বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির (বিসিডিএস) আহ্বানে ওষুধের দোকানে ধর্মঘটে গতকাল বৃহস্পতিবার সারা দিন ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সারা দেশের রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। রাত ১০টা পর্যন্ত এই ধর্মঘট ডাকা হলেও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সঙ্গে বৈঠকের পর সন্ধ্যায় ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় বিসিডিএস।
সে অনুযায়ী সন্ধ্যা ছয়টার পর ওষুধের দোকান খুলেছে। তবে রাজধানীতে ওষুধের পাইকারি বাজার মিটফোর্ড রোডের দোকানগুলো স্বাভাবিক সময়ে সন্ধ্যায় বন্ধ হয়ে যায় বলে সেগুলো আর খোলেনি। কারাদণ্ড পাওয়া ওষুধ ব্যবসায়ীদের মুক্তি, বৈধ ও অবৈধ ওষুধের তালিকা প্রকাশসহ আট দফা দাবিতে গতকাল সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বিসিডিএস সারা দেশে ওষুধের দোকান বন্ধ রাখার কর্মসূচি দিয়েছিল।
বিকেলে বিসিডিএসের সভাপতি মো. সাদেকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, মতিঝিলে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে বিসিডিএসের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে অধিদপ্তর আট দফা দাবি মেনে নেওয়ায় তাঁরা ধর্মঘট প্রত্যাহার করেন। রাজধানীসহ সারা দেশের ওষুধ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সন্ধ্যা ছয়টায় সব দোকান খুলতে বলা হয়েছে।
গতকাল সকাল থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত রাজধানীর মিটফোর্ড রোড, শেরেবাংলা নগরের নয়টি হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আশপাশসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, সব ওষুধের দোকান বন্ধ। অনেক স্থানে ওষুধ ব্যবসায়ীদের বন্ধ দোকানের সামনে অবস্থান করতে দেখা যায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-২-এর উদ্বোধন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগমনের কারণে ওই এলাকায় সকাল নয়টা থেকে এক ঘণ্টা ওষুধের দোকান খোলা রেখেছিলেন ব্যবসায়ীরা।
ওষুধ ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটে দুর্ভোগ পোহান ভুক্তভোগী মানুষ। কয়েকজন ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, জরুরি বলে ওষুধের দোকান হরতালের আওতামুক্ত রাখা হয়, অথচ সেই ওষুধের দোকানই গতকাল বন্ধ রইল।
দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের প্রধান ফটকে সুফিয়া ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর সন্তানসম্ভবা বোন রিপা আক্তারের সিজার হওয়ার কথা ছিল। চিকিৎসক এ জন্য ওষুধ ও চিকিৎসা উপকরণের নাম লিখে দেন। হাসপাতালে সরবরাহ না থাকায় তিনি ওই ওষুধ ও উপকরণ কেনার জন্য হাসপাতালের আশপাশসহ চানখাঁরপুল পর্যন্ত গিয়েও ওষুধের কোনো দোকান খোলা পাননি। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ওষুধের দোকান বন্ধ থাকায় তাঁর বোনের সিজার হলো না।
বাদশা মণ্ডল নামের একজন বলেন, তাঁর সাত বছর বয়সী ছেলে ক্যানসারে আক্রান্ত মুশফিকুর রহমান ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন। ১৫ দিন পর পর তার জন্য চার হাজার টাকার লাগে। গতকাল ডোজ দেওয়ার নির্ধারিত তারিখ ছিল। কিন্তু হাসপাতালে ওষুধ পাওয়া যায়নি। টাঙ্গাইল থেকে আসা বাদশা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি গরিব কৃষক। বহু কষ্টে টাকা জোগাড় করলেও ওষুধ কিনতে পারলাম না। ওষুধ দিতে না পারায় ছেলের আবার না ক্ষতি হয়।’ এমন দুর্ভোগের কথা জানান ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর স্বজন সোলায়মান মিয়া, বকুল সাহা, সাবিহা বেগমসহ আরও অনেকে।
শেরেবাংলা নগরে জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের উল্টো পাশের কয়েকটি দোকানজুড়ে থাকা ব্যানারে লেখা ছিল, ‘নকল, ভেজাল, মেয়াদোত্তীর্ণ ও অনুমোদনবিহীন ওষুধ ক্রয়-বিক্রয়কে সর্ব অবস্থায় না বলুন।’ জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট পরিচালিত একটি ওষুধের দোকান ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চত্বরে আরেকটি দোকান খোলা ছিল। সেখান থেকে মানুষ রোগীদের জন্য ওষুধ কিনেছেন।
এদিকে বিসিডিএসের পক্ষ থেকে মিটফোর্ড রোডে তিনটি ওষুধের দোকান খোলা রাখা হয়। সারা দিনই এসব দোকানে ছিল ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। ক্রেতাদের মধ্যে হুড়োহুড়ি ও বাদানুবাদও হয়। একটি দোকানের সামনে নাসরিন জাহান নামের একজন বলেন, ‘এত বড় এলাকায় মাত্র তিনটি দোকান খোলা। ভিড়ের কারণে মিটফোর্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন গুরুতর অসুস্থ স্বজনের জন্য ওষুধ কিনতে পারিনি।’
গত শনিবার মিটফোর্ড এলাকার নয়টি ওষুধের মার্কেটে নকল, ভেজাল, মেয়াদোত্তীর্ণ ও অনুমতি ছাড়া আমদানি করা ওষুধ, সন্ধিসুধা এবং খাদ্য সম্পূরক বিক্রির অভিযোগে ১০৩ জন ব্যবসায়ীকে আটক করেন র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। তাঁদের মধ্যে ২০ জনকে এক বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং ৮৩ জনের কাছ থেকে সোয়া কোটি টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী জব্দ এবং ২৮টি ওষুধের দোকান ও গুদাম সিলগালা করা হয়। এর প্রতিবাদে রোববার ওষুধ ব্যবসায়ীরা দোকান বন্ধ রেখে বিক্ষোভ করেন। সোমবার বিসিডিএস গতকাল সারা দেশে ওষুধের দোকান বন্ধ রাখার কর্মসূচি দেয়।
সূত্র - প্রথম আলো

