দেশের চিকিৎসক-প্রকৌশলীদের ৯০ শতাংশই ঠিকমতো আয়কর দেন না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. গোলাম হোসেন।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারদের ৯০ শতাংশই কোনো কর দেন না। দিলেও নামকাওয়াস্তে দেন। চিকিৎসকেরা অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের সঠিক আয় উল্লেখ করেন না। আমার কাছে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ও আইনজীবীদের করের ফাইল আছে। আমি দেখেছি তাঁদের অনেকেই কর দেন না। এখানে আমাদের দুর্বলতা আছে। এ ক্ষেত্রে অনেক সম্ভাবনা আছে (আয়কর আদায়ের)। আমাদের সেটা ধরতে হবে।’
দেশের অর্থনৈতিক প্রতিবেদকদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সঙ্গে এক প্রাক্-বাজেট বৈঠকে এনবিআর চেয়ারম্যান এসব কথা বলেছেন। এনবিআরের সম্মেলন কক্ষে গতকাল বুধবার এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ইআরএফের সভাপতি সুলতান মাহমুদ, সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমানসহ সংগঠনের অন্যরা এতে উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনায় এনবিআর চেয়ারম্যান আগামী বাজেটসহ রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা, কালোটাকা বিনিয়োগের সুযোগ, পুঁজিবাজার, আবাসন খাতসহ নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন।
কালোটাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া প্রসঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘পৃথিবীর ধনীতম দেশটাও কালোটাকাকে উৎসাহিত করে। মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোমে বাংলাদেশিরা যাচ্ছেন। কানাডায় নাকি একটা বেগম পাড়া আছে বাঙালিদের। অপ্রদর্শিত আয় প্রদর্শনের সুযোগ রাখা হয়নি বলেই এই টাকা দেশের বাইরে চলে গেছে।’ তিনি বলেন, অপ্রদর্শিত অর্থের ক্ষেত্রে যদি কোনো সুুযোগ দেওয়া না হয়, তাহলে তা ধরে রাখা যায় না।
কর ফাঁকি বিশ্বের সব দেশেই হয় মন্তব্য করে গোলাম হোসেন বলেন, ‘এটা ইউনিক কিছু না। বাংলাদেশে যেমন কর ফাঁকি হয়, আমেরিকাতেও হয়।’
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, সরকার অনেক খাতে প্রচুর সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু সেখান থেকে সরকার লাভবান হয়নি। যেমন আবাসন খাত ও পুঁজিবাজার। তিনি বলেন, এ দুটি খাতে অনেক সমস্যা আছে। আবাসন খাতে গত বাজেটে অনেক প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ থেকে সরকারের কোনো লাভ হয়নি। একইভাবে পুঁজিবাজারকেও অনেক প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে।
বাড়িওয়ালাদের বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, এক লাখ ৬২ হাজার বাড়ির মালিক শনাক্ত করা হয়েছে, যাঁরা কোনো আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন না। তিনি বলেন, ‘ব্যাংকের মাধ্যমে ছাড়া কোনো বাড়িভাড়া পরিশোধ করা যাবে না—এমন বিষয় আমরা চিন্তা করছি। বাড়িভাড়া পরিশোধ হবে চেকের মাধ্যমে। বাড়িভাড়ার চেক যখন জমা দেওয়া হবে তখনই সেখান থেকে কর কেটে নেওয়া হবে।’
আগামী বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা হতে যাচ্ছে এক লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে আয়কর কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে বলে মন্তব্য করেন এনবিআর চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে কাজ করছি। কারণ, এর সম্ভাবনা কখনো চিহ্নিত করা হয়নি। আগামী বছর রাজস্ব আদায়ের ১ নম্বর উৎস হবে আয়কর। এখন এটা আছে ২ নম্বরে। আগামী বছর থেকে উৎসগুলো হবে প্রথমে আয়কর, দ্বিতীয়ত ভ্যাট, তৃতীয়ত শুল্ক।’
গোলাম হোসেন আরও বলেন, যৌথ মূলধনি কোম্পানি এবং ফার্মসমূহের নিবন্ধকের পরিদপ্তরে (জয়েন্ট স্টক কোম্পানি) নিবন্ধিত প্রায় এক লাখ নয় হাজার প্রতিষ্ঠান। কিন্তু করপোরেট প্রতিষ্ঠান আছে মাত্র ২০০টির মতো। কম কর প্রদানের জন্য বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান করপোরেটে রূপান্তর হয় না। তবে করপোরেট করহার সহনীয় করতে এনবিআর কাজ করছে। একপর্যায়ে তিনি বলেন, ২০০ করপোরেট প্রতিষ্ঠান ৮০ শতাংশ কর দিচ্ছে, এটা মোটেও ভালো লক্ষণ না।
বিভিন্ন খাতে দেওয়া নগদ প্রণোদনা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে যে নগদ প্রণোদনা দেওয়া হয় তা বন্ধ করে দেওয়া উচিত। এটা দীর্ঘদিন ধরে চলতে পারে না। এটার কোনো দরকার নেই। এটা তাঁদের অতিরিক্ত আয়ে পরিণত হয়েছে।
এক হাজার ৩৬২টি পণ্যে বর্তমানে সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা আছে। এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, ২০১৫ সালের মধ্যে তা ১৭০টিতে নামিয়ে আনা হবে। অবশ্য এতে সরকারের বছরে ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় কমে যাবে।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর সব ধরনের পণ্যে শুল্ক বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে এনবিআর। এ ছাড়া ধনীদের আরও বেশি কর দিতে হয়—এমন পদক্ষেপও নেওয়া হবে।
অর্থনৈতিক প্রতিবেদকদের আলোচনায় নিবন্ধনের সময় প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম মূল্য দেখিয়ে জমি নিবন্ধনের প্রসঙ্গ উঠে আসে। এ প্রসঙ্গে গোলাম হোসেন বলেন, ‘আমাদের (এনবিআর) আইনে কীভাবে জমির দর মূল্যায়ন করা যায় সে বিষয়ে আমরা চিন্তা করছি। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আমরাও নির্দেশনা পেয়েছি। আগামী অর্থবছর থেকেই এটা করা হতে পারে। এ মূল্যায়নের সঙ্গে প্রতিবছর মূল্যস্ফীতি যোগ করে দেওয়া যায় কি না, সেটাও চিন্তা করা হচ্ছে।’
সূত্র - প্রথম আলো

