চিকিৎসাধীন এক রোগী মৃত্যুর আগে যখন যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন, তখন বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও সেই রোগীকে দেখতে দায়িত্বরত ইন্টার্নি চিকিৎসক ওয়ার্ডে আসেননি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। উপরন্তু রোগীর মৃত্যুর পর তাঁর স্বজনদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডার জের ধরে ওই ওয়ার্ডের সব রোগীর স্বজনকে একটি কক্ষে আটকে রেখে মারধর করেন ইন্টার্নি চিকিৎসকরা। বিষয়টি জানতে পেরে স্থানীয় সাংবাদিকরা খবর সংগ্রহে গেলে তাঁদের ক্যামেরা ছিনতাই ও মারধর করে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। পরে খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে অবরুদ্ধ সাংবাদিক ও রোগীর স্বজনদের উদ্ধার করে। গত মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এ ঘটনা ঘটে।
এদিকে নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ তুলে ইন্টার্নি চিকিৎসকরা গতকাল বুধবার ধর্মঘট পালন করেছেন। অন্যদিকে হামলাকারী ইন্টার্নি চিকিৎসকদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও উপযুক্ত শাস্তি দেওয়ার দাবিতে শহরে সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা।
মারা যাওয়া ওই রোগীর নাম আয়েশা খাতুন। তাঁর বাসা ময়মনসিংহ শহরের গোল পুকুরপাড় এলাকায়। তিনি হাসপাতালের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তাঁর মেয়ে লিপি কালের কণ্ঠকে জানান, মঙ্গলবার রাত পৌনে ১১টার দিকে তাঁর মা অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন, তখন তাঁর স্বজনরা কর্তব্যরত ইন্টার্নি চিকিৎসকের কক্ষে গিয়ে বারবার অনুরোধ করলেও ওই ইন্টার্নি তাঁর মাকে দেখতে ওয়ার্ডে আসেননি। কিছুক্ষণ পর তাঁর মা মারা গেলে উত্তেজিত স্বজনরা ওই ইন্টার্নির সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়ায়। কিছুক্ষণ পর ওই ইন্টার্নি দলবলসহ রড, হকিস্টিক ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে তাঁর স্বজনদের ওপর চড়াও হন এবং মারধর করে একটি কক্ষের ভেতর আটকে রাখেন। একপর্যায়ে হাসপাতালের প্রবেশপথ ও ওয়ার্ডে তালা লাগিয়ে দেন ইন্টার্নি ডাক্তাররা। এরপর সাংবাদিকরা এলে তাঁদেরও অবরুদ্ধ করেন তাঁরা।
হামলার শিকার সাংবাদিকরা জানান, খবর পেয়ে প্রথমে একুশে টিভির সাংবাদিক আতাউর রহমান জুয়েল ওই ওয়ার্ডে গেলে তাঁকে দেখামাত্রই ইন্টার্নি চিকিৎসকরা খেপে যান। দৃশ্য ধারণ করায় জুয়েলকে মারধর করে বের করে দেন এবং তাঁর ক্যামেরা ছিনিয়ে নেন তাঁরা। এরপর চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের রিপোর্টার হোসাইন শহীদ, গাজী টেলিভিশনের কাজী মোহাম্মদ মোস্তফা মুন্না, চ্যানেল নাইনের রিপন গোয়ালা ঘটনাস্থলে গেলে তাঁদেরও মারধর করে ক্যামেরা ছিনিয়ে নিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখেন ইন্টার্নি চিকিৎসকরা। খবর পেয়ে শহর থেকে সাংবাদিক নেতারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ গিয়ে অবরুদ্ধ সাংবাদিক ও রোগীর স্বজনদের উদ্ধার করে।
হামলায় ইন্টার্নি চিকিৎসক তমাল, বিকাশ, অরিজন ও আরিফ নেতৃত্ব দেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে এবং নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে গতকাল হাসপাতালে ধর্মঘট করেন ইন্টার্নি চিকিৎসকরা। এতে চিকিৎসাধীন সাধারণ রোগীরা ব্যাপক বিড়ম্বনার শিকার হয়।
এ প্রসঙ্গে কোতোয়ালি থানার ওসি গোলাম সারওয়ার জানান, খবর পেয়ে তিনি হাসপাতালে ছুটে যান এবং অবরুদ্ধ সাংবাদিক ও রোগীর স্বজনদের উদ্ধার করেন। অভিযুক্ত ইন্টার্নি চিকিৎসকদের কেন ওই সময় আটক করা হলো না- এ প্রশ্নের জবাবে ওসি জানান, এতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের সেবায় ব্যাঘাত ঘটত। তবে কেউ মামলা করলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের ইন্টার্নি চিকিৎসক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিকাশ চন্দ্র পাল বলেন, ওই সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কী হয়েছে, তা তিনি দেখেননি। তিনি দাবি করেন, কোনো ইন্টার্নি চিকিৎসক সাংবাদিকদের ওপর হামলায় জড়িত নয়।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. ফসিউর রহমান এসডিসি বলেন, তিনি প্রশাসনিক কাজে এখন ঢাকায় আছেন। ময়মনসিংহে ফিরে বিস্তারিত জেনে ব্যবস্থা নেবেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে এক শ্রেণীর ইন্টার্নি চিকিৎসক দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। তাঁদের কেউ কেউ ডিউটির সময়ও নেশাগ্রস্ত থাকেন এবং মোবাইল ফোনে কথা বলা এবং টিভির অনুষ্ঠান দেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। রোগীর স্বজনরা ইন্টার্নি চিকিৎসকদের আচরণের প্রতিবাদ করলে তাঁরা দল বেঁধে হামলা করেন এবং রোগীদের জিম্মি করে ধর্মঘটে নামেন।
এদিকে ইন্টার্নি ডাক্তারদের হাতে মারধরের শিকার ও ক্যামেরা ছিনতাইয়ের প্রতিবাদে এবং দোষীদের বিচার দাবি করে গতকাল শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা। মিছিলটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে রেলওয়ে কৃষ্ণচূড়া চত্বরে গিয়ে শেষ হয়।
সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন বিএফইউজের সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল এবং মহাসচিব আ. জলিল ভুঁইয়া। গতকাল এক বিবৃতিতে তাঁরা এ দাবি জানান।
সূত্র - দৈনিক কালের কণ্ঠ

