রিকশাভ্যানে ফেরি করে সবজি বেচা আয় দিয়ে সংসার চলত জাহাঙ্গীর হোসেনের। বাসের ধাক্কায় ভ্যান উল্টে জাহাঙ্গীরের কোমরের হাড় ভেঙে গেলে দীর্ঘদিন হাসপাতালে থেকে চিকিৎসা নিতে হয় তাঁকে। বন্ধ হয়ে যায় আয়ের পথ। প্রথমে ধার-দেনা করে, পরে গরু, ভিটেমাটি সব বিক্রি করে এবং শেষে সমিতির কাছ থেকে ঋণে টাকা নিয়ে চলে চিকিৎসা। দুই মেয়ে, এক ছেলের পড়াশোনাও বন্ধ হয়ে যায়। পেট চালানোর দায়ে জাহাঙ্গীরের স্ত্রী সাবিনা আক্তার বাড়ি বাড়ি ঝিয়ের কাজ নেন। তাতে কি আর সব খরচ সামাল দেওয়া যায়? ধার-দেনা শোধ করতে না পারায় পাওনাদারদের গালমন্দ শুনতে শুনতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন সাবিনা। একপর্যায়ে নিরুপায় গৃহবধূ বিভিন্ন স্থানে ধরনা দেন নিজের কিডনি বিক্রি করে স্বামীর চিকিৎসা চালানো, পরিবারের ভরণপোষণ ও পাওনা পরিশোধ করতে। কিন্তু আইনগত সীমাবদ্ধতার কথা শুনে শেষ পর্যন্ত মানসিক চাপ সইতে না পেরে বেছে নেন আত্মহত্যার পথ।
চিকিৎসা খরচ জোগাতে গিয়ে নিঃশেষ হওয়ার উদাহরণ হিসেবে এখনো বিভিন্ন সভা-সেমিনারেও আলোচিত হয় বরিশাল নগরের বেলতলা এলাকার এই মর্মস্পর্শী ঘটনা।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর ইকবাল রোড মাঠের পাশে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ডাক্তারের পরামর্শপত্র এক হাতে নিয়ে আরেক হাত মানুষের দিকে বাড়িয়ে দেন মাসুমা বেগম। কোলে জড়িয়ে ধরে আছেন দেড়-দুই বছরের এক সন্তানকে। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল পানি। জানতে চাইলে মাসুমা জানান, তাঁর বাবাকে চিকিৎসার জন্য ৯ দিন আগে এনে ভর্তি করান পঙ্গু হাসপাতালে। টাকাপয়সা যা ছিল সব শেষ হয়ে গেছে আরো তিন-চার দিন আগেই। বাড়িতেও বিক্রির মতো কিছু নেই। উপায় নেই ধার-দেনা করার। তাই এখন বাবার চিকিৎসার জন্য ভিক্ষার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। মাসুমা জানান, হাসপাতালে কিছু ওষুধ আর খাবার দেওয়া হলেও প্রতিদিনই কোনো না কোনো ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষায়ও টাকা দিতে হয়। নিজেদের খাবার খরচও চালাতে হয় বাইরে থেকে।
কেবল এ মাসুমা বা সাবিনাই নন, প্রতিদিনই কোনো না কোনো সংবাদপত্র বা গণমাধ্যমে চোখে পড়ে ‘সাহায্যের আবেদন’। এসব আবেদনের প্রায় প্রতিটিতেই চিকিৎসা চালাতে গিয়ে নিঃস্ব হওয়ার ঘটনা থাকে। নড়াইল সদর উপজেলার বাগ শ্রীরামপুর গ্রামের সৈয়দ আবু সালেহিনের দুটি কিডনিই বিকল হয়ে গেছে। ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালে সপ্তাহে দুই দিন ডায়ালাইসিস করাতে হচ্ছে। বিকল্প হিসেবে কিডনি প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা থাকলেও নানা জটিলতায় তা সম্ভব হচ্ছে না। আবার ডায়ালাইসিসের খরচ চালাতে গিয়ে সালেহিন এখন প্রায় নিঃস্ব। তাই মানুষের কাছে সাহায্যের আবেদন করে একটি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়েছেন গত ৫ ফেব্রুয়ারি। একইভাবে প্রতি সপ্তাহে ২৪ হাজার টাকা করে চিকিৎসা খরচ চালাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ায় গত ৯ ফেব্রুয়ারি সাহায্যের আবেদন জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছেন সাবেক এক সরকারি কর্মকর্তার স্ত্রী ফৌজিয়া