ফুটফুটে একটি মেয়ে শারমিন (২০), প্রথম সন্তানের মা হতে যাচ্ছে। নতুনআগন্তককে স্বাগত জানাতে সংসারে আনন্দসহ শতেক ব্যস্ততা। কিন্তু এর মধ্যেএকদিন বিষাদের কালো ছায়া নেমে এলো, যখন চিকিৎসক জানালেন গর্ভে বাচ্চারসমস্যা হচ্ছে। চিকিৎসকের কথা মতো তড়িঘড়ি করে অপারেশন করা হলো। জানা গেলশারমিনের দুটো কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে। বাচ্চাটা প্রাণে বেঁচে গেল, কিন্তুমায়ের প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যায়। প্রথমে আইসিইউ পরে ল্যাবএইড স্পেশালাইজডহাসপাতালে ৫ম তলায় শারমিনকে ভর্তি করানো হলো। সে এখন বেঁচে আছেডায়ালাইসিসের মাধ্যমে। কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বললেন, ‘আমার সন্তানকে কখন কাছেপাবো?’
শারমিনের প্রতাশা তার কিডনি আবার সক্রিয় হয়ে উঠবে। কিডনি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারজানান, শারমিনের মতো দুর্ভাগ্য নারীর সংখ্যা কতো, যারা এমন ব্যয়বহুলচিকিৎসার ব্যয় বহন করতে সক্ষম। এই প্রশ্নের উত্তর কারো জানা নেই। কারণ এসম্পর্কিত কোনো জরিপ পাওয়া যায়নি।
প্রতিদিন বাড়ছে কিডনি রোগীর সংখ্যা। জনস্বাস্থ্য সেবা অধিদফতরেরপরিসংখ্যানে দেখা যায়, বর্তমানে দেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা প্রায় দুই কোটি।এদের মধ্যে প্রতিবছর ৪০ হাজার লোক মারা যায়। কিডনি রোগের উন্নত চিকিৎসারজন্য প্রায় ১০ হাজার বিত্তবান মানুষ ভারত, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক এবং আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে গিয়ে থাকেন।
কিডনি রোগের লক্ষণ
ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, মাঝে মাঝে হালকা কোমর ব্যথা অনুভব করা, প্রস্রাবকরার পরও আরো প্রস্রাব করার ইচ্ছা, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া অনুভব করা, বমিবমিভাব, মাঝে মাঝে জ্বর হওয়া, থার্মোমিটারে রিডিং না আসা, অনিদ্রাসহবিভিন্ন ধরনের লক্ষণ রয়েছে।
ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতালের কিডনি রোগ বিভাগের চিফ কনসালট্যান্ট এবংবিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদ বলেন, কিডনি রোগ একটি নীরব ঘাতক।প্রত্যেক কিডনি রোগীই নিজেকে সুস্থ মনে করেন। শতকরা ৯৫ শতাংশ কিডনি রোগীদুটো কিডনি অকেজো হওয়ার আগে এর ভয়াবহতা ও বিপদের মাত্রা বুঝতে পারেন না।
তিনি আরো জানান, মেয়েদের সাধারণত যতদিন পর্যন্ত প্রজননক্ষম থাকে ততদিনপর্যন্ত তাদের কিডনি রোগ পুরুষের তুলনায় কম হয়। তবে কয়েকটি ক্ষেত্রে মেয়েরাকিডনি রোগের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যেমন: গর্ভবতী মেয়েরা উচ্চ রক্তচাপ, প্রি-অ্যাকলাম্পশিয়া, অ্যাকলাম্পশিয়া, গর্ভপাতজনিত কিডনি ফেইলিওর, প্রস্রাবে প্রদাহ, আগেকার কিডনি রোগ সক্রিয় হয়ে ওঠা ও অপারেশনজনিত কিডনিফেইলিওরে আক্রান্ত হতে পারেন। তাছাড়া মেয়েদের প্রস্রাবে সংক্রমণ ছেলেদেরতুলনায় অনেক বেশি। বাতজনিত রোগ থেকে কিডনি আক্রমণ করে। মেয়েদের ক্ষেত্রেছেলেদের তুলনায় ৯ গুণ বেশি হয়ে থাকে বলেও তিনি জানান।
খাদ্যে বিষক্রিয়ার কারণেই বেশির ভাগ মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।রাজধানীর বাজার, ফুটপাতগুলোতে শাক-সবজি, মাছ-মাংস ও ফল দীর্ঘ সময় তরতাজারাখতে এক ধরনের বিষাক্ত কেমিক্যাল ব্যবহার করছে। এই রাসায়নিকগুলো খুব সহজেইশরীরে ঢুকে যায়। ফলে ধীরে ধীরে মরণব্যাধি তার থাবা বিস্তার শুরু করে। পাঁচথেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুরা কিডনি প্রদাহে বেশি আক্রান্ত হয়। এদের মধ্যেছেলেরা এ রোগে বেশি ভোগে। এছাড়াও শিশুদের একটি সাধারণ কিডনি রোগ হচ্ছেনেফ্রোটিক সিনড্রোম। এ রোগ হলে শিশুদের সমস্ত শরীর ফুলে যায়। দুই থেকে ছয়বছর বয়সী শিশুরা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। এ সময় প্রস্রাবের সঙ্গে প্রচুরপরিমাণ প্রোটিন শরীর থেকে বেড়িয়ে যায়।
