প্রাথমিক অবস্থায় ক্যান্সার রোগ নির্ণয় সম্ভব হলে অনেক ক্ষেত্রেই রোগকে প্রতিহত করা সম্ভব। ক্যান্সার নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন ছবি (ইমেজিং) পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। পজিট্রন এমিশন টমোগ্রাফি বা পেট স্ক্যানার পদ্ধতি ক্যান্সার রোগ-নির্ণয়ে নতুন যুগের অবতারণা করেছে।
নিউক্লিয়ার মেডিসিন এবং জৈব-রাসায়নিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে পরিচালিত রোগ নির্ণয়ের আধুনিক এবং নির্ভুল পদ্ধতি হচ্ছে ‘পেট’। ‘পেট’ মেশিন দ্বারা সূচনাতেই অর্থাৎ কোষকলার মধ্যে আণবিক পর্যায়ে পরিবর্তন সংঘটিত হওয়ার সময়ই রোগ নির্ণয় করা সম্ভব। এ পদ্ধতিতে কাটা-ছেঁড়ার প্রয়োজন নেই।
এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, এতে শরীরের কোষকলার মধ্যস্থ বিভিন্ন ধরনের বিপাকীয় (মেটাবোলিক) এবং জৈব-রাসায়নিক কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করা যায়। ফলে সুস্থ এবং অসুস্থ কোষকলার বিপাকীয় অস্বাভাবিকতা সহজেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যে কোষকলাগুলো বিপাকীয়ভাবে বেশি সক্রিয়, যেমন- সব ধরনের টিউমার, হৃৎপিণ্ড বা কোন ধরনের প্রদাহ এ পদ্ধতিতে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ক্যান্সারের সূচনায় কোষকলাস্থ জিনগুলোতে বিভিন্ন ধরনের অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দেয়। তাই প্রাথমিক অবস্থায় ক্যান্সার নির্ণয় ছাড়াও ক্যান্সারের বিস্তৃতি, ধাপ নির্ণয়, চিকিৎসার ফলপ্রসূতা, ক্যান্সারের প্রত্যাবর্তন, পুনঃপ্রত্যাবর্তন, থেরাপির কার্যকারিতা নির্ণয় ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ পদ্ধতির ব্যবহার বিস্তার লাভ করেছে। ক্যান্সার ছাড়াও হৃদযন্ত্র এবং মাথার রোগ নির্ণয়েও এ পদ্ধতি কার্যকর হয়ে উঠছে।
এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, আলট্রাসনোগ্রাফি, এমআরআই ইত্যাদি ইমেজিং পদ্ধতি দ্বারা শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে অবস্থিত কোনো টিউমার, মাংসপিণ্ডের অবস্থান অথবা আঘাত বা অসুস্থতাজনিত গাঠনিক পরিবর্তনগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর পেট স্ক্যান জীবন্ত এবং মৃত কোষকলার পার্থক্যগুলো স্পষ্ট করে তোলে। নির্ভুলভাবে রোগের উৎসের অবস্থান নির্ণয়সহ জৈব-রাসায়নিক পরিবর্তন সংঘটিত হওয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ যাতে শনাক্ত করা যায় সেই লক্ষ্য নিয়েই ‘পেট’ ও ‘সিটি’- এ দুটি স্ক্যানারের সংমিশ্রণে ১৯৯৮ সালে ‘পেট-সিটি’ স্ক্যানার সাফল্যজনকভাবে যাত্রা শুরু করে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে ২০০১ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে ‘পেট-সিটি’র ব্যবহার শুরু হয়।
