ক্যানসার চিকিত্সায় বাংলাদেশ এগিয়েছে। দক্ষ চিকিত্সক আছেন, ওষুধ আছে। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। উন্নতমানের চিকিত্সা-সেবা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থেকে যাচ্ছে। আজ সকালে প্রথম আলো কার্যালয়ে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন আলোচকেরা।
‘ক্যানসার চিকিত্সায় বাংলাদেশ’ শীর্ষক বৈঠকটির আয়োজক ছিল প্রথম আলো। এতে সহযোগিতা দিয়েছে ইউনাইটেড হসপিটাল।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ক্যানসার চিকিত্সা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তিনি দরিদ্র দুস্থ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যবিমা চালুর বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে স্বাস্থ্যবিষয়ক জাতীয় কমিটিতে তুলবেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, চিকিত্সাসেবা নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ দরকার।
আক্ষেপ করে মো. নাসিম বলেন, আগে ধনাঢ্য ব্যক্তিরা হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বানাতেন। এখন কোনো একটি গার্মেন্টস মালিকের অর্থবিত্ত হলে তিনি আরেকটি গার্মেন্টস বানান।
অনুষ্ঠানে ইউনাইটেড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রহমান খান জানান, তাঁর হাসপাতালে সর্বাধুনিক চিকিত্সা-ব্যবস্থা আছে। হাসপাতালটি ক্যানসার কেয়ার সেন্টার প্রতিষ্ঠায় ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। এই হাসপাতালে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি আছে, বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স আছে। তিনি দাবি করেন, এ বিভাগ থেকে তাঁরা কোনো লাভ করেন না।
এই হাসপাতাল থেকে আসা অপর চিকিত্সক ফেরদৌস শাহরিয়ার বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতেও বিনিয়োগ বেড়েছে। কিন্তু ঠিকভাবে অর্থের ব্যবহার হচ্ছে না।
অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য প্রাণ গোপাল দত্ত বলেন, শিক্ষা এবং চিকিত্সা পণ্য হয়ে গেলে গুণগত মান থাকে না। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে ‘পার্সেন্টেজ’ বা ‘কমিশন’ নেওয়ার যে ধারা চলছে, তা-ই অধঃপতনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি ইউনাইটেড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কথার সঙ্গে দ্বিমত করেন। তিনি বলেন, সিটিস্ক্যান করতে বিএসএমএমইউতে দুই হাজার টাকা লাগে। তাতেও লাভ থাকে ৬০০ টাকা। বেসরকারি হাসপাতালগুলো পাঁচ-ছয় হাজার টাকা নিচ্ছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ নির্ধারণ করে দেওয়া জরুরি। তিনি আরও বলেন, তাঁর বোন একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। ইউনাইটেডে তিনি তাঁর বোনের চিকিত্সায় ১০ লাখ টাকা খরচ করেছেন। অপর এক আত্মীয়ের জন্য খরচ হয়েছে ১৫ লাখ টাকা। সরকারি হাসপাতালগুলো বিনা মূল্যে বা স্বল্পমূল্যে চিকিত্সা-সেবা দিচ্ছে। সরকার কোনো লাভ করছে না। ফলে সরকারি হাসপাতালগুলো সেভাবে এগোতে পারছে না।
প্রাণ গোপাল দত্ত বলেন, বাংলাদেশে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় কুমুদিনী হাসপাতালে আর পি সাহা বিনা মূল্যে ক্যানসার চিকিত্সা শুরু করেছিলেন। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব ছাড়া উন্নতমানের সেবা দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালগুলো সরকারের সঙ্গে কোনো অংশীদারত্বে যাচ্ছে না।
বিএসএমএমইউর প্যালিয়েটিভ কেয়ার বিভাগের প্রধান নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘স্টেট অব দ্য আর্ট’ চিকিত্সাপদ্ধতির কথা শোনা যাচ্ছে। অথচ তিনি নিজে সাতক্ষীরা থেকে দু-একদিন আগে একটি ফোন পান। তিনি বলেন, ‘ছেলেটি আমাকে বলল, তার মায়ের বুকে বেল আকৃতির একটা টিউমার হয়েছে। সেটি পেকে গেছে। সেখান থেকে পোকা বের হচ্ছে। প্রচণ্ড দুর্গন্ধ। কে তাকে বলবে তারপিন তেল, মেট্রোনিডাজল আর মরফিন ট্যাবলেট পৌঁছানো গেলেই মা কিছুটা স্বস্তি পেত?’ সরকারি হাসপাতালে সব সময় ওষুধের সরবরাহ থাকে না। রোগীদের চিকিত্সকেরা ৬৫ হাজার টাকার কেমোথেরাপির ওষুধ লিখে দিচ্ছেন।
