সিমেন্টের বস্তায় মোড়ানো নবজাতক কন্যাশিশু। নাড়িও কাটা হয়নি ঠিকমতো। পরিচ্ছন্নতাকর্মী নালা থেকে তুলে রাস্তায় রাখলেন। অমনি লেগে গেল মানুষের জটলা। কেউ বাবা-মাকে গালাগাল দিচ্ছে, কেউ উঁকিঝুঁকি মেরে নিজের পথ ধরছেন। এ সময় বন্ধুর বাসায় যাচ্ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী তানজিনা ঊর্মি। জটলার দিকে এক দৃষ্টি দিয়েই মরা বাচ্চা মনে করে নিজের পথ ধরছিলেন তিনিও। চলে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই কেঁদে উঠল শিশুটি। আর পা বাড়াতে পারলেন না ঊর্মি। সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চার পাশে গিয়ে কোলে তুলে নিলেন। ছুটলেন হাসপাতালে। দিনটি ছিল ১৩ মার্চ। ঘটনাস্থল দুই নম্বর গেট চশমাহিল।
ঊর্মির সাথি হলেন পরিচ্ছন্নতাকর্মী বাবুল। প্রথমে দুই নম্বর গেট পর্যন্ত রিকশায়, সেখান থেকে অটোরিকশা নিয়ে সোজা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। গাড়িতে বাবুল জানালেন, নালায় কুড়িয়ে পাওয়া সিমেন্টের বস্তায় বাচ্চাটা পান তিনি। কিন্তু সাহসে কুলাচ্ছিল না হাসপাতালে নেওয়ার। এর মধ্যে গাড়িতে থাকতেই বন্ধু ওমর ফারুক ও বর্ষণ সিয়ামকে খবর দিয়েছেন ঊর্মি। তাঁরাও হাসপাতালে এসে হাজির। শুরু হলো শিশুটির চিকিৎসা। পাশে নির্ঘুম ঊর্মি। মায়ের মমতায় পরিচর্যা করলেন। মেয়ের নাম রাখলেন নিধি। শুধু ঊর্মি একা নন, পালা করে থাকলেন ওমর, বর্ষণ, রুমু, ইরফান, রাশেদ ও শুভ। কেউ নিধির জন্য জামা, কেউ কিনে এনেছেন ওষুধ আর পথ্য। হাসপাতালের চিকিৎসক ও সেবিকারাও এই তরুণদলকে উৎসাহ দিলেন। সবার প্রচেষ্টায় তিন দিন পর সুস্থ হলো নিধি।
ঊর্মি বলেন, ‘তাকে যখন নালার পাশ থেকে কোলে নিই তখন মাথায় আর কিছু ছিল না। শুধু কীভাবে হাসপাতালে পৌঁছাব সে চিন্তা ছিল। যেভাবে হোক বাঁচাতে হবে।’
এদিকে হাসপাতালে থাকার সময়ই মুঠোফোনের মাধ্যমে ফেসবুকে নিজের ওয়ালে নিধির ছবি আপলোড করেন ঊর্মি। মুহূর্তেই ঝড় ওঠে ফেসবুকে। বাহবা আর প্রশংসায় ভরে যায় মেসেজের ইনবক্স। অনেকেই নিধিকে দত্তক নেওয়ার আগ্রহ দেখান। এর সংখ্যাও কম নয়, কম করে দুই শতাধিক। এবার বিপাকে পড়লেন ঊর্মি ও তাঁর বন্ধুরা। কার কোলে তুলে দেবেন। এ নিয়ে সবাই বসলেন, ভাবলেন কী করবেন। প্রথম দিকে ঊর্মি নিধিকে নিজের কাছে রাখার চিন্তা করলেও ঠিক করলেন নিঃসন্তান কোনো দম্পতির হাতে তুলে দেবেন। এতে দুটি কাজ হবে—নিধি মায়ের পূর্ণ স্নেহ পাবে আর ওই দম্পতি পাবে সন্তান। কিন্তু এতজন থেকে একজন ঠিক করা তো দুরূহ বটে। এভাবে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলল একদিন। শেষে অনেক যাচাই-বাছাই আর খোঁজখবরের পর পাওয়া গেল সেই দম্পতিকে যেখানে আসল ঠিকানা হলো নিধির। ঢাকার বাসিন্দা এই দম্পতি নিধিকে পেয়ে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন। নিঃসন্তান এই দম্পতি ১৪ মার্চই চলে আসেন চট্টগ্রাম। হাসপাতালে কাটিয়েছেন এই তরুণদের সঙ্গে। আর ১৬ মার্চ বিকেলে ঢাকা ফেরেন কোল আলো করা ফুটফুটে সন্তান নিয়ে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নবজাতক বিভাগের প্রধান চৌধুরী চিরঞ্জীব বড়ুয়া বলেন, ‘এই তরুণদের চেষ্টায় শিশুটি বেঁচে গেল। হাসপাতালে আনার পর আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি। ফলে নতুন জীবন পেল শিশুটি।’
ঊর্মি বলেন, ‘মানুষ কীভাবে এত পাষাণ হয়! নাড়িছেঁড়া ধনকে কেউ এভাবে ফেলে যায়! নিধির কোনো সমস্যা ছিল না। ওজন ছিল আড়াই কেজির ওপরে। শুধু নালার নোংরা পানি লাগায় ইনফেকশনের ঝুঁকি ছিল। কিন্তু সেটা আর কাবু করতে পারেনি আমাদের নিধিকে। সে এখন ভালো আছে। যখন তাকে বিমানবন্দরে দিতে গেছি, কষ্ট হচ্ছিল। যেন নিজের কাউকে তুলে দিচ্ছি অন্যের হাতে। আবার তৃপ্তিও ছিল আমাদের নিধি তো এমন এক পরিবারে যাচ্ছে, যেখানে তার জন্য উন্নত ভবিষ্যতের হাতছানি।’
অবশেষে ঊর্মির ফেসবুক ওয়ালে আরেকটি স্ট্যাটাস, ‘সন্তুষ্টচিত্তে এবং আনন্দাশ্রু দিয়ে বিদায় দিলাম নিধিকে। অবশেষে আমাদের মেয়ে এখন নিজের পরিবারে। সবাই দোয়া করবেন তার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য। স্বপ্নের মতো এসে চলে গেল আমাদের মেয়ে নিধি। সুখের ঠিকানায় দিয়ে গেল অনেক আনন্দের স্মৃতি।’
সূত্র - প্রথম আলো