সুলতানা। ৭ ফেব্রুয়ারি আরেক সাহায্যের আবেদনের এক বিজ্ঞপ্তিতে গ্রামীণ ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ শক্তির কর্মচারী আনোয়ার হোসেন উল্লেখ করেছেন, চিকিৎসা খরচ চালাতে গিয়ে তিনি প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। তাই তিনি দানশীল ও বিত্তবানদের প্রতি সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন। দেশে সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় দিনে দিনে ব্যাপক উন্নতি ও সরকারি হাসপাতালে বিনা মূল্যে চিকিৎসার সুযোগের কথা বলা হলেও কেন চিকিৎসা নিতে গিয়ে মানুষকে নিঃস্ব হতে হচ্ছে, তা জানতে চাইলে সরকারের হেলথ ইকোনমিকস ইউনিটের মহাপরিচালক আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের দেশের মানুষের চিকিৎসার কথা বললেই সবাই ডাক্তারের কথা ভাবে। কিন্তু শুধু ডাক্তার বা ডাক্তারখানার মধ্যেই চিকিৎসা সীমাবদ্ধ নয়, এর আগে-পরে আরো বহু বিষয় আছে। চিকিৎসার সঙ্গে যেমন জনবল জরুরি, যন্ত্রপাতি জরুরি, তেমনি খরচটাও। এখন খরচ ছাড়া কোথাও চিকিৎসা হয় না। অর্থের জোরে ধনীরাই বেশি চিকিৎসা সুবিধা পেয়ে থাকে। গরিবদের চিকিৎসাবঞ্চিত হওয়ার অন্যতম কারণও খরচ জোগান দিতে না পারা। আবার চিকিৎসার পেছনে ব্যয় মেটাতে গিয়ে নিঃস্ব হওয়ার ব্যাপকতাও বাড়ছে।’
আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘সম্প্রতি বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলাদেশ সরকার ও শ্রীলঙ্কান একটি সংস্থার সমন্বয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় আমরা দেখতে পেয়েছি, দেশে বিভিন্ন কারণে নিঃস্ব হয়ে পড়া মানুষের প্রায় ২০ শতাংশ চিকিৎসা খরচ জোগান দিতে গিয়ে নিঃস্ব হয়েছে।’
আন্তর্জাতিক উদারাময় রোগ গবেষণা কেন্দ্র- আইসিডিডিআরবির হেলথ ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিং রিসার্চ গ্রুপের সমন্বয়কারী ড. জাহাঙ্গীর এ এম খান জানান, বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে সর্বশেষ এক গবেষণা অনুসারে দেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে। অন্যদিকে ধনী-গবির নির্বিশেষে ৬৪ শতাংশ মানুষকে পকেটের টাকা খরচ করে চিকিৎসাসেবা নিতে হচ্ছে। চিকিৎসার পেছনে মানুষের নির্ধারিত আয়ের বড় অংশ ব্যয় হওয়া ছাড়াও ভিটেমাটি, ফসলি জমি, গৃহপালিত পশু ও জরুরি ব্যবহার্য জিনিসপত্র বিক্রি, ঋণ করা, মানুষের কাছ থেকে সাহায্য নেওয়ার মতো উপায় বেছে নিতে হচ্ছে।
চিকিৎসার কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়া পরিবারগুলোকে নিয়ে সর্বশেষ সরকারের ২০১০ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিটি গরিব পরিবারে চিকিৎসা খরচের ৬৯ শতাংশ আসে আয় থেকে, ২১ শতাংশ আসে জমানো টাকা থেকে, ৪ শতাংশ আসে জমিজমা বিক্রি করে, ১১ শতাংশ চলে ধারদেনা করে, ৭ শতাংশ চলে মানুষের কাছ থেকে সাহায্য বা চাঁদা নিয়ে, ৩ শতাংশ আসে অন্যান্য প্রক্রিয়ায়।