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের হিস্টোপ্যাথলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, সরকার জনবল তৈরি করছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলো জনবল তৈরি করছে না। বেসরকারি হাসপাতালগুলো সরকারের তৈরি জনবলকে নিয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয়টি ভেবে দেখা উচিত।
ক্যানসার চিকিত্সা নিচ্ছেন সানশাইন এডুকেশন গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ক্যানসার সারভাইভার শাফিয়া গাজী রহমান। তিনি ইউনাইটেডে চিকিত্সা নিচ্ছেন। সিঙ্গাপুরের হাসপাতালের চেয়ে এখানে চিকিত্সা-ব্যয় কম। কিন্তু তিনি বলেন, ‘কতজন এই সেবা নিতে পারবেন, আমি জানি না। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ক্যানসার রোগীরা ছোটোখাটো ওষুধও পায় না।’
ইউনাইটেড হাসপাতালের ক্যানসার কেয়ার সেন্টারের পরিচালক শান্তনু চৌধুরী দীর্ঘদিন ভারতের টাটা মেমোরিয়াল হসপিটালে চিকিত্সা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ক্যানসারের চিকিত্সা খরচসাপেক্ষ। প্রাথমিক স্তরে একরকম চিকিত্সা, মাধ্যমিক স্তরে একরকম ও শেষ পর্যায়ে আরেক রকম চিকিত্সা প্রয়োজন। ভারতে স্বাস্থ্যবিমার সুযোগ আছে। সেখানে কেমোথেরাপি নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার কিছুটা ব্যয় নির্বাহ করে, ইনস্যুরেন্স কোম্পানি বাকিটা বহন করে। দরিদ্র রোগীদের আলাদা কার্ড থাকে। তারা কার্ড দেখিয়ে সর্বোচ্চ চিকিত্সা সেবাটা পায়। টেলিমেডিসিনেরও সুযোগ আছে।
সরকারি হাসপাতালে সীমাবদ্ধ চিকিত্সা: জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক শেখ গোলাম মোস্তফা বলেন, সরকারের জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ আটটি মেডিকেল কলেজ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যানসার চিকিত্সার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু অল্পস্বল্প যন্ত্রপাতি দিয়ে ১২-১৩ লাখ ক্যানসার রোগীর চিকিত্সা-সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। আর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটে শয্যাসংখ্যা ১৫০। গড়ে প্রতিদিন বহিঃবিভাগে ৫০ জন নতুন রোগী, চার/পাঁচ শ পুরোনো রোগী আসে। বছরে হাসপাতালে চিকিত্সা নেয় এক লাখ রোগী।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যাপক ও রেডিওথেরাপি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মোয়াররফ হোসেন বলেন, প্রতি ১০ লাখে
একটি সেন্টার থাকা বাঞ্ছনীয়, সে হিসাবে গোটা দেশে চিকিত্সাপ্রতিষ্ঠান থাকা দরকার ১৬০টি, আছে মোট ২০টি কেন্দ্র। ঢাকা মেডিকেল কলেজ দুটি কোবাল্ট মেশিন ও একটি লিনিয়ার এসকেলেটর সকাল সাড়ে আটটা থেকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত চালাচ্ছে। প্রতিদিন পৌনে ৩০০ রোগী রেডিওথেরাপি নেয়, বহিঃবিভাগে প্রতিদিন ১০০ জন রোগী আসে , ১০-১৫ জন ডে-কেয়ারে সেবা নেয়।
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটের মেডিকেল অনকোলজি বিভাগের প্রধান পারভীন সাহিদা আক্তার বলেন, ক্যানসারের চিকিত্সায় রোগীর জন্য বিপুলসংখ্যক নার্সের প্রয়োজন হয়। অথচ তাঁদের হাসপাতালে চিকিত্সকের চেয়ে নার্সের সংখ্যা কম। তিনি আরও বলেন, লিনিয়াক এসকেলেটর দামি যন্ত্র। এর পরিবর্তে কম মূল্যে কোবাল্ট মেশিন কিনে জেলা শহরগুলোয় চিকিত্সা-সেবা দেওয়া যতে পারে। অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক আছেন ঢাকায়। তাঁরাও নিয়মিতভাবে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে গিয়ে চিকিত্সা-সেবা দিতে পারেন।
বিএসএমএমইউর ইউরোলজি বিভাগের সাবেক প্রধান মো. আবদুস সালাম বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও বিএসএমএমইউতেও প্রচুর বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক আছেন, যাঁদের সে অর্থে তেমন কোনো কাজ নেই। যেসব হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ নেই, সেখানে এঁরা নিয়মিত গিয়ে সেবা দিতে পারেন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যাপক আহমেদ সাইদ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম, ইউনাইটেড হাসপাতাল লিমিটেডের ক্লিনিক্যাল অপারেশনসের পরিচালক আহমেদ সাঈদ প্রমুখ।
সূত্র -প্রথম আলো

