রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট থেকে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার গণেশপুর পূর্বপাড়া গ্রাম। গতকাল বুধবার সকাল থেকেই এই দুই জায়গায় চারজন মানুষের স্বজনেরা কেঁদেছেন, আর্তনাদ করেছেন। হরতাল-অবরোধে পেট্রলবোমা হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন এই চারজন।
শিবগঞ্জের গণেশপুরের বাসিন্দা মিলন রহমান প্রামাণিক (২৫) ও এমরান আলী প্রামাণিক (২২) ট্রাকে সবজি ও আলু নিয়ে ঢাকা যাওয়ার পথে মঙ্গলবার রাতে সিরাজগঞ্জে পেট্রলবোমা হামলার শিকার হন। ট্রাকটি উল্টে যায়। দগ্ধ হয়ে মারা যান মিলন ও এমরান। দগ্ধ ট্রাকচালক সাফাত প্রামাণিকের (৪০) অবস্থাও আশঙ্কাজনক। এ ঘটনায় আরও আহত হন মছির উদ্দিন (৪৫), মোফাজ্জল হোসেন (৩৫) ও এমদাদুল হক (৪৫)।
আর গত শুক্রবার রাজধানীর পরীবাগে একটি বাসে পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ হয়ে বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ফল ব্যবসায়ী ফরিদ মিয়া (৫০) ও বিমা কর্মকর্তা শাহীনা আক্তার (৪৫)।
গত অক্টোবর থেকে নিয়মিত বিরতিতেই বার্ন ইউনিটে হরতাল-অবরোধে সহিংসতার বলি হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন কেউ না কেউ। বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন পার্থ শংকর পাল বলেন, ২৬ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত অবরোধ-হরতালে নাশকতার আগুনে দগ্ধ অন্তত ১৪০ জন বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নিতে আসেন। ৩৬ জন এখনো চিকিৎসাধীন। এই সময়ে বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
তবে বগুড়ার শিবগঞ্জের নিভৃত গ্রাম গণেশপুরের মানুষের কাছে এ রকমভাবে স্বজন হারানোটা অনেকটা বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। এই গ্রাম ও আশপাশের গ্রামে প্রচুর সবজি উৎপাদিত হয়। গ্রামের অনেক তরুণ-যুবকই সবজি উৎপাদন ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। হরতাল-অবরোধের কারণে স্থানীয় বাজারে সবজির দাম নেই। তাই অনেকটা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন কিছু মানুষ সবজি নিয়ে ঢাকায় আসেন।
মিলন আর এমরানও মঙ্গলবার সারা দিন আরও তিন সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামের আশপাশের গ্রাম ঘুরে ঘুরে ফুলকপি, নতুন আলু কিনে ট্রাক বোঝাই করেন। হরতাল আর বাড়বে না এমন আশাতেই সন্ধ্যার দিকে ট্রাকবোঝাই সবজি নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। রাত আটটার দিকে ট্রাকটি বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম সংযোগ সড়কের সিরাজগঞ্জের হোড়গাঁতীতে এলে কিছু লোক পেট্রলবোমা ছুড়ে মারে ট্রাকটি লক্ষ্য করে। চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে জ্বলন্ত ট্রাকটি রাস্তার পাশের খাদে পড়ে যায়। সেখান থেকে রাতেই এমরানের লাশ উদ্ধার হয়। গতকাল সকালে ট্রাকটি উল্টালে মেলে মিলনের লাশ। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় ট্রাকচালক সাফাত প্রামাণিককে প্রথমে সিরাজগঞ্জ সদর হাসপাতালে ও পরে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এই হাসপাতালের চিকিৎসক শহিদুল্লাহ দেওয়ান জানান, তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাঁর মুখমণ্ডল, বুক, শ্বাসনালিসহ শরীরের ৪০ ভাগ পুড়ে গেছে।
