তামাক গাছ পাতা সমৃদ্ধ একটি ছোট উদ্ভিদ, যা বিশ্বের প্রায় সব এলাকায়ই জন্মায়। এ গাছ আকারে ছোট হলেও এর ব্যবহার মানবদেহের জন্য খুবই ক্ষতিকর।তথ্যানুযায়ী, ষোড়শ শতাব্দীতে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ইউরোপে তামাকের প্রচলনঘটে। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই মানুষ বিভিন্ন ভাবে তামাক ব্যবহার করে আসছে।সিগারেট, পাইপ, সিগার, বিড়ি হুক্কা ছাড়াও জর্দা, সাদাপাতা, গুল, খৈনি ইত্যাদি ভাবে মানুষ তামাক ব্যবহার করে।সাধারণত মা-বাবার তামাক সেবনের অভ্যাস, কৌতূহল, সঙ্গী-সাথীদের চাপ, আমি এখনসব কিছু করার উপযুক্ত এবং স্বাধীন এমন মনোভাব থেকে তামাক সেবনের সূত্রপাত ঘটে। তামাক সেবন নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হওয়ার পর তামাকের মধ্যে নিহত নিকোটিন নামক এক ধরনের পদার্থ এই অভ্যাস পাকাপাকি ভাবে চালিয়ে যেতে সাহায্য করে এবং পরিণতিতে এটি জীবনাচারের অঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়।
সিগারেট সেবন সম্পর্কে বিখ্যাত দার্শনিক রাসেল বলেছেন ‘জানা মতে, তামাক সেবন সব থেকে নেশা উৎপাদনকারী এবং নির্ভরতা ও আত্মতৃপ্তির অন্যতম উপায়’। লন্ডনের মাদক ব্যবহারকারীদের রেটিং অনুযায়ী হেরোইন, গাঁজা, এলএসডি ও মদের তুলনায় সিগারেটই তাদের কাছে নেশার সবচেয়ে নির্ভরশীল ও প্রয়োজনীয় উপাদান।তামাক সেবন এতই ক্ষতিকর যে, তামাক সেবীদের অর্ধেকই এই নেশার কারণে মারা যায়।চলতি হিসাব অনুযায়ী বিশ্বে তামাক সেবীদের সংখ্যা ১০ কোটির ওপরে। ১৯৫৫ সালেউন্নত বিশ্বে তামাক সেবনের ফলে ২০ লক্ষাধিক মানুষ মারা যেত। তখন অনুন্নত বিশ্বে তামাক সেবনজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল এর অর্ধেক অর্থাৎ ১০ লাখ। এর পরইক্রমান্বয়ে উন্নত বিশ্বে তামাক সেবন জনিত মৃত্যুহার কমতে থাকে এবং অনুন্নত বিশ্বের মৃত্যুহার বাড়তে থাকে।হিসাবানুযায়ী বাংলাদেশের সাত কোটি মানুষ তামাক সেবনের সাথে সম্পৃক্ত।জনসংখ্যার বাকি অংশ তামাক সেবনের পরোক্ষ ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে।
বাংলাদেশে প্রতি বছর ৫৭ হাজার মানুষ তামাক সেবন জনিত বিভিন্ন রোগে মারা যায়।এ ছাড়া তামাক সেবনের পরোক্ষ কারণে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। তামাক সেবনের পেছনে এ দেশের মানুষ প্রতিদিন ব্যয় করে আট কোটি টাকা। বছরে এ টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় তিন হাজার কোটি। তামাক সেবনের সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসায় বছরে ব্যয় হয় ১১ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া তামাক চাষে বছরে ব্যাপক ধান উৎপাদন হ্রাস পায়। ফলে খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি থেকেই যায়।তামাক সেবন, তা যেভাবেই করা হোক না কেন, বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তামাক সেবনে মানবদেহে যেসব অসুখ হয় ফুসফুসের ক্যান্সারতার মধ্যে অন্যতম। অধূমপায়ীদের চেয়ে ধূমপায়ীরা এ রোগে অনেক বেশি আক্রান্ত হয়। অধূমপায়ীদের চেয়ে ফুসফুসের ক্যান্সারে ধূমপায়ীদের মৃত্যুর সংখ্যা ৮ থেকে ২৫ গুণ বেশি। এটি নির্ভর করে সিগারেট খাওয়ার পরিমাণের ওপর। পাইপ, সিগার ও স্মোকারদের ফুসফুসের ক্যান্সারে মৃত্যুর ঝুঁকি অধূমপায়ীদের চেয়ে অনেক বেশি হলেও সিগারেট স্মোকারদের চেয়ে কম।
