হঠাৎ করেই দেশের কিডনি রোগীদের মধ্যে হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটছে। বিশেষ করে দুটি কিডনিই বিকল হওয়া রোগীদের মধ্যে এ সংক্রমণের ফলে তাদের মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তাঁদের দাবি, অনিরাপদ ডায়ালিসিস থেকে এ সংক্রমণ ঘটছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ ধরনের সংক্রমণের ফলে কোনো কোনো হাসপাতালে কিডনি ডায়ালিসিস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে দিশাহারা হয়ে পড়েছে ডায়ালিসিস কোর্সের আওতায় থাকা রোগী ও তাদের স্বজনরা। সম্প্রতি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রথম এ সংক্রমণের ঘটনা ধরা পড়ে। এরপর থেকেই রোগীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি বেসরকারি আরো কয়েকটি হাসপাতালের রোগীদের মধ্যেও এ সংক্রমণের ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সূত্র থেকে জানা গেছে, এ পর্যন্ত ১৫ রোগীর শরীরে হেপাটাইটিস ভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়েছে। এর মধ্যে ৯ জনের ‘বি’ এবং অন্যদের ‘সি’ ভাইরাস। এ হাসপাতালে প্রতি মাসে প্রায় দেড় শ রোগীর ডায়ালিসিস করানো হয়। তারা সপ্তাহে দুবার করে ডায়ালিসিস করানোর জন্য তালিকাভুক্ত। তবে হেপাটাইসিস সংক্রমণের শিকার রোগীদের ডায়ালিসিস এই হাসপাতালে এখন বন্ধ রাখা হয়েছে। ডায়ালিসিসের অন্য রোগীদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
অবশ্য এই হাসপাতালের নেফ্রোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. পারভেজ ইফতেখার আহম্মেদ কালের কণ্ঠের কাছে এ ধরনের সংক্রমণে আক্রান্তের সংখ্যা মোট ১২ জন বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, ‘হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ পজিটিভদের জন্য আলাদা যে যন্ত্রের মাধ্যমে কিডনি ডায়ালাইসিস করা দরকার, সে যন্ত্র আমাদের এই হাসপাতালে নেই। এ জন্য আমরা আক্রান্তদের বলেছি যেখানে ওই ব্যবস্থা আছে সেখান থেকে চিকিৎসা নিতে। এরপর আমাদের নতুন ভবনে নতুন করে যে ইউনিট চালু হবে, সেখানে ওই যন্ত্রের সুবিধা থাকবে। এর আগ পর্যন্ত আমরা তাদের জন্য কিছুই করতে পারছি না।’
ওই চিকিৎসক বলেন, প্রতিবার কিডনি ডায়ালিসিসের সময় প্রত্যেক রোগীর জন্য প্রায় আট থেকে ১০ হাজার টাকা দামের একটি করে ইনজেকশন লাগে, আর একজন রোগীকে সপ্তাহে কমপক্ষে দুবার ডায়ালিসিস করতে হয়। অনেকেই ওই ইনজেকশন সংগ্রহ করতে পারে না। ইনজেকশনের বিকল্প হিসেবে দাতাদের রক্ত ব্যবহার করা যায়। আর ইনজেকশনের বদলে যে রক্ত নিয়ে আসা হয়, তার মাধ্যমেও হেপাটাইটিস সংক্রমণের সুযোগ থাকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডায়ালিসিস কোর্সের আওতায় থাকা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একাধিক রোগী অভিযোগ করে বলেন, ‘বহু কষ্টে আমরা এ হাসপাতালে ডায়ালিসিস শিডিউল পেয়েছি। দীর্ঘদিন ধরেই এ হাসপাতালে নিয়মিত ডায়ালিসিস করছিলাম। তবে গত মাসে হঠাৎ করেই হাসপাতালের চিকিৎসকরা আমাদের কয়েকজন কিডনি রোগীর শরীরে হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ শনাক্ত করেন। তাৎক্ষণিকভাবে এখানে আমাদের ডায়ালিসিস বন্ধ রাখা হয়। পরে আরো অনেকের মধ্যেই এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে বলেও আমরা শুনেছি।’
তিন মাস ধরে ডায়ালিসিসের আওতায় থাকা একজন রোগী জানান, তিনি এককালীন ছয় মাসের ফি জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু তিন মাসের মাথায় তাঁর শরীরে হেপাটাইটিস শনাক্ত হওয়ার কথা বলে ডায়ালিসিস বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। ওই রোগীর দাবি, তাঁরা এ হাসপাতাল ছাড়া অন্য কোথাও ডায়ালিসিস করাননি। তাই তাঁদের ধারণা, এ হাসপাতালের কোনো যন্ত্রপাতি থেকেই ওই ভাইরাস সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারে।
