ভারতের সুপ্রিম কোর্ট গত সপ্তাহে এক ঐতিহাসিক রায়ে চিকিৎসায় অবহেলার এক ঘটনায় এক অনাবাসী ভারতীয়কে মোট ১১ কোটি রুপি ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য কলকাতার এক হাসপাতালকে নির্দেশ দিয়েছে।
আমেরিকা-প্রবাসী ডাক্তার কুনাল সাহা-র স্ত্রী অনুরাধা ভারতে বেড়াতে এসে মারা গিয়েছিলেন ১৯৯৮ সালে, তারপর দীর্ঘ পনেরো বছর ধরে সেই মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসকদের অবহেলার অভিযোগে আইনি লড়াই লড়ে আসছিলেন ডা. সাহা।
চিকিৎসায় গাফিলতির কোনো ঘটনায় এত বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণের নির্দেশ ভারতে নজিরবিহীন, এবং গোটা দেশের চিকিৎসা পদ্ধতিতেই এই রায় বিরাট প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভারতে চিকিৎসার গাফিলতিতে রোগীর মৃত্যু ঘটছে হরহামেশাই, কিন্তু এর প্রতিকার মেলে খুব কম ক্ষেত্রেই।
এই হতাশার ছবিতে আশ্চর্য এক ব্যতিক্রম ডা: কুনাল সাহা, দেড় দশক ধরে লাগাতার লড়াই চালিয়ে যিনি স্ত্রীর মৃত্যুর জন্য রেকর্ড অঙ্কের ক্ষতিপূরণ আদায় করতে সক্ষম হয়েছেন।
আমেরিকার ওহাইও থেকে ডা: সাহা বলছিলেন, ‘এরকম হাজারে একটা ঘটনাতেও লোকে লড়াই করে জিততে পারে না। সে জন্যই লোকে লড়াই শুরুই করে না – বরং ডাক্তারকে মারধর করে কিংবা হাসপাতালে ভাঙচুর চালায়!’
আর সে কারণেই সুপ্রিম কোর্টের এই দৃষ্টান্তমূলক রায় এই পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আনবে বলে তার আশা।
তিনি আরো বলছেন, এই মামলায় জেতাটা শুধু তার ব্যক্তিগত অর্জনই শুধু নয়, চিকিৎসার ভুলে স্বজনকে হারানো বহু লোককেই লড়ার ভরসা দেবে এই রায়।
কুনাল সাহা তার স্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় প্রথম অভিযোগ দায়ের করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মেডিক্যাল কাউন্সিলে, আর তখন সেই সংস্থার প্রেসিডেন্ট ছিলেন অশোক চৌধুরী।
বর্ষীয়ান চিকিৎসক ডা: চৌধুরীর মতে, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর ডাক্তাররা এখন নিজেদের পিঠ বাঁচাতেই রোগীদের নানারকম পরীক্ষা করাতে বলবেন।
তিনি বলছেন, ‘এর ভাল ও খারাপ দুটো দিকই আছে। ডাক্তাররা যেমন এখন অনেক বেশি সাবধান হবেন, তেমনি গরিব রোগীদের তারা এখন অনেক বেশি পরীক্ষা করাতে বলবেন, যার জন্য তাদের ওপর আর্থিক চাপ পড়বে!’
খরচ বাড়বে ঠিকই – কিন্তু চিকিৎসার ভুল যে ধরানো সম্ভব, এই রায় সেটাও প্রমাণ করছে বলে ডা: কুনাল সাহার দাবি।
তিনি বলছেন, ‘চিকিৎসাবিদ্যা একটা বিজ্ঞান, আর এর ভুলত্রুটিও বৈজ্ঞানিক পন্থাতেই আদালতে ধরিয়ে দেয়া যায় – যেটা আমি ধরিয়ে দিয়েছি।’
ডা: সাহার কথায়, ‘মাত্র কয়েক বছর আগেও অপচিকিৎসা কথাটাই কেউ মানত না – কিন্তু এখন খবরের কাগজ খুললে রোজ অপচিকিৎসার নানা ঘটনা থাকে – কারণ এখন মানুষের সচেতনতা অনেক বেড়েছে।’
কিন্তু যখন এই সচেতনতা ছিল না, তখনও কীভাবে তিনি এই কঠিন লড়াই লড়ে যাওয়ার জোর পেয়েছেন?
এই প্রশ্নে অবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন ডা: সাহা, বলেন তার স্ত্রী অনুরাধার স্মৃতিই তাকে এই লড়াই লড়ার প্রেরণা দিয়েছে। সারা পৃথিবী জানে তার স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু তার কাছে অনুরাধা মরেননি।
পনেরো বছর ধরে তিনি সে জন্যই লড়াই চালিয়ে যেতে পেরেছেন – ভারতে যেখানে রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি, তার বিরুদ্ধে এবং ১৪ হাজার মাইল দূর থেকে বারবার কাজকর্ম ফেলেও মামলার জন্য ছুটে গেছেন তার নিজের কথাতেই একটা ‘অসম্ভব’ লড়াই লড়তে।
এই অসম্ভব লড়াইটাই একটা নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে, যে বিরাট অঙ্কের অর্থদণ্ডের ভয় ভারতের চিকিৎসা পদ্ধতিতেই আমূল বদল এনে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে! সূত্র: বিবিসি।
সূত্র - natunbarta.com

