সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্যে সরকার দেশব্যাপী সর্বস্তরের মানুষের জন্য স্বাস্থ্য বীমা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে এরই মধ্যে সোশ্যাল হেলথ প্রটেকশন স্কিম নামের একটি কর্মপন্থা নির্ধারণ করেছে সরকার। এ স্কিমের আওতায় পর্যায়ক্রমে সব মানুষকেই স্বাস্থ্য বীমার আওতায় নিয়ে আসা হবে। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থায়ন বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্য বীমা কার্যক্রম নিশ্চিত হলে দেশে ধনী-গরিব সবারই প্রয়োজনমতো প্রাপ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে, যা বিশেষত দরিদ্র বা অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বড় রকম সহায়ক হবে। এমনকি টাকার অভাবে কারো চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে না।
তবে চিকিৎসা-ব্যয় সম্পর্কিত গবেষকদের মতে, পরীক্ষামূলকভাবে পরিচালিত বীমা কার্যক্রম খুব একটা আশার আলো দেখাতে পারছে না। কারণ বীমার কার্যক্রমের আওতায় থাকা কেন্দ্রগুলোতেও অপেক্ষাকৃত সচ্ছল বা ধনীদের সেবা নেওয়ার হার অনেক বেশি। ওই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্য বীমা করলেই হবে না, দিনে দিনে চিকিৎসা-ব্যয় বেড়ে যাওয়া রোধ করার দিকেও নজর দিতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে অনিয়ম-দুর্নীতিও রোধ করতে হবে। কারণ ওষুধ ও চিকিৎসা যন্ত্রপাতির দাম বাড়ার পাশাপাশি চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মীদের দায়িত্বে অবহেলা এবং যন্ত্রপাতি সঠিক ব্যবহার না করার কারণেও মানুষের ব্যয় বেড়ে যায়।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, এরই মধ্যে ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে স্যোশাল হেলথ প্রোটেকশন স্কিম পরিচালিত হচ্ছে। এ ছাড়া গার্মেন্ট শ্রমিকসহ কিছু প্রাইভেট সেক্টরেও স্বাস্থ্য বীমা নিয়ে কাজ চলছে।
আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণাকেন্দ্র- আইসিডিডিআরবির হেলথ ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিং রিসার্চ গ্রুপের সমন্বয়কারী ড. জাহাঙ্গীর এ এম খান জানান, বাংলাদেশে চিকিৎসার পেছনে মানুষের নির্ধারিত আয়ের বড় অংশ ব্যয় হয়। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে ভিটেমাটি, ফসলের জমি, গৃহপালিত পশু ও জরুরি ব্যবহার্য জিনিসপত্র বিক্রি কিংবা ঋণ করতে হয়। অনেক সময় তাতেও কুলায় না, ফলে মানুষের কাছ থেকে সাহায্য নেওয়ার জন্য সংবাদমাধ্যমে আবেদন জানাতে হয়।
ওই গবেষক জানান, পাইলট আকারে শুরু হওয়া স্বাস্থ্য বীমা থেকে এ খাতে সুবিধার হার শূন্যের কোঠায় রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকারের পাশাপাশি বাংলাদেশের সংবিধানেও দেশের নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু সরকার এ ক্ষেত্রে অনেক বেশি পিছিয়ে আছে।
সরকারের হেলথ ইকোনমিকস ইউনিটের মহাপরিচালক আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের দেশের মানুষের চিকিৎসার কথা বললেই সবাই ডাক্তারের কথা ভাবে। কিন্তু শুধু ডাক্তার বা ডাক্তারখানার মধ্যেই চিকিৎসা সীমাবদ্ধ নয়, এর আগে-পরে আরো বহু বিষয় আছে। চিকিৎসার সঙ্গে যেমন জনবল জরুরি, যন্ত্রপাতি জরুরি, তেমনি খরচটাও জরুরি। এখন খরচ ছাড়া কোথাও চিকিৎসা হয় না। চিকিৎসা খরচে ধনী-গরিবের বৈষম্যও অনেক বড়। অর্থের জোরে ধনীরাই গরিবের চেয়ে বেশি চিকিৎসা সুবিধা পেয়ে থাকে। গরিবরা চিকিৎসাবঞ্চিত হওয়ার অন্যতম কারণও হচ্ছে খরচের জোগান দিতে না পারা। আবার চিকিৎসার পেছনে ব্যয় মেটাতে গিয়ে নিঃস্ব হওয়ার ব্যাপকতাও বাড়ছে।’ ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এসব বৈষম্য রোধে এবং সব মানুষের জন্য সমান স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষার স্বার্থেই আমরা স্বাস্থ্য বীমা নিয়ে কাজ করছি। এমনকি এ-সংক্রান্ত একটি আইনেরও খসড়ার কাজ চলছে।’
স্বাস্থ্য বীমার রূপরেখা সম্পর্কে ওই কর্মকর্তা বলেন, সব মানুষই নির্ধারিত হারে প্রিমিয়াম দেবেন। এর সুবাদে যখন যার চিকিৎসার প্রয়োজন হবে, তখন তিনি প্রয়োজনীয় সব চিকিৎসা পাবেন। যার চিকিৎসার প্রয়োজন পড়বে না তিনি ওই বীমার কোনো সুবিধাও ভোগ করতে পারবেন না, কিন্তু প্রিমিয়াম ঠিকই দিতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় একের টাকায় অন্যরাও চিকিৎসা পাবেন, বিশেষ করে গরিবদের চিকিৎসায় ধনীদের আর্থিক অংশগ্রহণমূলক সহায়তার বাধ্যবাধকতা থাকবে।
তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ ই মাহবুব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইউনির্ভাসেল হেলথ কাভারেজের আওতায় স্বাস্থ্য বীমার উদ্যোগ খারাপ নয়। তবে কথা হচ্ছে একেবারেই হতদরিদ্র মানুষ কিভাবে এর সুবিধা ভোগ করবে? যারা প্রিমিয়ামটুকুও দিতে অক্ষম তাদের ক্ষেত্রে এই বীমার কার্যকারিতা ঠিক করতে হবে। পাশাপাশি প্যাকেজের ভেতরে কোন পর্যায়ের চিকিৎসাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে কিংবা কতটুকু পর্যন্ত এর সীমা থাকবে সেগুলো আরো ভালো করে বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ উন্নত দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের গড়পড়তা হিসাব করে ইউনির্ভাসেল হেলথ কাভারেজের পথে হাঁটলে সুফল আসবে না।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, দেশে পরীক্ষামূলকভাবে এখন পর্যন্ত যেসব স্বাস্থ্য বীমার কাজ চলছে সেগুলোতে দেখা যায়, কোথাও মাসে ১০ টাকা কিংবা ৩০ টাকা হারে প্রিমিয়াম জমা নেওয়া হচ্ছে। এর ভিত্তিতে নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের একটি বীমা কার্ড ইস্যু করা হয়। ওই কার্ড দেখিয়ে প্রয়োজন মতো সুবিধা ভোগ করতে পারা যায়। এ ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও সর্বোচ্চ পাঁচ দিন হাসপাতালে ভর্তি থাকা এবং চার হাজার টাকা পর্যন্ত বিল পরিশোধের সুযোগ থাকছে। যদিও একেক সংস্থায় একেক ধরনের নিয়ম চালু আছে।
সূত্র - দৈনিক কালের কণ্ঠ

