চট্টগ্রামের ৫৮ শতাংশ চিকিৎসক নামের পাশে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) নীতিবহির্ভূত ডিগ্রি বা পদবি ব্যবহার করছেন। স্নাতকোত্তর না করেই অনেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও সেজেছেন। নগরের ১১০ জন চিকিৎসকের নামফলক ও পরিচিতিপত্র সংগ্রহ করে প্রথম আলোর বিশ্লেষণে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
ডিগ্রি ও পদবি ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করে বিএমডিসি সম্প্রতি সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। বিভিন্ন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন আকারেও এ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। ৫৮ শতাংশ চিকিৎসক কোনো না কোনোভাবে এ সতর্কবাণী অগ্রাহ্য করছেন।
গত ২৪ থেকে ২৬ এপ্রিল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের আশপাশ এবং জামালখান এলাকার চিকিৎসকের ব্যক্তিগত চেম্বার থেকে ১১০ জনের পরিচিতিপত্র (ভিজিটিং কার্ড) সংগ্রহ করা হয়। পরিচিতিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১১০ জনের মধ্যে ৬৪ জন বিএমডিসির সতর্কবাণী কোনো না কোনোভাবে লঙ্ঘন করেছেন, এটি মোট চিকিৎসকের ৫৮ শতাংশ।
চট্টগ্রাম বিএমএর সভাপতি মো. মুজিবুল হক খান বলেন, ‘অনেক ডাক্তারই এগুলো লিখছেন। গ্রামের দিকে আরও বেশি লিখছেন। ডিপ্লোমা করেও কেউ বিশেষজ্ঞ লিখতে পারেন না। এ ব্যাপারে বিএমডিসি থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে প্রচার করা হচ্ছে। আমরাও ডাক্তারদের বলছি এগুলো না লিখতে।’
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৩৩ জন চিকিৎসক স্নাতকোত্তর ডিগ্রির পাশাপাশি বিভিন্ন ডিপ্লোমা ডিগ্রি ও প্রশিক্ষণ কোর্স ব্যবহার করেছেন। ২২ জন পরিচিতিপত্রে বিভিন্ন ফেলোশিপ উল্লেখ করেছেন।
অথচ বিএমডিসি সতর্কীকরণে স্পষ্টভাবে বলেছে ‘দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান হতে প্রদত্ত ফেলোশিপ এবং ট্রেনিংসমূহ উল্লেখ করছেন, যা কোনো স্বীকৃত চিকিৎসা শিক্ষা যোগ্যতা নয় এবং বিএমডিসি কর্তৃক স্বীকৃত নয়।’
এ ছাড়া পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি ছাড়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক লেখা যাবে না বলে সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ১১০ চিকিৎসকের মধ্যে ২৪ জন পাওয়া গেছে, যাঁরা ডিপ্লোমা ও ফেলোশিপ করে ‘বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক’ বলে নিজেদের দাবি করেছেন। এর মধ্যে ছয়জন চিকিৎসক স্নাতকোত্তর ডিগ্রিতে অধ্যয়নের কথা পরিচিতিপত্রে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু বিএমডিসি বলছে, ‘পিজিটি, এফসিপিএস পার্ট-১, পার্ট-২, এমডি ইন কোর্স, কোর্স কমপ্লিট ইত্যাদি লেখা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’
তেমনি একজন ‘চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ’ তৌহিদুর রহমান। তাঁর নামের পাশে এফসিপিএস পার্ট-২ লেখা রয়েছে। তিনি আবার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক লিখেছেন।
এ বিষয়ে তৌহিদুর রহমান বলেন, ‘আমার মতো অনেকেই এটি লিখছেন। বিএমডিসি সতর্কীকরণটি সম্প্রতি দিয়েছে। আমাদের কার্ডগুলো আগে ছাপানো হয়েছিল। নতুন কার্ড করার সময় এটি ব্যবহার করব না।’
বিএমডিসির সতর্কীকরণে বলা হয়, ‘স্বীকৃত পোস্টগ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি না থাকা সত্ত্বেও কেউ কেউ মেডিসিন, সার্জারি, শিশুরোগ, চর্ম ও যৌন, প্রসূতি, চক্ষু, নাক কানা গলা ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ের ওপর বিশেষজ্ঞ হিসেবে তাদের পরিচয় দিয়ে প্রেসক্রিপশন, প্যাড, সাইনবোর্ড, ভিজিটিং কার্ড করছেন, যা জনসাধারণের সঙ্গে প্রতারণামূলক কাজ হিসেবে গণ্য হবে। এটি স্পষ্টতই বিএমডিসি আইনের পরিপন্থী এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ জন্য অর্থদণ্ড অথবা কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হতে পারেন।’
চারজন চিকিৎসকের নামের পাশে দুই থেকে তিন লাইনে স্বীকৃত বা স্বীকৃত নয় এ রকম বাহারি ‘ডিগ্রি’ লেখা রয়েছে। বিএমএর চট্টগ্রামের সাবেক সভাপতি শেখ শফিউল আজম তাঁর নামের পাশে ‘এমবিবিএস, এমএসএস, এমএ, এফআরএসএইচ (লন্ডন), এফসিসিপি (আমেরিকা), এফএমডি, এফসিজিপি, এমএসসি (ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন), মেডিসিন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ লিখেছেন।’
এর বিপরীতে তিন চিকিৎসকের নামের পাশে এমবিবিএস থেকে শুরু করে কোনো ডিগ্রিই উল্লেখ করেননি। কোনো ডিগ্রি না লেখাও গ্রহণযোগ্য নয় বলে বিএমডিসি সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে বিএমডিসির রেজিস্ট্রার মো. জাহিদুল হক বসুনিয়া ফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেকে বিষয়গুলো মানছেন না। আপাতত আমরা তাঁদের সতর্ক করছি। পরে একটি নীতিমালার আওতায় এনে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে বসুনিয়া আরও বলেন, ‘কেউ কেউ ডিপ্লোমা ডিগ্রি লিখে নিজেদের বিশেষজ্ঞ বলছেন। ডিপ্লোমা করলেই বিশেষজ্ঞ হয় না। তবে ওই রোগের ওপর তার কিছুটা ভালো জানা থাকে। কিন্তু অনেকে একেবারে কিছু না করেই বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ফেলো লিখে বিশেষজ্ঞ সেজেছেন।’
সূত্র - প্রথম আলো