পেট মেশিন পজিট্রন নির্গত করে অভীষ্ট অঙ্গের কোষকলায় পুঞ্জীভূত হয়। পজিট্রনগুলো কিছু দূরত্ব (কয়েক মিলিমিটার মাত্র) অতিক্রম করার পর নিকটস্থ কোষকলাস্থ কোনো ইলেকট্রনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দুটি গামা-রশ্মি নির্গত করে। ৫১১ কিলো ইলেকট্রন শক্তিবিশিষ্ট গামা-রশ্মি দুটি একটি অপরটির ঠিক বিপরীত দিক থেকে নির্গত হয়। এ প্রক্রিয়াকে ‘অ্যানিহিলেশন’ প্রক্রিয়া (বিকাশজনিত বিকিরণ) বলা হয়। ১৮০০ দূরত্বে স্থাপিত শনাক্তকারী দুটি ‘ডিটেক্টর’-এর মাধ্যমে এই দুটি গামা-রশ্মি শনাক্ত করা যায়। যখন বিপরীত পাশের দুটি ডিটেক্টরে গামা-রশ্মি এসে পড়ে তখন রশ্মি দুটির সংযুক্ত রেখার সূত্র ধরে এদের উৎপত্তি স্থল সম্পর্কিত তথ্য কম্পিউটারের ‘মেমোরি’তে সংকেত রূপে সংরক্ষিত হয়। বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি এবং কম্পিউটারের বিশেষ ‘সফটওয়্যার’ এই সংকেত ব্যবহার করে দ্বিমাত্রিক বা ত্রিমাত্রিক ‘ইমেজ’ তৈরি করে, যা আক্রান্ত অঙ্গের বিপাকীয় কার্যক্রমের প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট করে তোলে।
প্রাকৃতিক জৈব-রাসায়নিক পদার্থ বা ওষুধের সঙ্গে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের মিশ্রণে যে রেডিও ট্রেসার তৈরি করা হয় সেগুলো নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অঙ্গগুলোতে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। এই বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধরনের ‘রেডিও-ফার্মাসিউটিক্যালস’ ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জন্য রেডিওট্রেসার প্রয়োগের মাত্রাও বিভিন্ন হয়ে থাকে।
রোগী যাতে দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত মাত্রায় তেজস্ক্রিয় রশ্মি দ্বারা সম্পাতিত না হয় সেই লক্ষ্যে ‘পেট’ স্ক্যানের জন্য ব্যবহৃত তেজস্ক্রিয় আইসোটোপগুলো খুব কম অর্ধায়ুবিশিষ্ট হয়। কার্বন-১১ (অর্ধায়ু-২০ মিনিট), নাইট্রোজেন (অর্ধায়ু-১০ মিনিট), ফ্লোরিন-১৮ (অর্ধায়ু-১১০ মিনিট), কপার-৬৪ (অর্ধায়ু-১২.৭ ঘণ্টা) এবং আয়োডিন-১২৪ ব্যবহার করা হয়। যেহেতু আইসোটোপগুলোর অর্ধায়ু খুব কম তাই এগুলো উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত ‘সাইক্লোট্রন’ মেশিনটির অবস্থান চিকিৎসা কেন্দ্রের খুব কাছে হওয়া জরুরি।
ক্যান্সার নির্ণয়ের জন্য ‘ফ্লোরোডিঅক্সিগ্লুকোজ পেট ইমেজিং’ বা সংক্ষেপে ‘এফডিজি-পেট’-এর ব্যবহার সর্বাধিক। কোষকলার শক্তির প্রধান উৎস হচ্ছে গ্লুকোজ। টিউমার বা ক্যান্সারে আক্রান্ত কোষকলাগুলোর গ্লুকোজ শোষণের মাত্রা স্বাভাবিক কোষকলার তুলনায় বেশি। সাধারণভাবে শ্বাসের সঙ্গে টেনে অথবা ইনজেকশনের মাধ্যমে রোগীর শরীরে ‘এফডিজি’ ঢোকানো হয় এবং অল্প কিছুক্ষণ পরই প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে রোগীকে স্ক্যানারের সাহায্যে পর্যবেক্ষণ করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে স্ক্যানিং করা হয় বলে রোগীকে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয় ওষুধ প্রয়োগ করা হয়।
সূত্র – যুগান্তর.কম