অধূমপায়ীদের চেয়ে সিগারেট স্মোকারদের শ্বাসতন্ত্রের উপরি ভাগের ক্যান্সার বিশেষ করে বাগযন্ত্রের ক্যান্সারের ঝুঁকি ৫০ গুণ বেশি।ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস ও এমফায়সিমা (ফুসফুসের কুঠরিগুলোয় বাতাস আটকে থাকা)নামক অসুখে মৃত্যুর সাথে সিগারেট খাওয়ার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। দৈনিক ২৫ শলাকা বা তার বেশি সিগারেট খাওয়া লোকদের ফুসফুসের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। এদের মৃত্যু হার অধূমপায়ীদের চেয়ে ২০ গুণ বেশি। ক্রনিকব্রঙ্কাইটিসের জন্য বায়ু দূষণ যতটা দায়ী, তারচেয়ে অনেক বেশি দায়ী ধূমপান।ধূমপানের কারণে ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) হতে পারে।এটি নির্ভর করে সিগারেট খাওয়ার পরিমাণ ও সময়ের ওপর।
সিওপিডি একটি মারণব্যাধি হলেও আগে ভাগে সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস পরিত্যাগ করলে এ রোগ প্রতিরোধ সম্ভব।স্কিমিক হার্ট ডিজিজ (হৃদযন্ত্রে অপরিমিত রক্ত চলাচল জনিত হৃদরোগ), সেরিব্রোভাস্কুলার
ডিজিজ (মস্তিষ্কের শিরাজনিত অসুখ) এবং পেরিফেরালভাস্কুলার ডিজিজে (শরীরের প্রান্তিক শিরাজনিত অসুখ) মৃত্যু ও ভোগান্তির কারণ হিসেবে সিগারেট খাওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা বর্ণনা করা না হলে বিষয়টির প্রতি অবিচার করা হবে। সিগারেট খাওয়ার ফলে মস্তিষ্কের শিরায় রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়ে স্ট্রোক হতে পারে। স্ট্রোকে কারো কারো মৃত্যু হয়। কেউ কেউ প্যারালাইসিস হয়ে বেঁচে থাকে এবং কেউ কোমায় চলে যায়। সিগারেট খাওয়ার ফলে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণও হতে পারে। পেরিফেরাল ভাস্কুলার ডিজিজে (শরীরের প্রান্তিক শিরাজনিত অসুখ) আক্রান্তদের ৯০ শতাংশই সিগারেট স্মোকার। এদের ঠিকমতো চিকিৎসা না করলে অনেক সময় পায়ে পচন ধরে এবং পা কেটে ফেলা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। তবে পা কেটে ফেলার ক্ষেত্রে সফলতার হারও খুবই কম। অনেক সময় শিরা শক্ত হয়ে ভেঙে গিয়ে রক্তপাত হতে থাকে।
সিগারেট খাওয়ার ফলে অন্ত্রের যেকোনো অংশে (ঠোঁট থেকে গুহ্যদ্বার পর্যন্ত)ক্যান্সার হতে পারে। ধূমপায়ীদের মুখগহ্বরে ক্যান্সার হওয়া কোনো অসাধারণবিষয় নয়। ইসোপেজিয়াল ক্যান্সারের (খাদ্যনালীর ক্যান্সার) সাথে সিগারেটখাওয়ার গভীর সম্পর্ক আছে। খাদ্যনালীর ক্যান্সারে অধূমপায়ীদের চেয়ে ধূমপায়ীদের মৃত্যুহার আট গুণ বেশি। তবে এটি সিগারেট খাওয়ার পরিমাণের সাথে সম্পর্ক যুক্ত। ধূমপায়ীদের অগ্নাশয়ে (প্যানক্রিয়াস) ক্যান্সার হওয়াও বিচিত্র কিছু নয়। তবে পাকস্থলীর ক্যান্সারের মতো এটি তত ভয়াবহ নয়। এ ছাড়া ধূমপায়ীদের মলাশয় (বৃহদান্ত্র) ও গুহ্যদ্বারে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়ার মতো নয়। ধূমপান পেপটিক আলসারেরও অন্যতম কারণ। ধূমপানের ফলে পেপটিক আলসার সারতে অনেক দেরি হয়। কখনো কখনো পাকস্থলী ছিদ্র হয়ে যেতে পারে।ধূমপানের ফলে মূত্রাশয়ে ক্যান্সার হতে পারে এবং যৌন আবেদন হ্রাস পায় এবং নরও নারীর সন্তান উৎপাদন ক্ষমতাও কমে যায়।
মহিলা ধূমপায়ীদের গর্ভাশয়ে ক্যান্সার হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। অনেকের অকালে ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যায়।ধূমপানের কারণে চোখের জ্যোতি কমে যেতে পারে এবং চোখে ছানি পড়তে পারে। এছাড়া হাড়ের ঘনত্ব হ্রাস পায় এবং শরীরে অকাল বার্ধক্যের ছাপ পড়তে পারে।যক্ষ্মার সাথে তামাক সেবনের সরাসরি কোনো যোগসূত্র নেই; কারণ যক্ষ্মা বায়ুবাহিত একটি জীবাণুঘটিত রোগ। মানবদেহে যক্ষ্মা হতে হলে চারটি পূর্ব শর্ত দরকার। এগুলো হলো শরীরের প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ক্ষমতা, অর্জিত প্রতিরোধ ক্ষমতা, শরীরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করা যক্ষ্মা জীবাণুর শক্তি বা তীব্রতা এবং যক্ষ্মা জীবাণুর সংখ্যা। এ চারটি কারণের ভারসাম্যের ওপর মানবদেহে যক্ষ্মা হওয়া নির্ভর করে। ধূমপানের ফলে ফুসফুসের শ্বেতকণিকা ও শ্বেতকণিকার সমন্বয়ে গঠিত ম্যাক্রোফেজ নামক সেল থেকে এক ধরনের রসের (অ্যানজাইম) নিঃসরণ ঘটে।ফুসফুসে বাতাস প্রবেশ করলে ফুসফুসের কুঠরিগুলো স্বাভাবিকভাবে স্ফীত ও সঙ্কুচিত হয়। কিন্তু এই রস ফুসফুসের সঙ্কোচন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। ফলে ফুসফুসে বাতাস প্রবেশের পর ফুসফুসের কুঠরিগুলো স্ফীত হয় কিন্তু সঙ্কুচিত হয় না। এটিকে অ্যাস্ফায়সিমা বলে।
