পায়ের চিকিৎসা নিতে এসে রাজশাহী নগরের ডলফিন ক্লিনিকে গত বুধবার আনোয়ারুল হক নামের এক ব্যবসায়ী মারা গেছেন। অভিযোগ আছে, অস্ত্রোপচারের আগে অতিমাত্রায় বেদনানাশক ব্যবহারে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। গত নভেম্বরে এই ক্লিনিকে ভাঙা হাতের চিকিৎসা নিতে এসে একই কারণে এক শিশুর মৃত্যু হয়।
সরকারি সূত্র বলছে, এই ক্লিনিকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অবেদনবিদ নেই। অষ্টম শ্রেণী পাস এক ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে অস্ত্রোপচারকক্ষে কাজ হয়। তবে ক্লিনিকটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না স্বাস্থ্য বিভাগ।
মৃত আনোয়ারুল হক চাঁপাই-নবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ বণিক সমিতির সহসভাপতি ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা। তাঁর আত্মীয়রা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, গত ৯ ডিসেম্বর বিএনপি-জামায়াতের কর্মীরা আনোয়ারুল হকের ওপর হামলা চালিয়ে তাঁর ডান পা ভেঙে দেন। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক দফা চিকিৎসা শেষে তিনি বাড়ি চলে যান। পরে পায়ের অবস্থার অবনতি হলে ডলফিন ক্লিনিকের চিকিৎসক সামিল উদ্দিন আহম্মেদের পরামর্শে গত মঙ্গলবার ওই ক্লিনিকে তাঁকে ভর্তি করা হয়।
আনোয়ারুলের স্ত্রী সারমিন আখতার বলেন, বুধবার রাত আটটা ২০ মিনিটের সময় পায়ে অস্ত্রোপচারের জন্য তাঁর স্বামীকে ক্লিনিকের তৃতীয় তলায় নেওয়া হয়। রাত সোয়া নয়টার দিকে অস্ত্রোপচারকক্ষ থেকে চিকিৎসক ও নার্স সবাই বের হয়ে যান। যাওয়ার সময় তাঁরা বলেন, তাঁর স্বামীর অবস্থা ভালো নয়, তাঁকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। সারমিন তাড়াতাড়ি ভেতরে গিয়ে দেখেন স্বামী মৃত।
মৃত্যুর খবরে এলাকাবাসী ক্লিনিক ভাঙচুর করেন। ভয়ে দুজন ছাড়া অন্য রোগীরা ক্লিনিক ছেড়ে চলে যান। ঘটনার পর ক্লিনিকের চিকিৎসক ও কর্মচারীরা পালিয়েছেন।
নগরের বোয়ালিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান বলেন, আনোয়ারুল হকের পায়ে অস্ত্রোপচার করা হয়নি। সম্ভবত অতিমাত্রায় বেদনানাশক ব্যবহারের কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
সারমিন আখতার বাদী হয়ে ওই রাতেই বোয়ালিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। এতে তিনি বলেন, চিকিৎসক ও সেবিকারা যোগসাজশে তাঁর স্বামীকে হত্যা করেছেন।
গত ৬ নভেম্বর এই ক্লিনিকে তানোরের মুস্তাকিন নামের এক শিশুর ভাঙা হাতে অস্ত্রোপচার করার আগে উচ্চমাত্রায় বেদনানাশক দেওয়া হয়েছিল। শিশুর পরিস্থিতি খারাপ বুঝতে পেরেই অবেদনবিদ ক্লিনিকের বাইরে চলে যান। শিশুটির মৃত্যুর খবরে তখনো এলাকাবাসী ক্লিনিক ভাঙচুর করেন। পুলিশ ক্লিনিকের মালিকসহ চারজনকে আটক করে। পরে মালিকপক্ষ শিশুটির পরিবারের সঙ্গে আপসরফা করে থানা থেকে ছাড়া পান।
এ ছাড়া ১৪ জানুয়ারি ভ্রাম্যমাণ আদালত ক্লিনিকটিকে ৯৫ হাজার টাকা জরিমানা করেন। ৩০ শয্যার অনুমোদন নিয়ে ৫২ শয্যায় রোগী রাখা, প্রয়োজনীয়সংখ্যক চিকিৎসক ও নার্স না থাকা, নোংরা অস্ত্রোপচারকক্ষ, অষ্টম শ্রেণী পাস করা ব্যক্তির দায়িত্বে অস্ত্রোপচারকক্ষ দেওয়া, বিভিন্ন জায়গায় মাকড়সার জাল—এসব অভিযোগে ওই জরিমানা করা হয়।
রাজশাহীর সিভিল সার্জন ও রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ে যোগাযোগ করে জানা গেছে, সংবাদপত্রের মাধ্যমে ঘটনাগুলো তাদের জানা। তবে ক্লিনিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরের কথা তারা এই ক্লিনিক পরিদর্শনেও যায়নি। স্বাস্থ্য পরিচালক (রাজশাহী বিভাগ) আবদুল হক বলেন, খুব শিগগির ঘটনা তদন্ত করা হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ক্লিনিকে গিয়ে দেখা যায়, মালিক, চিকিৎক, নার্স নেই। অভ্যর্থনা ডেস্ক ফাঁকা। ভেতরে দুজন রোগী। একজনের অভিভাবক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘কী করবেন বুঝতে পারছেন না। ঘটনার পর থেকে কেউ আসেননি।’
অভিযোগের ব্যাপারে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ, চিকিৎসক, নার্স কারও সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তাঁদের মুঠোফোনগুলোও বন্ধ পাওয়া যায়।
সূত্র - প্রথম আলো