গতকাল গণেশপুর গ্রামে এমরানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, এমরানের মা সানোয়ারা বেগম বাড়ির আঙিনায় মাটিতে আছড়ে-পিছড়ে কাঁদছেন। কেউ তাঁকে উঠিয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। আর কেউ চোখ মুছতে মুছতে শুধুই দেখছেন। উপস্থিত গ্রামবাসীর কাছে মায়ের আর্তনাদ, ‘আমার সোনা-মানিকরে আপনারা ফিরায়া দেন। হামি আর কিছু চাই না।’ একই দাবি বারবারই জানাচ্ছিলেন এই মা। এমরান মহাস্থান ডিগ্রি কলেজে স্নাতক শ্রেণীতে পড়তেন। পাশাপাশি ব্যবসা আর সেনাবাহিনীতে চাকরি নেওয়ার জন্য শরীরচর্চা করতেন।
আর মিলন মাত্র এক বছর আগে বিয়ে করেছেন। বাবা লুৎফর রহমানের শরীর ভেঙে এসেছে। তাই সবজির ট্রাকে নিজেই ঢাকায় আসতেন। চার সদস্যের পরিবারটির বোঝা অল্প বয়সেই নিজের মাথায় তুলে নিয়েছিলেন। এখন বাবা-মায়ের আক্ষেপ, কেন তাঁকে ঢাকা যেতে দিলেন। বাবার ক্ষোভ, ‘হামরা কুনো রাজনীতি করি ন্যা। তাও হামার ছোলডারে মারলো ক্যা।’
ওই ট্রাকে পেট্রলবোমা নিক্ষেপের ঘটনায় ২০ জনের নাম উল্লেখ করে সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা থানায় একটি মামলা করেছে পুলিশ। এ মামলায় গতকাল ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বার্ন ইউনিটের নিত্য আহাজারি: সহিংসতার শিকার হয়ে মানুষের মৃত্যুটা যেন নিত্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বার্ন ইউনিটে। গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতে বিমা কর্মকর্তা শাহীনার স্বজনদের আহাজারি থামতে না থামতেই গতকাল সকালে মারা যান একই হামলায় দগ্ধ ফরিদ মিয়া।
শাহীনা আক্তারের স্বামী সাংবাদিক এফ জামান জানান, খুলনা শহরের টুটপাড়ায় তাঁদের বাড়ি। তবে চাকরির প্রয়োজনে শাহীনা তেজগাঁওয়ের এলেনবাড়ি এলাকায় বিমানবাহিনীর কোয়ার্টারে বোনের সঙ্গে থাকতেন। টানা অবরোধের কারণে তিনি বাড়িতে যেতে পারছিলেন না। তাই গত শুক্রবার নাশকতা হবে না ভেবে বাসা থেকে বের হন খুলনা যাওয়ার জন্য। খুলনার বাস ধরতে গুলিস্তানে যাওয়ার সময় পরীবাগে সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে পেট্রলবোমা হামলার শিকার হন তাঁরা। শাহীনার শরীরের ৬৪ ভাগ পুড়ে যায়। দগ্ধ হন আরও তিনজন।
শোকে বিহ্বল জামান বলেন, ‘এভাবে আর কত দিন? আর কত মানুষ মরবে এভাবে? প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীর কাছে আমি জানতে চাই, কবে এসব বন্ধ হবে?’
পরিবারের সদস্যরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আপনারা শুধু ছবি তুলছেন আমাদের, সংবাদ হচ্ছে। কিন্তু কারও কোনো শাস্তি হচ্ছে না। কী লাভ এসব করে।’
ছোট ছেলের কথা রাখেননি ফরিদ: ৩ জানুয়ারি শাহীনার সঙ্গে একই বাসে দগ্ধ হয়ে ফল ব্যবসায়ী ফরিদের শরীরের ৪৮ ভাগ পুড়েছিল। এরপর তাঁর আট বছরের ছেলে লিটন বাবাকে বলেছিল, ‘তোমার কিছুই হইব না, আব্বা।’ কিন্তু শেষ পর্যন্ত লিটন বাবাকে ধরে রাখতে পারেনি। গতকাল ছোট লিটনকে ধরে রাখা যাচ্ছিল না। ছোট শিশুটি বারবার ছুটে বাবার লাশের কাছে যাচ্ছিল।
স্ত্রী আর তিন ছেলে নিয়ে রাজধানীর মানিকদি বালুর ঘাট এলাকায় থাকতেন ফরিদ। ওই এলাকাতেই ফুটপাতে ফলের ব্যবসা করতেন। শুক্রবার সকালে বাসে বাদামতলী যাচ্ছিলেন ফল কিনতে।
ফরিদের বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে। বাকি তিন ছেলের মধ্যে স্বপন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী। স্বপন বলেন, এই পাঁচ দিনে তাঁদের অন্তত ২২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ধার-দেনা হয়েছে। ক্ষুব্ধ স্বপন বলেন, ‘টিভি খুললেই খালি দেহি সবাই কয় নাশকতা বন্ধ করেন। কিন্তু কেউ আমাগো পাশে দাঁড়ায় নাই। একজনও আইসা আমার বাপের খোঁজ নেয় নাই। আপনি এখন এই সব কিচ্ছা শুইনা কী করবেন।’
সূত্র - প্রথম আলো

