হরতাল অবরোধে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চিকিৎসাব্যবস্থাও যেন অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে রোগীদের জীবন। অনেক রোগী জরুরি চিকিৎসা নিতে পারছেন না। আবার অনেকে চরম ঝুঁকি মাথায় নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছালেও কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবাও মিলছে না। বিশেষ করে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, হৃদরোগ, কিডনি রোগ বা ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীরা সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে না পারায় নানারকম জটিলতার মুখে পড়ছেন।
হরতাল অবরোধে চিকিৎসা সেবাসহ হাসপাতালসমূহের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়েছে। একটানা অচলাবস্থার কারণে হাসপাতালগুলোতে অপারেশনসহ জরুরি চিকিৎসা ক্ষেত্রে নানারকম সমস্যা হচ্ছে। অক্সিজেনসহ অন্যান্য উপকরণ ও ওষুধপত্রের সংকটে ডাক্তার-নার্সরা রীতিমতো অসহায় হয়ে পড়ছেন। রোগীদের জীবনও বিপন্ন হচ্ছে প্রায়ই। হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সরবরাহব্যবস্থা প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রোগীদের বাইরে থেকেই কিনতে হয় গজ-ব্যান্ডেজ থেকে শুরু করে সুই-সিরিঞ্জ পর্যন্ত। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর অবস্থা আরও শোচনীয়। সেসব প্রতিষ্ঠানে গত এক মাস ধরেই অতি জরুরি নাইট্রাস, অক্সিজেন ও কার্বন-ডাই অক্সাইড সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না, সংগ্রহ করা যাচ্ছে না অন্যান্য উপকরণও। ফলে অপারেশনযোগ্য রোগীদের নিয়ে হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর ডাক্তার, নার্স, কর্মকর্তাদের চরম আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে। অপরদিকে কার্বন-ডাই অক্সাইড লিকুইড ও সিলিন্ডার সরবরাহ না থাকায় ঢাকার বেশিরভাগ হাসপাতালেই ল্যাপারোস্কপি অপারেশন বন্ধ রয়েছে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, যারা হাসপাতালে পৌঁছাতে পারছেন না, তাদের একটি অংশ আশপাশের ফার্মেসি থেকে বিক্রেতাদের পরামর্শ নিয়েই ওষুধপত্র কিনে 'নিজস্ব পদ্ধতিতে' চিকিৎসা নিচ্ছেন। জাতীয় হৃদরাগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, বহির্বিভাগ অনেকটাই ফাঁকা। রোগীর চেয়ে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের ভিড়ই বেশি লক্ষ্য করা গেছে। হাসপাতালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার বিপর্যস্ততায় রোগীর সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউটেই প্রতিদিন বড়জোর ২০/২২ জন রোগী হাজির হচ্ছেন, অথচ অন্য সময় এই প্রতিষ্ঠানের বহির্বিভাগে দৈনিক শতাধিক রোগীর ভিড় জমে থাকে। রাজধানীর অন্যান্য সরকারি হাসপাতালেও রোগীদের উপস্থিতি কম, কিন্তু তা সত্তেও কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা তাদের ভাগ্যে জুটছে না। ভুক্তভোগী রোগী ও তাদের স্বজনরা জানান, হরতালের দোহাই দিয়ে ডাক্তার-নার্সরা অনুপস্থিত থাকায় মারাত্দক সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গতকাল বিকালে গিয়ে দেখা যায় কিডনি ওয়ার্ডের একজন নারী রোগীকে জরুরি ডায়ালাইসিস করার জন্য স্ট্রেচারে তুলে রাখা হয়েছে। কিন্তু এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও ডাক্তার না থাকায় ডায়ালাইসিস কক্ষে ওই রোগীকে নেওয়া যাচ্ছে না। গতকাল ধামরাইয়ের রৌহা এলাকা থেকে হৃদরাগে আক্রান্ত বাবাকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আনতে অনেক ঝক্কি পোহাতে হয় আলমগীরকে। সিএনজিচালিত অটোরিকশায় লাল পতাকা লাগিয়ে রওনা দিলেও পথে পথে তাকে থামিয়ে সত্যিকার রোগী কি না তা পরীক্ষা করে দেখেছেন অবরোধকারীরা। আলমগীর বলেন, 'অটোরিকশাও ঝুঁকি নিয়ে ঢাকা পর্যন্ত আসতে চায়নি। অনেক ভয়ে ভয়ে আসতে হয়েছে।'