গর্ভবর্তী মহিলাদের উচ্চ রক্তচাপ থেকে কিডনি বিকলের আশঙ্কা
স্বাভাবিক সুস্থ মহিলাদের রক্তচাপ গর্ভবতী অবস্থায় নেমে যায়। বিশেষ করেডায়াসটলিক প্রেসার ১০-১৫ এবং সিসটোলিক ১৫-২৫ মিলিতে নেমে যায়। কাজেইগর্ভবতী অবস্থায় রক্তচাপ আগের মতো থাকলেই উচ্চ রক্তচাপ হিসেবে গণ্য করতেহবে। বিশেষ করে ডায়াসটলিক প্রেসার যদি ৯০-এর উপরে থাকে তবে তা উচ্চ রক্তচাপহিসেবে গণ্য করতে হবে। গর্ভবস্থায় মহিলাদের উচ্চ রক্তচাপ চার ভাগে ভাগ করাযায়। প্রি-অ্যাকলাম্পশিয়া, অ্যাকলাম্পশিয়া, কিডনি সংক্রান্ত উচ্চ রক্তচাপ ওআহে থেকেই থাকা উচ্চ রক্তচাপ।
প্রি-অ্যাকলাম্পশিয়া ও অ্যাকলাম্পশিয়া
যে সমস্ত গর্ভবতী মহিলার গর্ভধারণের পর প্রাথমিক পর্যায়ে রক্তচাপস্বাভাবিক থাকে, কিন্তু গর্ভবতী হওয়ার ২০ সপ্তাহ পর হঠাৎ উচ্চ রক্তচাপেআক্রান্ত হয়, সঙ্গে প্রস্রাবে অ্যালবুমিন নির্গত হয়, রক্তে অ্যালবুমিন কমেআসে, তাদের এই অবস্থাকে প্রি-অ্যাকলাম্পশিয়া বলা হয়। মনে রাখতে হবে দ্রুতচিকিৎসার মাধ্যমে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ না করলে রক্তচাপ দ্রুত বেড়ে গিয়ে মা ওসন্তানের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। কিডনি ফেইলিওরও হতে পারে।
প্রি-অ্যাকলাম্পশিয়ার সঙ্গে যদি খিঁচুনি দেখা যায়, তবে তাকেঅ্যাকলাম্পশিয়া বলে। এটি গর্ভবতী মায়ের জন্য একটা জরুরি অবস্থা। স্ত্রী রোগও কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতায় চিকিৎসা করাতে হবে।প্রয়োজনে মায়ের জীবন রক্ষার্থে গর্ভপাত ঘটাতে হবে, নয়তো নির্ধারিত আগেইবাচ্চা ডেলিভারি করাতে হবে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে কিডনি বিকলহয়ে যেতে পারে। এ অবস্থায় সুস্থ হয়ে গেলে ভবিষ্যতে এদের উচ্চ রক্তচাপ দেখাদিতে পারে। প্রস্রাবে অ্যালবুমিন থাকলে কিডনি বিকল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাইপ্রি-অ্যাকলাম্পশিয়া ও অ্যাকলাম্পশিয়ার রোগীদের কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞচিকিৎসকের পরামর্শে থাকা উচিত।
আগে থেকে কিডনি রোগ থাকলে গর্ভবতী হওয়ার পর ঝুঁকি বেশি
কিডনি নিশেষজ্ঞরা বলেন, যাদের বিভিন্ন ধরনের নেফ্রাইটিস আছে বা যারাধীরগতির কিডনি রোগে ভুগছেন, তাদের গর্ভবতী হওয়ার পর ঝুঁকি সাধারণ মায়েদেরচেয়ে অনেক অনেক বেশি। গর্ভবতী অবস্থায় আগেকার কিডনি রোগ বেড়ে যেতে পারে।কিডনির ওষুধ সেবনের জন্য বাচ্চার ক্ষতি হতে পারে, গর্ভপাতজনিত দেখা দিতেপারে, কিডনি রোগ বেড়ে গিয়ে মা ও শিশুর মৃত্যু হতে পারে। কাজেই কারো আগেথেকে কিডনি রোগ থেকে থাকলে তা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরপরামর্শ মোতাবেক গর্ভধারণ করতে পারেন। কারো যদি বাত জাতীয় কিডনি রোগ থাকে, তবে চিকিৎসা করে কমপক্ষে ৬ মাস রোগ নিষ্ক্রিয় থাকার পর কিডনি বিশেষজ্ঞেরপরামর্শ অনুসারে গর্ভধারণ করতে পারেন। যদিও এতে ঝুঁকি থেকেই যাবে। গর্ভবতীঅবস্থায প্রস্রাবে সংক্রমণের হার অনেকগুণ বেড়ে যায়। অনেক সময় কোনো উপসর্গছাড়াই ইনফেকশন হতে পারে। গর্ভাবস্থায় প্রস্রাবে ইনফেকশন কিডনির অনেকক্ষতিসাধন করতে পারে, তাই বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে গুরুত্বসহকারে এরচিকিৎসা করা বাঞ্চনীয়। সূত্র: বাসস
সূত্র - নূতনের বার্তা

