দেশে সাম্প্রতিক সময়ে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আমদানি নিষিদ্ধ ওষুধ ও চিকিৎসা যন্ত্রপাতির আমদানি বেড়েছে। বড় মাপের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এ কাজে জড়িত। গত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর- এ তিন মাসে মিথ্যা ঘোষণায় আনা আটককৃত ওষুধের মধ্যে ৩১ ধরনের নিষিদ্ধ ওষুধ ছিল। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহেই আটবার বড় ধরনের চালান ধরা পড়ে। এ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে নজরদারি বাড়াতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) চিঠি পাঠিয়েছে ওষুধ প্রসাশন অধিদপ্তর।
চিঠিতে বলা হয়েছে, 'বাংলাদেশের বিভিন্ন এয়ারপোর্ট এবং অন্যান্য পোর্ট অব এন্ট্রি দিয়ে আমদানি নিষিদ্ধ ওষুধ ও মেডিক্যাল ডিভাইস মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে দেশে প্রবেশ করছে, যা জনস্বাস্থ্য ও দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।'
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, গত অক্টোবর-ডিসেম্বরে মিসর ও তুরস্ক থেকে নিষিদ্ধ ওষুধ আমদানি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এসব নিষিদ্ধ ওষুধের বেশির ভাগ চালান খাদ্যপণ্য হিসেবে ঘোষণা দেওয়া ছিল। গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতে এবং শুল্ক কর্মকর্তাদের সন্দেহ হওয়ায় এসব চালান ধরা পড়ে। ওই তিন মাসে ৬২টি চালানে আমদানি নিষিদ্ধ ওষুধ আটক করা হয়। এসব ওষুধের মূল্য ৪১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এ ছাড়া আমদানি নিষিদ্ধ নয়- এমন ওষুধও জব্দ করা হয়েছে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আনায়।
শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ থেকে জানা যায়, গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতে গত ২৩ অক্টোবর ওষুধ প্রসাশন ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে ফুড সাপ্লিমেন্ট ঘোষণায় মিসর থেকে আনা ২৭ লাখ টাকা মূল্যের তিন ধরনের ওষুধ এবং তুরস্ক থেকে ডিএইচএল কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে আনা ২৮ ধরনের অবৈধ ও নিষিদ্ধ ওষুধ জব্দ করে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, মিথ্যা ঘোষণায় নিষিদ্ধ এবং নিষিদ্ধ নয়- এমন উভয় ধরনের ওষুধ আনা হচ্ছে। আবার লাইন্সেসিং অথরিটির (ড্রাগস) অনুমোদন ছাড়াই বিপুল পরিমাণে ইনফিউশন সেট, ডিসপোজেবল সিরিঞ্জসহ মেডিক্যাল ডিভাইস ছাড় করানো হচ্ছে। মিথ্যা ঘোষণায় আনা বড় মাপের মাল আটকের ঘটনা অক্টোবরের শেষ সপ্তাহেই ঘটে আটবার। এ আমদানির সঙ্গে দেশের অনেক বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান জড়িত। ধারণা করা হচ্ছে, মিথ্যা ঘোষণায় আরো ওষুধ আসছে, যা নজরদারির বাইরে থেকে যাচ্ছে।
এনবিআর চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, নিষিদ্ধ ওষুধ আমদানির বিষয়ে এনবিআর কঠোর নজরদারি করছে। আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে মিথ্যা ঘোষণায় কেউ যাতে কোনো ধরনের পণ্য আমদানি করতে না পারে, সে বিষয়ে সর্তকতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এনবিআর পুরোপুরি অটোমেশনে গেলে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আনা বন্ধ করা সম্ভব হবে।
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তা ও দেশীয় ওষুধ শিল্পের গুরুত্ব বিবেচনা করে বিভিন্ন সংস্থার বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে গঠিত 'স্ট্যান্ডিং কমিটি ফর ইম্পোর্ট' ওষুধ আমদানির অনুমতিপত্র (ইনডেন্ট) অনুমোদন করে। এরপর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা আমদানীকৃত ওষুধের ছাড়পত্র প্রদান করে থাকে। এতে জনস্বাস্থ্যের জন্য বা দেশীয় ওষুধ শিল্পের জন্য ক্ষতিকর কোনো ওষুধ আমদানির সুযোগ থাকে না। তাই নিষিদ্ধ ওষুধ আনতে ব্যবসায়ীরা মিথ্যা ঘোষণায় আশ্রয় নিচ্ছে। আবার রাজস্ব ফাঁকি দিতেও মিথ্যা ঘোষণায় ওষুধ আমদানি করছে।
আমদানি নিষিদ্ধ ওষুধ আমদানি রোধে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন মল্লিক এনবিআরে পাঠানো চিঠিতে সুপারিশ জানিয়ে লেখেন, বিশেষভাবে দেশের প্রধান বিমানবন্দর ও অন্যান্য পোর্ট অব এন্ট্রিদিয়ে ওষুধ, মেডিক্যাল ডিভাইস, ওষুধ উপাদানযুক্ত ফুড সাপ্লিমেন্ট, জন্ম নিরোধক ওষুধ, জন্ম নিরোধক মেডিক্যাল ডিভাইস সামগ্রী, ভ্যাকসিন ও বায়োলজিক্যাল প্রডাক্ট ছাড়করণের পূর্বে এ অধিদপ্তরের মতামত গ্রহণ, প্রয়োজনবোধে এ অধিদপ্তরের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে ছাড়করণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া ওষুধ হিসেবে সন্দেহমূলক পণ্য জব্দ করার ক্ষেত্রেও ওষুধ প্রশাসন সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।'
সূত্র - কালের কণ্ঠ