অবরুদ্ধ রাস্তায় গাড়ি চলাচল না থাকায় গুরুতর অসুস্থ রোগীরাও হাসপাতাল কিংবা ডাক্তারের চেম্বারে যেতে পারছেন না। বাতিল করতে হচ্ছে রোগীকে ডাক্তার দেখানোর পূর্বনির্ধারিত সিরিয়াল। এতে রোগীদের দুর্ভোগ বাড়ছে। রাস্তায় যাতায়াতের সময় নিরাপত্তাহীনতার কারণে হাসপাতালের ডাক্তাররা ডিউটি শিডিউল বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছেন। এ ছাড়া অবরোধকারীরা রোগী বহনকারী বেশ কয়েকটি অ্যাম্বুলেন্সে হামলা চালালে সাধারণ মানুষজন অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করাকেও নিরাপদ ভাবতে পারছেন না। ডাক্তার ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এসব তথ্য। ডাক্তাররা জানান, অতি প্রয়োজনের সময় শুধু রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে রোগীরা সেবার আওতায় আসতে পারছেন না। শুধু হাসপাতালেই নয়, ব্যক্তিগত চেম্বারে এসেও চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারছেন না। ঢাকার বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও কনসালটেশন সেন্টারে গিয়ে দেখা যায়, অনেক চিকিৎসকের সিরিয়াল এক থেকে পাঁচ মাস আগে থেকে নিয়েও সময়মতো আসতে না পারায় আবার নতুন করে সিরিয়াল নিতে হচ্ছে। দ্বিতীয়বার কখন সিরিয়াল পাবেন, এ নিয়ে উদ্বিগ্ন তারা। সিরিয়াল পেলেও ততদিন কতটা সুস্থ থাকবেন, সেই ভাবনা আরও অসুস্থ করে দিচ্ছে জটিল রোগীদের। এদিকে হরতাল-অবরোধের সুযোগে দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া হেঁকে বাড়তি কামাই করছেন অ্যাম্বুলেন্স মালিকরাও। স্বাস্থ্যসেবা অবরোধ-হরতালের আওতাবহির্ভূত থাকলেও কর্মসূচি পালনকারীরা তা মানছেন না। রোগীবাহী যানবাহনেও বাধা দেওয়া হচ্ছে। অনেকে রোগী নিয়ে ঢাকায় এসে বিপাকে পড়েছেন। গ্রামে যেতে পারছেন না। টাকার অভাবে তাদের কেউ কেউ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এমনকি রিলিজ হয়ে গেলেও যানবাহনের অভাবে হাসপাতাল ছাড়তে পারছেন না অনেকে। অ্যাম্বুলেন্সে রোগী ছাড়াও মাঝে মধ্যে যাত্রী পরিবহন করার কারণেই অ্যাম্বুলেন্সগুলো ইদানীং অবরোধকারীদের টার্গেটে পড়ছে বলেও মনে করেন কেউ কেউ। ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মিটফোর্ড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাধারণত ৮০০/৮৫০ রোগী ভর্তি থাকেন। কিন্তু গতকাল দুপুর ২টা পর্যন্ত সেখানে ভর্তি রোগী ছিলেন ৩৭৬ জন। জরুরি বিভাগে ভর্তির দায়িত্বে থাকা জাহিদ হোসেন জানান, অন্য সময় প্রতিদিন শ'দেড়েক রোগী ভর্তি হন। কিন্তু এখন প্রতিদিন ২০/২২ জনও হচ্ছেন না। যারা আছেন তাদের বেশিরভাগই ঢাকার আশপাশের। ঢাকার বাইরের রোগী নেই বললেই চলে। ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে ১০টি সিট। কিন্তু রোগী আছেন মাত্র একজন। তার নাম রহিম। তার বাসা বাবুবাজার। পাশের ওয়ার্ডে ৩০ সিট থাকলেও আছেন পাঁচজন। হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আবদুল মজিদ বলেন, অবরোধের কারণেই এখন রোগী কম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিদিন অন্তত ছয় হাজার রোগী সেবা নেন। ভিড়ও থাকে প্রচুর। কিন্তু এখন কোনো ভিড় নেই। টিকিট কাউন্টার থেকে জানানো হয়, প্রতিদিন ৫০০-এর বেশি রোগী হচ্ছে না। এখানকার ওয়ার্ডে সিট পেতে অন্য সময় দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হলেও এখন অনেক সিট খালি থাকছে। চাইলে দুষ্প্রাপ্য কেবিনও পাওয়া যাচ্ছে। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ছেড়ে গেছেন গাজীপুরের কালীগঞ্জের রেজাউদ্দিন। অবরোধের মধ্যে ঢাকা-গাজীপুর রুটে স্বল্প পরিসরে গাড়ি চলাচল করলেও বাড়ি ফিরে যাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন তিনি। তিনি জানান, হাসপাতালে ভর্তি থাকাকালীন পরিবারের সদস্যরা আসা-যাওয়া করেছেন ঝুঁকি নিয়ে। সিএনজি ভাড়া করে আসতে ব্যয় হয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি টাকা। তিনি ছিলেন সাত নম্বর ওয়ার্ডে। ৪৭ সিটের এ ওয়ার্ডে সেবা নিতে পারেন ৫০ জনেরও বেশি রোগী। অন্য সময় কোনো সিট ফাঁকা না থাকলেও মঙ্গলবার ২০ জন রোগীও ছিলেন না।
সূত্র - bd-pratidin.com