আইসিডিডিআরবির গবেষক ড. জাহাঙ্গীর এ এম খান জানান, রাষ্ট্র বা সরকারের ওপর দেশের নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দায় থাকলেও বাস্তবে নাগরিকদের চিকিৎসার পেছনে সরকারের খরচ থাকে মাত্র ২৬ শতাংশ। এ ছাড়া ৮ শতাংশ আসে দাতাদের কাছ থেকে, মাত্র ১ শতাংশ করে দেওয়া হয় প্রাইভেট ও এনজিও খাত থেকে। পাশাপাশি পাইলট আকারে শুরু হওয়া বীমা থেকে এ খাতে সুবিধার হার এখনো ১ শতাংশের নিচে। তবে কমিউনিটি স্বাস্থ্য বীমা এ ক্ষেত্রে কার্যকর একটি পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে, যাতে করে মানুষ নিজের সাধ্যমতো আয় থেকে একটি নির্দিষ্ট হারে টাকা চিকিৎসার জন্য অংশীদার ভিত্তিতে জমা রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকারের পাশাপাশি বাংলাদেশের সংবিধানেও দেশের নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু সরকার এ ক্ষেত্রে অনেক বেশি পিছিয়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, কেবল ওষুধ কেনা কিংবা হাসপাতালে ডাক্তার দেখানোর পেছনের খরচই সাধারণত হিসাবে আসে। কিন্তু রোগীদের সঙ্গে পরিবার-পরিজনের থাকা-খাওয়া কিংবা যাতায়াতেও বড় ধরনের খরচ হয়। সেটা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হিসাবে ধরা হয় না। তাই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষাভাবে চিকিৎসার পেছনে ব্যয়ের অংশ অনেক বড় হয়ে যায়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ ই মাহবুব কালের কণ্ঠকে বলেন, চিকিৎসাও এখন রীতিমতো ব্যবসা হয়ে গেছে, একেকটি হাসপাতাল এখন ফাইভ স্টার হোটেলের মতো ফাইভ স্টার হাসপাতালে পরিণত হচ্ছে, যেখানে গরিব মানুষের কোনো জায়গা নেই। আর সরকারি ব্যবস্থাপনায়ও এখন আর বিনা মূল্যে চিকিৎসার সুযোগ নেই। সব জায়গায় এখন টাকা দিয়ে চিকিৎসাসেবা কিনতে হচ্ছে। ফলে চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে নিঃস্ব হওয়াটাই স্বাভাবিক।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. খন্দকার মো. শিফায়েত উল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকারি হাসপাতালে এখন প্রায় ৯৫ শতাংশ ওষুধ ফ্রি দেওয়া হয়। গরিব মানুষের বেড ভাড়া দিতে হয় না, খাওয়া খরচ দিতে হয় না। এমনকি মাঝেমধ্যে পরীক্ষাও ফ্রি করা হয়। তবে সচ্ছল ব্যক্তিদের জন্য ইউজার ফি, বেড ভাড়াসহ আরো কিছু খরচ দিতে হয়।
তবে মহাপরিচালক বলেন, কোনো কোনো হাসপাতালে এখনো দালালচক্র রয়েছে, যাদের কবল থেকে চিকিৎসাসেবাকে মুক্ত করা যাচ্ছে না। এ ধরনের দালাল বা অসাধু চক্রের কারণে রোগীরা যেমন হয়রানি হচ্ছে, তেমনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই এ ধরনের তৎপরতার বিরুদ্ধে রোগীসহ সবাইকে সচেতন হওয়া প্রয়োজন ।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলেন, ওষুধের দাম বৃদ্ধি থেকে শুরু করে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বেপরোয়া ফি আদায়ের ফলেও মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ক্ষেত্রে সরকারের দিক থেকে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। বেসরকারি ক্ষেত্রে এ খাত খুবই ভয়ংকর হয়ে উঠছে। অনেকে চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে এখন রোগ হলেও চিকিৎসকের কাছে যেতে ভয় পায়। রোগ চেপে রাখে কিংবা নিজেরা অনুমানে অসুধ সেবন করতে গিয়ে আরো বড় সর্বনাশ ডেকে আনে। এ ছাড়া গ্রামে ভালো চিকিৎসক না থাকায় গ্রামের মানুষের শহরে আসা-যাওয়ার পেছনেও অনেক খরচ হয়ে যায়।
সূত্র - দৈনিক কালের কণ্ঠ

