সাইকেল চালাতে গিয়ে শিশুটির হাত ভাঙে। বাবা তাকে নিয়ে যাচ্ছিলেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পথে দালালের খপ্পরে পড়ে তিনি যান নগরের ডলফিন ক্লিনিকে। সেখানে ব্যান্ডেজ করার সময় চিকিৎসক শিশুটিকে উচ্চমাত্রার চেতনানাশক দেন। আর ঘুম ভাঙেনি শিশুটির। পরে এলাকাবাসী এসে ক্লিনিক ভাঙচুর করেন। গতকাল বুধবার সন্ধ্যার এ ঘটনায় পুলিশ ক্লিনিকের মালিকসহ চারজনকে আটক করে। পুলিশ এ সময় চিকিৎসক এনামুল হকের লেখা শিশুটির মৃত্যুসনদ উদ্ধার করে। এনামুল রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের চিকিৎসক এবং ওই ক্লিনিকের অংশীদার বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে ঘটনার পর তাঁকে ক্লিনিক বা অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
শিশুটির নাম মুস্তাকিন। তার বাড়ি রাজশাহীর তানোর উপজেলার মহাদেবপুর গ্রামে। বাবার নাম শামসুদ্দিন। মুস্তাকিন মহাদেবপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র ছিল। আটক ব্যক্তিরা হলেন ক্লিনিকের মালিক নওশের আলী, অস্ত্রোপচারকক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত রফিকুল ইসলাম, সেবিকা মুক্তা খাতুন ও এক্স-রে কারিগর মাসুদ রানা। নওশের রাজশাহী ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির চিকিৎসক। রফিকুল ইসলাম এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে এই ক্লিনিকে কাজ নিয়েছিলেন বলে জানান। মুস্তাকিনের ফুফু আকলিমা খাতুন বলেন, গত মঙ্গলবার বিকেলে সাইকেল চালাতে গিয়ে পড়ে মুস্তাকিনের বাম হাত ভেঙে যায়। এক দিন পরে গতকাল বুধবার বিকেলে মুস্তাকিনের বাবা শামসুদ্দিন ছেলের হাতের ব্যান্ডেজ করানোর জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসছিলেন। নগরের বর্ণালীর মোড়ে একজন রোগী ধরা দালাল তাঁকে ফুসলিয়ে ডলফিন ক্লিনিকে নিয়ে যান। দালাল তাঁকে বোঝান মাত্র আড়াই হাজার টাকা দিলেই তাঁর ছেলের হাত ব্যান্ডেজ করে দেবেন।
আকলিমা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘ছেলের তো তেমন কিছু হয়নি। শুধু হাতটা ভেঙে ছিল। ছোট ছেলে ওটাকে আমলই দিচ্ছিল না। বাড়ি থেকে আসার সময় ভাত খেয়ে এসেছে। ক্লিনিকে এসেও ছোটাছুটি করেছে। গল্প করেছে। আমরা ভালো ছেলের কী সর্বনাশ করলাম।’ মুস্তাকিনের বাবা শামসুদ্দিন বলেন, সরল বিশ্বাসে তিনি ছেলেকে নিয়ে ক্লিনিকে যান। তাঁরা তাঁকে ইনজেকশন কিনে আনার জন্য লিখে দেন। তিনি তা কিনে আনেন। তিনি বলেন, বিকেল চারটার দিকে ব্যান্ডেজ শুরু করার সময় চিকিৎসক ইনজেকশন দিলে ছেলে ঘুমিয়ে পড়ে। সন্ধ্যা হয়ে গেলেও ছেলের আর জ্ঞান ফেরেনি দেখে তিনি কান্নাকাটি শুরু করেন। বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে স্থানীয় লোকজন এসে ক্লিনিক ভাঙচুর করেন। ‘আমার টাকা দিয়ে ইনজেকশন এনে আমার ছেলেকেই মেরে ফেলল ভাই’ বলে শামসুদ্দিন ডুকরে কেঁদে ওঠেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ও র্যাব গিয়ে ক্ষুব্ধ লোকজনকে নিবৃত করেন।
রাত আটটার দিকে ক্লিনিকে গিয়ে দেখা যায়, শিশু মুস্তাকিনকে ক্লিনিকের তৃতীয় তলায় অস্ত্রোপচারকক্ষের পাশে একটা বিছানায় শুইয়ে রাখা হয়েছে। তার শরীর থেকে স্যালাইনের সুই বের করা হয়নি। স্যালাইনের ব্যাগ স্ট্যান্ডের সঙ্গে ঝোলানোই রয়েছে। ক্লিনিকের চিকিৎসক থেকে কর্মচারী পর্যন্ত সবাই পালিয়ে গেছেন। কথা বলার জন্য সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি। হামলাকারীরা ক্লিনিকের অভ্যর্থনা কক্ষ, প্যাথলজি বিভাগ, এক্স-রে কক্ষসহ যে চিকিৎসকের হাতে শিশুটি মারা গেছে—সেই চিকিৎসক এনামুল হকের কক্ষের কাচ ভাঙচুর করেছেন। ক্লিনিকের মেঝেতে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ।
ক্লিনিকে তখনো ৩০-৩৫ জন রোগী রয়েছে। তাদের তদারকি করার মতো কোনো চিকিৎসক নেই। চাঁপাইনবাবগঞ্জের একজন রোগীকে এক ঘণ্টা আগে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। সে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। তাকে ওষুধ দেওয়ার কোনো চিকিৎসক নেই। তার অভিভাবক সাইদুর রহমান বলেন, এ রোগীর মতো অনেক রোগীর এই অবস্থা। তাঁরা বুঝতে পারছেন না এখন কী করবেন। থানায় আটক ক্লিনিকের মালিক নওশের আলী বলেন, শিশুটিকে ব্যান্ডেজ করার সময় ‘ক্যালিপসল’ ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল। এটি একটি চেতনানাশক ইনজেকশন। তিনি ধারণা করছেন এই ইনজেকশনের কারণে শিশুটি মারা গেছে। তিনি বলেন, শিশুটির ব্যান্ডেজ করার সময় তিনি নগরের নিউমার্কেট এলাকায় একটি কাজে ছিলেন। বোয়ালিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান বলেন, যে ইনজেকশনের কারণে শিশুটি মারা গেছে, তিনি আলামত হিসেবে তা সংগ্রহ করেছেন। শিশুর অভিভাবকেরা এলে এ ব্যাপারে একটি হত্যা মামলা করা হবে।
সূত্র - প্রথম আলো

