
যৌথ পরিবারে সব সময় হইচই ও আনন্দের ভাগ বেশি থাকে। আর এই আনন্দ যদি হয় ঈদের, তাহলে সেটি অনেক রঙিন ও বর্ণিল। মনে হয়, ঈদের চাঁদের আলো ঘরকে আলোকিত করে তোলে। এখন তো যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারের দিকে ঝুঁকছে সবাই। কিন্তু ঈদের আনন্দ যৌথ পরিবারে যা হয়, একক পরিবারে হয় বলে মনে হয় না।
আমার চেনা এক যৌথ পরিবারের গল্প জানি। সেই পরিবারে চাচা-চাচি, ফুফা-ফুফু, মা-বাবা একসঙ্গে থাকতেন। ঈদের আগের দিন থেকে সেই বাড়িতে ঈদ শুরু হয়। বিভিন্ন ধরনের রান্নার আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন সবাই। একেকজন একেক পদ রান্না করেন। চালের রুটি দিয়ে গরুর মাংস খাওয়ার জন্য দুদিন আগে থেকে চাল গুঁড়া করে আনা হয়। অনেক ধরনের পিঠা বানানো হয়। পুলি পিঠা, পান পিঠা, চিতই পিঠা; আরও কত যে পিঠা!
যৌথ পরিবারে কোরবানির ঈদের সময় গরু নিয়ে কত মজা হয়। দেখা যায়, সবাই মিলে গরুর হাটে যায়। গরু কেনা হলে বাসায় রেখে সারা রাত পালাক্রমে পাহারা দেওয়া হয়, যাতে চুরি না হয়।
পাড়ায় কোন পরিবারের গরু সবচেয়ে বড়, তা নিয়ে ছোটদের মধ্যে একধরনের তর্ক-বিতর্কও হতো। সেটা অনেক আগে যেমন হতো, আজও তেমনই হয়। কিন্তু একক পরিবারে এ ধরনের আনন্দ খুব একটা হয় না। হলেও সেই আনন্দ অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেওয়ার সুযোগ থাকে না।
আমি নিজে যৌথ পরিবারে বড় হইনি ঠিকই, তবে আমরা যেহেতু পাঁচ ভাইবোন, তাই ঈদের দিন জমজমাট থাকে আমাদের বাসা। আমার খালু-খালা ঈদের দিন চলে আসেন আমাদের সঙ্গে ঈদ করতে। আমার অন্য খালাতো-মামাতো ভাইবোনেরা ঈদের দিন আমার মায়ের হাতে গরুর মাংস খেতে খুবই পছন্দ করেন। এটিও একধরনের আনন্দ। তবে যৌথ পরিবারের আসল ঈদের মজা কী, তা আমি নানাবাড়িতে দেখেছি। সকালে নানা তাঁর ছেলেদের নিয়ে ঈদের নামাজ পড়তে যেতেন। নামাজ শেষ করে বাসায় ফিরে কোরবানির জন্য সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। আমরা দোতলা বাড়ির ছাদ থেকে সব দেখতাম। কোরবানি হয়ে গেলে আমার খালাতো-মামাতো ভাইবোনেরা মিলে রিকশায় ঘুরে বেড়াতাম পুরো শহরের রাস্তায় রাস্তায়। ঈদে আমরা মেলায় যেতাম। বাতাসা, নাড়ু, লজেন্স আরও কত-কী খেতাম। মজার মজার খেলা হতো, সেগুলো দেখতাম। এই ভালো লাগাটা আজও অনুভব করি।
আজকাল যৌথ পরিবারের ঈদের মধ্যেও খানিকটা পরিবর্তন এসেছে।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়, যৌথ পরিবারের ঈদ মানে কে কত দামি পোশাক কিনেছে, কার গরুর দাম কত। যৌথ পরিবারের ঈদে এখন টেবিলজুড়ে নানা পদের খাবার থাকে। অথচ মনে হয়, কোথায় যেন বেদনার সুর বাজছে। আজকের যৌথ পরিবারের ঈদ আর আগের যৌথ পরিবারের ঈদের মধ্যে তাই অনেক অমিল। তবু মনে হয়, একক পরিবারের ঈদের চেয়ে যৌথ পরিবারের ঈদ অনেক আনন্দের, অনেক ভালো লাগার।
সুত্র - প্রথম আলো

