চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের গেটে মধ্যরাতে ঝুলছে তালা। অঘোর ঘুমে চিকিৎসক, সেবক ও কর্মচারীরা!
গত শুক্রবার রাত ১২টা থেকে ২টা সরেজমিন পরিদর্শনে এ দৃশ্য দেখা যায়। এর আগের দিন মধ্যরাতেও একই চিত্র চোখে পড়ে।
বৃহস্পতিবার রাতে গেটে তালা ঝুলতে দেখে সেখানেই দাঁড়িয়ে জরুরি বিভাগে ফোন করা হলে ঘুম চোখে একজন সেবক ও একজন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী বেরিয়ে আসেন। এ সময় তারা গেটে ওই রাত ১টায় তালা লাগানোর কথা স্বীকার করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চট্টগ্রাম মহানগরে সরকারি বড় হাসপাতাল দুটি। একটি চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল, অপরটি চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল। চমেক হাসপাতাল ১০১০ শয্যার। জেনারেল হাসপাতালে শয্যা ২৫০টি। ১৯০১ সালে স্থাপিত জেনারেল হাসপাতালটি 'সদর হাসপাতালে' নামেও পরিচিত। পাহাড়ের ওপর নির্মিত কয়েকটি ভবনে চলছে হাসপাতালের আন্তঃবিভাগ (ইনডোর)। আর জরুরি ও বহির্বিভাগে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম চলে সড়ক সংলগ্ন নতুন ভবনে। আন্দরকিল্লা থেকে লালদিঘি পাড় সড়কের মাঝামাঝি এলাকায় জেনারেল হাসপাতালের অবস্থান। সড়ক থেকে ৫ গজ দূরত্বে হাসপাতালের তিনতলা বিশিষ্ট ভবনের নিচতলায় জরুরি চিকিৎসাসেবা বিভাগ। এই বিভাগে মিনি অপারেশন থিয়েটার, ড্রেসিং রুমসহ জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য সরকারিভাবে সব ব্যবস্থা রয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন গড়ে ৫০ জনের বেশি রোগী এখানে আসেন চিকিৎসা নিতে। কিন্তু এলাকাবাসীর অভিযোগ, জরুরি বিভাগ ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার নিয়ম থাকলেও মধ্যরাতে ওই বিভাগ প্রায়ই তালাবদ্ধ থাকে। তাই রাতে রোগী আসাও কমে গেছে এখানে। সবাই ছুটেন চমেক হাসপাতালে।
বৃহস্পতিবার রাত ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে নগরীর পাহাড়তলী থেকে রওশন আরা (২৬), জেলার সীতাকুণ্ড থেকে প্রিয়াংকা রাণী (২৩), তারেক (২৩), এখলাস চৌধুরী (৫০) ও আছমা (১৫) নামের ৫ রোগী আসেন। এর মধ্যে রওশন আরা ও প্রিয়াংকাকে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ওয়ার্ডে ভর্তি দেন। অপর ৩ জন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে জরুরি বিভাগ ছাড়েন। এরপর রাত সাড়ে ১২টার দিকে জরুরি বিভাগের গেটে তালা লাগিয়ে কর্মরত তিন চিকিৎসক, সেবক ও কর্মচারী স্ব স্ব কক্ষে ঘুমিয়ে পড়েন।
খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার রাত ২টা ২৮ মিনিটে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গেলে এর সত্যতা মেলে। এ সময় গেটে (ফটক) একটি তালা লাগানো ছিল। সামনের একমাত্র বাতিও নেভানো। জরুরি বিভাগের ভেতরে চিকিৎসকের কক্ষ, ড্রেসিং রুম ও ডিউটি কক্ষের দরজা-জানালা বন্ধ। কয়েক মিনিট ঘোরাঘুরি করে সংশ্লিষ্ট কাউকে দেখা যায়নি। ডিউটি কক্ষের দেয়ালে লেখা জরুরি ২টি ফোন নম্বর দেখে একটিতে (০১৭৫৭ ৯৩৮৩১৮) কল করা হলে ফোন রিসিভ করে এক ব্যক্তি বলেন, 'কে-কাকে চান-কি বিষয়? দাঁড়ান আসছি।' ডিউটি কক্ষের দরজার কাচ দিয়ে দেখার ৫ মিনিট পর দরজা খুলেন ওই ব্যক্তি । তখনও প্রধান দরজা তালাবদ্ধ।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিচয় দিয়ে কর্মচারী মোহাম্মদ হারুন বলেন, 'স্যার (ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল অফিসার ডা. ধৃতিমান পাল) ভেতরে আছেন।' এ সময় হারুন ডিউটি কক্ষে গিয়ে সেবক (সিনিয়র স্টাফ নার্স) কাজী মোহাম্মদ শাহীনকে ডেকে আনেন। লুঙ্গি পরিহিত অবস্থায় চোখ মুছতে মুছতে শাহীন সেখানে আসেন। তখনও তারা তালাবদ্ধ অবস্থায় ভেতর থেকে কালের কণ্ঠের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
শাহীন বলেন, 'আমরা ১টার দিকে তালা দিয়েছি। দরজা খোলা রেখে বসে থাকা যায় না। সিকিউরিটি নেই। বাইর থেকে মাদকসেবীরা ডিস্টার্ব করে। কেউ এসে ডাকলে বের হই।'
এদিকে ওইরাত সোয়া ৩টা পর্যন্ত জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে অবস্থান করলেও কোনো চিকিৎসককে দেখা যায়নি। এরপর রাত সোয়া ৪টায় আবার সেখানে গেলে দেখা যায়, জরুরি বিভাগ তালাবদ্ধের পাশাপাশি সব কক্ষের বাতিও নেভানো।
শুক্রবার সময় রাত ১২টা ৩৩ মিনিট। কর্মচারী হারুন হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে হেঁটে এসে হঠাৎ জরুরি বিভাগের গেটে তালা লাগিয়ে দিলেন। এরপর প্রায় ১০ মিনিট বিভাগের মেঝেতে ঘোরাফেরা করেন তিনি। পৌনে ১টার দিকে ডিউটি কক্ষের ভেতর থেকে তালা লাগিয়ে হারুন বাতিও নিভিয়ে দেন। এ সময় ড্রেসিং রুমের সামনে চেয়ারে গেঞ্জি পরিহিত খালি গায়ে এক যুবককে দেখা গেলেও রাত ১টার পর তাকে আর দেখা যায়নি। এরপর জরুরি বিভাগের সামনে ও আশপাশে রাত ২টা পর্যন্ত অবস্থান করে কাউকে দেখা যায়নি। ভেতরের কক্ষগুলোর দরজা-জানালায় পর্দা লাগিয়ে দেওয়া হয়। জানা গেছে, হাসপাতালে জরুরি বিভাগে শুক্রবার রাতের শিফটে কর্মরত ছিলেন ইএমও ডা. অনুসেন দাশগুপ্ত।
রাত সাড়ে ১২টায় জরুরি বিভাগ তালাবদ্ধ করে কর্মকর্তা-কর্মচারী স্ব স্ব কক্ষে থাকা প্রসঙ্গে ডা. অনুসেন দাশগুপ্ত কালের কণ্ঠকে বলেন, 'নিরাপত্তাজনিত কারণে গেটে তালা লাগানো হয়। কেউ এসে ডাকলে আমরা দরজা খুলে দিই। এখানে যারা চিকিৎসা নিতে আসেন তাদের কেউ চিকিৎসা না নিয়ে ফিরে যান না।
ডা. অনুসেন জানান, শুক্রবার রাত ১০টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত জরুরি বিভাগে ১১ জনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৬ জনকে ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়।
সূত্র - দৈনিক কালের কণ্ঠ