ন্যাশনাল ইউরোলজি অ্যান্ড কিডনি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. জামানুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন জায়গা থেকে ডায়ালিসিসের আওতায় থাকা রোগীদের মধ্যে হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ সংক্রমণের খবর পাচ্ছি। তবে আমার প্রতিষ্ঠানে এখনো এ ধরনের ঘটনা ধরা পড়েনি।’
ডা. জামানুল ইসলাম জানান, যাদের দুটি কিডনিই বিকল হয়ে পড়েছে, তাদের বাঁচিয়ে রাখতে ডায়ালিসিসের মাধ্যমে কৃত্রিম প্রক্রিয়ায় রক্ত বিশুদ্ধকরণ ও সঞ্চালন ঘটানো হয়ে থাকে। ডায়ালাইসিস করা একবার শুরু হলে জীবনভর চালু রাখতে হয়। নিয়মিত ডায়ালিসিস না করলে রোগী মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাবে। তবে ওই ডায়ালিসিস হতে হবে সম্পূর্ণ নিরাপদ পদ্ধতিতে। নয়তো এর মাধ্যমে যেকোনো ভাইরাস সংক্রমণ ঘটা খুবই সম্ভব। সম্প্রতি যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, তা অনিরাপদ ডায়ালিসিসের কারণেই হয়ে থাকতে পারে।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান-আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহামুদুর রহমানও কালের কণ্ঠকে বলেন, ডায়ালিসিসের যন্ত্রপাতি, ফ্লুইডসহ আনুষঙ্গিক উপাদানের মাধ্যমে রোগীর শরীরে যেকোনো ভাইরাস ছড়াতে পারে। এ জন্য পর্যাপ্ত নিরাপদ ব্যবস্থাপনা খুবই জরুরি।
ওই পরিচালক বলেন, যেসব ক্ষেত্রে ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে- ঠিক কোন কারণে এমনটা হয়েছে বা হচ্ছে। এ ছাড়া কোনো রক্তই যাতে ভালোভাবে স্ক্রিনিং না করে শরীরে ঢোকানো না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা দরকার।
কিডনি বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ কিডনির জটিলতায় আক্রান্ত। তাদের মধ্যে বড় একটি অংশ রয়েছে, যাদের দুটি কিডনিই নষ্ট থাকার ফলে ডায়ালিসিসের মাধ্যমে তারা বেঁচে থাকে। বর্তমানে দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ডায়ালিসিস সেন্টারের সংখ্যা প্রায় অর্ধশত। এসব কেন্দ্রে বছরে বড়জোর ১০ থেকে ১৫ হাজার রোগী ডায়ালিসিসের সুযোগ পায়। এটা ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে সবার পক্ষে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। সরকারি হাসপাতালে খরচ কম হলেও বেসরকারি হাসপাতাল বা সেন্টারগুলোতে খরচ অনেক বেশি। আবার বেসরকারি সব সেন্টারই মানসম্পন্ন নয়। অনেকটাতেই প্রয়োজনীয় নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নেই। ফলে এমন ডায়ালিসিস সেন্টার থেকে ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি সব সময়ই থেকে যায়। এ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে জরুরি অনিরাপদ রক্তও ভাইরাস ছড়ানোর অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।
এদিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ছাড়াও জাতীয় কিডনি হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালসহ রাজধানীর ধানমণ্ডি, মহাখালী ও মগবাজার এলাকার তিন-চারটি ডায়ালিসিস সেন্টারেও রোগীদের শরীরে হেপাটাইসিস ‘বি’ ও ‘সি’-এর সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে।
তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল মজিদ ভূঁইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখনো আমার এখানে এ ধরনের সংক্রমণের কোনো রিপোর্ট আমার কাছে আসেনি। তবে পর্যাপ্ত নিরাপদ ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও জরুরি প্রয়োজনে বাইরের কারো রক্তদানের মাধ্যমে এ ভাইরাস যখন-তখন যে কারো শরীরে সংক্রমণ ঘটার ঝুঁকি থাকছেই। এ জন্য আমরা সতর্ক থাকি।’
ডা. পারভেজ ইফতেখার বলেন, জীবন বাঁচানোর জন্য অনেক সময় রোগীর স্বজনরা যেখান থেকে যেভাবে হোক রক্ত এনে দেয়। হয়তো স্ক্রিনিংও করা হয়, কিন্তু ওই স্ক্রিনিং যদি সঠিকভাবে না হয় তবে রক্তদাতার শরীরে ভাইরাস থাকলে তা রোগীর শরীরে আসবেই।
সূত্র - দৈনিক কালের কণ্ঠ