অন্য দিকে সিগারেট খাওয়ার কারণে সিগারেটের ধোঁয়ায় নিহিত নাইট্রোজেন অক্সাইড ফুসফুসের কুঠরিগুলোর সঙ্কোচন ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এ ছাড়া সিগারেটের ধোঁয়ায় নিহিত অক্সিডেন্টস নামক আর একটি উপাদান শরীরের অভ্যন্তরে নিঃসরিত অ্যান্টিট্রিপ্সিন নামক রসও কমিয়ে দেয়। এইরস শ্বাসনালীর সংক্রমণ ও শিরার সঙ্কোচন প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ধূমপানের কারণে ফুসফুসের নাইট্রোজেন অক্সাইডের পরিমাণ হ্রাস পাওয়ায় যক্ষ্মাসহ শ্বাসতন্ত্রের ক্রনিক সংক্রমণের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।ধূমপান জনিত কারণে সারা বিশ্বে প্রতি বছর ৩০ লাখ লোক মারা যায়। ২০২০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা এক কোটিতে গিয়ে দাঁড়াতে পারে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা। এশিয়া ওপূর্ব ইউরোপে ধূমপায়ীদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সারা বিশ্বের মানুষ যত সিগারেট খায়, তার প্রায় অর্ধেকই খায় পূর্ব ইউরোপের লোকেরা।সচেতনতার কারণে উন্নত বিশ্বে ধূমপায়ীদের সংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় বহু জাতিক সিগারেট কোম্পানিগুলোর টার্গেট এখন উন্নয়নশীল বিশ্ব। ধূমপানের ফলেস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি, জনশক্তির উৎপাদনশীলতা হ্রাস, খাদ্যউৎপাদনে ভূমির অপচয় এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে বিদেশ থেকে সিগারেট আমদানিরকারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতি ক্রমবর্ধমান হারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।এ ক্ষেত্রে উন্নতি বিশ্বের চিকিৎসক ও চিকিৎসা পেশার সাথে জড়িতদের দায়িত্ব এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।
তারা ধূমপানের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরার মাধ্যমে উন্নয়নশীল বিশ্বের জনগণের ওপর এর কুপ্রভাব সম্পর্কে জনমত সৃষ্টি করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে এবং সে দেশের সরকার গুলোকে সতর্ক করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং শক্তিধর আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থাগুলোর উচিত এ ব্যাপারে কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ধূমপান জনিত সমস্যাগুলো তুলে ধরা। উন্নয়নশীল দেশের প্রতিটি সরকারকে তাদের ধূমপান বিরোধী নীতিনির্ধারণে উৎসাহ দেয়াও তাদের দায়িত্বের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া তামাক সেবন নিরুৎসাহিত করার জন্য তামাক সামগ্রীর ওপরবেশি করে করারোপের জন্য উন্নয়নশীল বিশ্বের সরকার গুলোকে চাপ দেয়া, তামাকবিরোধী আন্দোলনে উৎসাহ প্রদান এবং শিশু-কিশোরদের তামাক সেবনে নিরুৎসাহিত করা সংক্রান্ত কর্মসূচিও নেয়া উচিত।
বাংলাদেশে তামাক উৎপাদন, নিয়ন্ত্রণ ও ধূমপানবিরোধী কিছু কিছু কর্মসূচি গৃহীত হওয়ার কথা শোনা গেলেও বাস্তবে তা প্রায় অনুপস্থিত। এ ক্ষেত্রে আরো কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে তামাক বিরোধী জনসচেতনতা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
সূত্র - নয়া দিগন্ত

