
শরীরের সৌন্দর্য রক্ষায় মাথার চুলের রয়েছে নান্দনিক গুরুত্ব। আর তরুণ বয়সেই যদি চুলে পাক ধরে কিংবা দু-একটি চুল সাদা হয়ে যায়, তখন মানসিক দুশ্চিন্তা শুরু হয়ে যায়। এবং এসব বন্ধ করতে যে যা উপদেশ দেয় তাই সবাই করে থাকে। আর এসব বন্ধ করতে হেয়ার স্প্রে, হেয়ার জেল, হেয়ার ক্রিম, শ্যাম্পু, কলপ আরো কত কী-ই না মানুষ ব্যবহার করে। ফল আগে যা ছিল তাই, শূন্য।
প্রকৃতিগত নিয়মে এ চুল এক সময় পাকবেই। এটিই নিয়ম। কিন্তু এ নিয়মের বাইরে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই চুল সাদা হয়ে গেলে ব্যাপারটি বেশ বিড়ম্বনা হয়ে দাঁড়ায়। কেন চুল সাদা হয়? এবং এ চুল কালো কিংবা চিরস্থায়ী রঙ করার আদৌ কোনো ওষুধ আছে কি না, চলুন এ সম্পর্কে জানা যাক।
মাথার চুলসহ শরীরের নানা অংশের চুল আমাদের চামড়া থেকে সৃষ্টি হওয়া একটি অংশ। চামড়ার ভেতরে থাকে লোমকূপ। এই লোমকূপে থাকে সজীব কিছু কোষ (কোষ হচ্ছে জীবদেহের গাঠনিক ও কার্যিক একক), যাকে বলা হয় হেয়ার ম্যাট্রিক্স। এই ম্যাট্রিক্সের কোষগুলো দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে কেরাটিন নামে প্রোটিন জাতীয় এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করে এবং এটি লম্বা হয়ে চামড়ার বাইরে বেরিয়ে আসে। এটিই চুল। ম্যাট্রিক্সে মেলানিন তৈরি করতে সক্ষম মেলানোসাইট নামে এক ধরনের কোষও থাকে। এই মেলানিন কালো রঙের এবং চামড়ার কালো রঙের জন্যও দায়ী। চামড়ায় এটি কমে গেলে বলা হয় শ্বেতি বা ম্যাট্রিক্সের মেলানো সন্ধি থেকে তৈরি হওয়া মেলানিন চুলে অর্থাৎ প্রোটিন কেরাটিনের সাথে মিশে গিয়ে চুলের রঙ কালো করে থাকে। চুলের গোড়ায় যদি বেজো থায়াজাইলোলামিন থাকে, তাহলে চুলের গোড়া হলুদ ও লাল হয়ে যাবে।
মাথার চুলের আয়ু চার বছর থেকে ১০ বছর পর্যন্ত হতে পারে। পুষ্টিহীনতার জন্যও চুলে পাকন ধরতে পারে। চুল না পাকার জন্য যে পুষ্টিহীনতা কাজ করে, তার নাম হচ্ছে কেরাটিন প্রোটিনের অভাব। প্রোটিনের অভাব হলে ধীরে ধীরে চুলের রঙ পরিবর্তন হয়। যেমন - কখনো বাদামি, কখনো লাল পর্যায়ক্রমে এটি সাদাতে রূপান্তর হয়। বৈজ্ঞানিকেরা ধারণা করেন, এই রঙের মূল ভূমিকায় থাকে প্রোটিন। চুলের প্রয়োজনীয় প্রোটিন শরীরে না থাকলে যেকোনো বয়সে চুল সাদা হতে পারে। বিভিন্ন গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে এ প্রোটিনের অভাব দেখা গেছে - চুল শুকিয়ে ভঙ্গুর হয়ে গেছে - ধীরে ধীরে চুল উঠে পাতলা হয়ে গেছে - এ ছাড়াও রক্তচাপ রোগী হলে - পেরিয়েরাল আর্টেরিয়াল ডিজিজ - হৃৎপিণ্ডের রক্তনালীর রোগ এগোনোতে চুল পেকে যেতে পারে। এ ছাড়া রখম্যান থমসন সিনড্রোম, ডিসট্রফিক মায়োটোনিয়া ও প্রোজেরিয়া রোগে আক্রান্ত হলে তেরো-চৌদ্দ বছরের মধ্যে চুল পাকা শুরু হয়। এবং ১৮-১৯ বছরের মধ্যে চুল সম্পূর্ণ সাদা হয়ে যায়। এ ছাড়া এলোপেসিয়া এরিয়াটা ও ভিটামিন ‘বি’এর অভাব ঘটিত রোগ যেমন পারনিসিয়াস এনিমিয়ায় ও চুল সাদা হয়ে যায়। আমাদের দেহের গলার সামনের দিকে থাইরয়েড গ্লান্ডের কিছু রোগেও চুল পেকে যেতে পারে। এ ছাড়া মেলানোসাইট সঠিকভাবে কাজ না করলেও চুল পেকে যেতে পারে।
চুলপাকা প্রতিরোধ : পাকা চুলকে কালো করার গবেষণা এখনো চলছে। নির্দিষ্ট চিকিৎসা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। বড়জোর বাইরে থেকে কল্প বা রঙ লাগিয়ে সাময়িকভাবে রঙ পরিবর্তন করা যায়। প্রোটিন ও মেলানোসাইট, মেলানিন এগুলো রঙ্গানু নির্ভরও (Geaetic) হয়ে থাকে। তাই যত ওষুধ বা ডিমের শ্যাম্পুই লাগানো হোক তা থেকে ভালো ফল সম্ভব নয়, বরং তা থেকে চামড়ার রোগ Derenatitisহতে পারে। অনেকেই বলে থাকেন চিন্তায় চুল পাকে, কথাটি মোটেও সত্য নয়। এমনও প্রমাণ রয়েছে চিন্তা মোটেও করেন না এমন অনেক লোকের চুল পেকে গেছে। অনেকেই সাদা চুলকে কালো করার জন্য অ্যামাইনো বেনজোয়িক এসিড ট্যালেট দিয়ে থাকেন। অনেকে আবার কলপ বা শ্যাম্পু দিয়ে থাকেন। এগুলোরও নির্দিষ্ট ফল আদৌ পাওয়া যায়নি। কলপ সাময়িকভাবে চুলকে কালো করলেও তা চিরস্থায়ী নয়। লন্ডনের কিছু চিকিৎসা বিজ্ঞানী চুল পড়া ও পাকা রোধে ইদানীং এসেনশিয়াল অ্যামাইনো এসিড ব্যবহার করে দেখছেন বর্তমানে পাওয়া বাজারে tab. Prima অথবা Tab. Primrose Evening.এটি শরীরের বা ত্বকের অন্যান্য রোগেও দেয়া হয়ে থাকে। অনেক চিকিৎসা বিজ্ঞানীই বলছেন, উপযুক্ত পরিমাণে প্রোটিন খেলেও চুল পাকা রোধ সম্ভব। আর তার উপযুক্ত বা নির্দিষ্ট চিকিৎসার জন্য বিজ্ঞানীদের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে আরো কিছু দিন।
সূত্র - দৈনিক নয়া দিগন্ত

