিত্সকদের একাংশ অপ্রয়োজনে অনেক ওষুধ লিখে থাকে। অ্যান্টিবায়োটিক, ভিটামিন, ক্যালসিয়াম ও বিভিন্ন রকম ফুড সাপ্লিমেন্ট অনেক প্রেসক্রিপশনে দেখা যায়। এর প্রয়োগ যৌক্তিক হওয়া প্রয়োজন। অপ্রয়োজনীয় বেশি অ্যান্টিবায়োটিক লেখার ফলে শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যেতে পারে। পলি ফার্মেসি বলে চিকিত্সাশাস্ত্রে একটি কথা আছে। ওষুধের স্বাভাবিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি আন্তঃওষুধ প্রতিক্রিয়াও হতে হবে। বৃদ্ধদের ওষুধ লেখার ক্ষেত্রে আরও সাবধান হতে হবে। ঘুম-ঘুম ভাব— এ রকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াযুক্ত কোনও ওষুধ দিনের বেলায় খেলে রোগীর মাথা ঘোরাতে পারে। নিয়মিত স্বাভাবিক খাওয়া রোগীর যদি বাতব্যথা, মাথাব্যথা, কোমরব্যথা, হাঁটুব্যথা হয়— তাহলে তাকে কি ভিটামিন বা ক্যালসিয়াম দেওয়ার কোনও প্রয়োজন আছে? সাধারণত ৫০-ঊর্ধ্ব নারীদেরই শরীরে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি বা অস্টিওপরোসিস নামক হাড়ের ক্ষয়জনিত রোগ হতে পারে। ব্যথা বা দুর্বলতা নিয়ে আমরা বেশিরভাগ ডাক্তারই তাদের একটা ক্যালসিয়াম বা দামি ভিটামিন দিয়ে থাকি। ক্যালসিয়াম বা ভিটামিন রোগীর ব্যথা কমাতে কতটা সাহায্য করবে, তা ভেবে দেখি না বা সক্ষমতার কথা চিন্তাও করি না। কেউ-কেউ হয়তো ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের প্রমোশন বা প্রণোদনায় প্রলুব্ধ হয়ে অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় ওষুধ লিখে দিয়ে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রেই তা নৈতিকতার মানদণ্ডে প্রশ্নবিদ্ধ।
নকল, ভেজাল বা নিম্নমানের ওষুধে শুধু যে রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা নয়, রোগ ভালো না হওয়ার কারণে চিকিত্সকের সুনামও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন রোগীরা— যাদের বেশি টাকা দিয়ে বেশি ওষুধ কিনতে হচ্ছে। এর অধিকাংশই অপ্রয়োজনীয় ও অকার্যকর। জটিল রোগীদের রোগের প্রয়োজনে একাধিক ওষুধ লাগতেই পারে। এক্ষেত্রে চিকিত্সকের দক্ষতা ও বিচক্ষণতা নিয়ে কোনও প্রশ্ন তুলছি না। ওষুধ বিক্রেতা বা ফার্মাসিস্টরাও অনেক সময় ভালো কোম্পানির ভালো ওষুধের বিপরীতে মার্কেটে সাপ্লাই না থাকার অজুহাত দেখিয়ে বেশি লাভের আশায় নিম্নমানের ওষুধ রোগীদের কাছে বিক্রি করে থাকে। অনেক রোগীই বিক্রেতা কী দিল, তা বুঝতে পারেন না। যারা বুঝতে পারেন, তাদের আরও সচেতন হতে হবে। ভালোমানের ওষুধ যেখানে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে— সেখানে নিজের দেশের মানুষ নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ খেয়ে মরছে। ভেজাল ওষুধের বিরুদ্ধে অভিযান চালালেও ওষুধ বিক্রেতারা ধর্মঘট করে। আমারা কি তাদের কাছে জিম্মি হয়ে থাকবে, নাকি ওষুধ অধিদপ্তর আরও শক্ত অবস্থানে যাবে? যে দেশে অন্যায় করার অধিকারের জন্য আন্দোলন হয়, সেখানে নীতিবান ভদ্রলোকদের নিগৃহীত হওয়া ছাড়া কী-ই বা করার আছে? নৈতিক অবক্ষয়ে সিক্ত এই সমাজের মানুষ নষ্ট সময়ের স্রোতে অবগাহন করছে। নকল, ভেজাল, নিম্নমানের ওষুধ তৈরি, বিক্রি এবং চিকিত্সকের একাংশের অপ্রয়োজনে অনেক ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা লেখা সামাজিক এবং নৈতিক অবক্ষয়েরই বহিঃপ্রকাশ। তবে হতাশ হওয়ার অবকাশ নেই। এই পতিত অবস্থান থেকে উত্তরণের জন্য সমাজের সচেতন অংশকেই এগিয়ে আসতে হবে। -
সূত্র - দৈনিক আমাদের সময়

