রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি থেকে জীবন নিয়ে ফিরেছিলেন সালমা বেগম (২৭)। কিন্তু দারিদ্র্য তাঁকে বাঁচতে দিল না। ভবনধসের সময় তিনি মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পান। কিন্তু অভাবের সংসারে জুটল না চিকিৎসা, সমাজও তেমন করে পাশে দাঁড়াল না। অবশেষে গতকাল শুক্রবার রাজধানীর তুরাগ থানার বামনারটেক এলাকায় পাওয়া গেল তাঁর ঝুলন্ত লাশ। স্বজনরা বলছে, অর্থাভাবে উন্নত চিকিৎসা হয়নি সালমার। তাই মাথার যন্ত্রণা থেকে বাঁচতেই ফাঁস দিয়েছেন সালমা!
তুরাগ থানার ওসি শেখ ফরিদ কালের কণ্ঠকে জানান, গতকাল সকাল পৌনে ১১টার দিকে বামনারটেক এলাকার ফজলু মিয়ার বাড়ি থেকে লাশ উদ্ধার করা হয়। বৃহস্পতিবার রাতে সালমা ঘরের আড়ার সঙ্গে ওড়না জড়িয়ে ফাঁস দেন। দুই মাস ধরে স্বামী বাবুর সঙ্গে ওই ভাড়া বাসায় থাকতেন সালমা। ওসি জানান, সালমা কাজ করতেন রানা প্লাজার সপ্তম তলায় একটি পোশাক কারখানায়। ভবনধসের আঘাতে সালমা শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন।
সালমার স্বামী বাবু মিয়া জানান, তিনি বাসের হেলপার হিসেবে কাজ করেন। রানা প্লাজা ধসের তিন দিন পর ধ্বংসস্তূপ থেকে সালমাকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত পাওয়ায় সালমাকে বেশ কিছুদিন হাসপাতালেও থাকতে হয়। সালমার মাথার যন্ত্রণা মাঝেমধ্যে এতটাই বেড়ে যেত যে তিনি দেয়ালে মাথা ঠুকতেন। সরকারের তরফ থেকে এখন পর্যন্ত তাঁরা ৬০ হাজার টাকা সহায়তা পেয়েছেন বলেও জানান বাবু। তিনি বলেন, ‘টাকার অভাবে ঠিকমতো চিকিৎসা করাইতে পারি নাই। এই কারণেই ও (সালমা) আত্মহত্যা করছে।’
রানা প্লাজা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি এমদাদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মরে যাওয়া শ্রমিকদের পরিবারের কষ্টের শেষ নেই। বেঁচে যাওয়ারা আছে জীবনের যন্ত্রণায়। আমাদের অনেকেই এখন কোনোকাজ করতে পারবে না। তারা পরিবারের বোঝা হয়ে গেছে। অনেকে চিকিৎসা করতে পারছে না। যন্ত্রণা সইতে না পেরে সালমা আত্মহত্যা করল। এমন চলতে থাকলে অনেকেই হয়তো মারা যাবে।’
এখনো আহাজারি : গতকাল শুক্রবার রানা প্লাজা ধসের ৯ মাস পূর্ণ হলো। এ ৯ মাস ধরেই সাভারে রানা প্লাজার ধ্বংসের স্থানের সামনে বাসস্ট্যান্ডে আহাজারি করে ফিরছে শত শত মানুষ। গতকালও রানা প্লাজার সামনে জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশন সমাবেশ ও মিছিল করেছে। সংগঠনটির সভাপতি আমিরুল হক আমিন বলেন, ‘‘৯ মাস হলেও শ্রমিকরা ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পায়নি। নিহত ও আহত শ্রমিকদের পরিবারকে ‘লস অব আর্নিং’-এর ভিত্তিতে পাঁচ লাখ থেকে ২৮ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।’’ গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নকেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক কাজী রুহুল আমিন বলেন, ‘সামান্য সহায়তায় অনেকের পরিবারের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। তাই যথার্থ পুনর্বাসন করতে হবে।’ জাগো বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি বাহারানে সুলতান বাহার বলেন, রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যার্থে সরকার যেভাবে সহযোগিতা পেয়েছে, সেভাবে শ্রমিকদের কাছে পৌঁছেনি। কেউ হয়তো দুই লাখ টাকা পেয়েছেন, আবার অনেকে কিছুই পাননি। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সবার জন্য সমভাবে ক্ষতিপূরণের দাবি জানান।
এদিকে স্বজনের খোঁজ ও ক্ষতিপূরণের দাবিতে ভিড় করা অসহায় মানুষের সঙ্গে ‘রানা প্লাজা ক্ষতিগ্রস্ত পুনর্বাসন সোসাইটি’ নাম দিয়ে সংগঠন করে প্রতারণা করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগীরা বলেন, কথিত মুক্তিযোদ্ধা ও শ্রমিক নেতা আব্দুল করিম তাঁদের জমি পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তবে আব্দুল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি কারো কাছ থেকে টাকা নিইনি।’ সাভারের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্যা বলেন, ‘প্রশাসনের পক্ষ থেকে তালিকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। এখনো এটি অব্যাহত আছে। কেউ প্রতারণা করলে আমরা সেটা কিভাবে জানব। তবে অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সূত্র - দৈনিক কালের কণ্ঠ

