পোড়া রোগীদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের চিকিৎসকেরা। নিয়মিত রোগীর সঙ্গে রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার অনেক রোগী একসঙ্গে ভর্তি হওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
রোগীর আত্মীয়স্বজন, রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী, সাধারণ মানুষ, সাংবাদিক ও পুলিশ পোড়া রোগীদের দেখতে ভিড় করছেন হাসপাতালে। হুড়মুড় করে তাঁরা ঢুকে পড়ছেন বিভিন্ন ওয়ার্ডে। রেহাই পাচ্ছে না নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রও (আইসিইউ)। কর্তৃপক্ষ বলছে, এসব দর্শনার্থী চিকিৎসায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় জানায়, সহিংসতার শিকার ৩১ জন রোগী এই ইউনিটে ভর্তি ছিলেন। গত বৃহস্পতিবার শাহবাগের ঘটনায় ১৮ জন এই ইউনিটে ভর্তি হয়েছিলেন। এর মধ্যে দুজন মারা গেছেন। ভর্তি আছেন ১৬ জন। এর আগের বিভিন্ন ঘটনায় ভর্তি আছেন ১৪ জন। গতকাল ভর্তি হয়েছেন আরও একজন। তিনি গত পরশু আহত হয়েছিলেন।
কর্মরত চিকিৎসা কর্মকর্তা হোসাইন ইমাম প্রথম আলোকে বলেন, পোড়া রোগীর যন্ত্রণা অন্য রোগীর চেয়ে তীব্র হয়। এসব রোগীর সঙ্গে আত্মীয়স্বজন বা দর্শনার্থী বেশি থাকেন। আর রোগী যদি রাজনৈতিক ঘটনার শিকার হন, তবে দর্শনার্থীর সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়।
হাসপাতালের পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, পোড়া রোগীদের সংক্রমণের আশঙ্কা বেশি থাকে। রোগীর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দর্শনার্থী হাসপাতালে ঢুকছেন, আর বের হচ্ছেন। এতে রোগীদের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে। কিন্তু দর্শনার্থীদের বোঝানো যাচ্ছে না। দর্শনার্থীরা সুচিকিৎসার বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
গতকাল সকালে সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী সাহারা খাতুন রোগীদের দেখতে হাসপাতালে আসেন। তাঁর সঙ্গে থাকা দলীয় লোকজন বিভিন্ন ইউনিটে যান। একই ঘটনা ঘটে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর পরিদর্শনের সময়ও। তিনি আসেন দুপুর ১২টার দিকে। তাঁর সঙ্গে জাসদের লোকজন বিভিন্ন ইউনিট ঘোরেন। এসেছিলেন সাবেক স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী মুজিবুর রহমান ফকির, তবে সঙ্গে লোক বেশি ছিল না। এ ছাড়া আছে সাংবাদিক ও ফটোগ্রাফারদের চাপ। আসেন পুলিশসহ নানা সংস্থার লোকজনও।
বেলা সোয়া তিনটায় ওই ইউনিটের বারান্দায় কথা হয় লালবাগ থেকে আসা আবদুল কুদ্দুসের সঙ্গে। এই ব্যবসায়ীর সঙ্গে ছিলেন আরও ছয় যুবক। তিনি এই প্রতিবেদককে বললেন, ‘আহত মানুষ দেখতে এসেছি। মন খুবই খারাপ।’ তবে আহতদের মধ্যে তাঁর কোনো আত্মীয় নেই।
একাধিক চিকিৎসক বলেছেন, জনবল ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার অভাবও সুচিকিৎসার অন্তরায়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বার্ন ইউনিট যাত্রা শুরু করেছিল ৫০ শয্যা দিয়ে। জনবল ছিল শয্যা অনুপাতে। সম্প্রতি শয্যা বাড়িয়ে ১৫০ করা হয়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে জনবল বাড়ানো হয়নি। প্রতিদিন এই ইউনিটে গড়ে ৩৫০ রোগী ভর্তি থাকেন। ২৪ জন শিক্ষানবিশ নিয়ে মোট ৩৭ জন চিকিৎসক কাজ করেন। নার্স দরকার ১৫০ জন। আছেন ৭০ জন। অন্যান্য স্বাস্থ্যসহকারীও প্রয়োজনের তুলনায় কম।
হোসাইন ইমাম বলেন, অন্য তিনজন রোগীর সেবায় যে সময় লাগে, একজন পোড়া রোগীর পেছনে সেই সময় দিতে হয়। তিনি বলেন, একজন পোড়া রোগীর ড্রেসিং করতে গড়ে ৪৫ মিনিট সময় লাগে। এত রোগীর সেবা দিতে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীকে প্রতিদিন হিমশিম খেতে হয়।
বার্ন ইউনিটের তিন, চার ও পাঁচতলা ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি তলায় বারান্দায়ও রোগী। বিকেল পাঁচটায় ৪১৬ নম্বর কক্ষের সামনের বারান্দায় ভিড় চোখে পড়ে। এই কক্ষে বৃহস্পতিবারের ঘটনার কয়েকজন রোগী আছেন। একজন আনসার ভিড় সামলানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু নানা অজুহাতে দর্শনার্থী ঢুকে পড়ছেন।
সূত্র - প্রথম আলো

