বিজ্ঞানীরা ঘুমকে বিভক্ত করেছেন ২টি শ্রেণীতে। রেম ঘুম (Rem sleep) এবং ননরেম ঘুম (Non-rem sleep) হিসেবে। ঘুমের জন্যে ব্রেনে এখনও কোন আলাদা কেন্দ্র আবিষ্কৃত হয় নি। জাগৃতি কেন্দ্র থেকেই ঘুম নিয়ন্ত্রিত হয়। মনে
করা হয়, নন-রেম ঘুম নিয়ন্ত্রিত হয় জাগৃতি কেন্দ্রের র্যানফ নিউক্লিয়াস থেকে। আর র্যানফ নিউক্লিয়াস-এর তৎপরতা পরিচালিত হয় সেরাটনিন হরমোন দ্বারা। আর রেম ঘুম নিয়ন্ত্রিত হয় লোকাস মেরুলিয়াস দ্বারা। লোকাস মেরুলিয়াস-এর কার্যক্রম পরিচালিত হয় নর-এড্রিনালিন হরমোন দ্বারা।
ননরেম ঘুম দিয়ে ঘুমানোর কাজ শুরু হয়। ৯০ মিনিটের একটা ঘুম চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। সারা রাতে ৪ থেকে ৬ বার এই চক্র কাজ করে। ৯০ মিনিটের এই চক্রে ১০-২০ মিনিট বরাদ্দ থাকে রেম ঘুমের জন্যে। ঘুমের প্রথম দিকে নন রেম ঘুম বেশি হয়। পরে রেম ঘুম বেশি। ঘুমানোর সময় যত বাড়তে থাকে রেম ঘুমের পরিমাণ তত বাড়তে থাকে। রেম ঘুম আসলে হালকা ঘুম, এসময় চোখ নড়ে আমরা স্বপ্ন দেখি। বিজ্ঞানীরা ঘুমের গভীরতা অনুসারে নন রেম ঘুম ৪টি স্তরে বিভক্ত করেছেন। আর ঘুমের শতকরা ৭৫ ভাগই নন রেম ঘুম। ঘুমের স্তর :
স্তর-১ হালকা ঘুম
স্তর-২
স্তর-৩ গভীর ঘুম
স্তর-৪ ডেল্টা লেভেলে ঘুম
কতক্ষণ ঘুমানো দরকার
ঘুম আসলে একটি শারীরিক অভ্যাস। তাই ঘুমের পরিমাণও জনে জনে আলাদা। কেউ ২ ঘণ্টা ঘুমিয়েও সারাদিন চমৎকার কাজ করতে পারেন। আবার কারও ১০ ঘণ্টা ঘুমিয়েও তৃপ্তি নেই। দিনে যখনই সময় পান একটু ঘুমিয়ে নেন। এর কারণ জেনেটিক কোডও হতে পারে। জিন বৈশিষ্ট্য দিয়েও বংশানুক্রমিক অন্যান্য বিষয়ের ন্যায় ঘুমও প্রভাবিত হতে পারে। ডাক্তাররা মনে করে সাধারণভাবে ৪-৭ ঘণ্টা ঘুমই যথেষ্ট হওয়া উচিত। আর যারা মেডিটেশন করেন তারা ৪ ঘণ্টা ঘুমিয়েই পূর্ণ তৃপ্তির সাথে জাগতে এবং সারাদিন ক্লান্তিহীনভাবে কাজ করতে সক্ষম।
অনিদ্রা
যারা অনায়াসে গভীর নিদ্রায় ডুবে যেতে পারেন এবং পরিতৃপ্তির সাথে তরতাজা অনুভূতি নিয়ে জেগে উঠতে পারেন, তারা নিঃসন্দেহে ভাগ্যবান। আর যারা বিছানায় এপাশ ওপাশ করে রাত কাটান তারা নিঃসন্দেহে দুর্ভাগা। যাদের স্বাভাবিক ঘুম আসে না, তাদের বেশির ভাগই ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু এটা আসল সমস্যার কোন সমাধান নয়। কারণ স্নায়ুর ওপর ঘুমের ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা বাদ দিলেও বলা যায় যে, ঘুমের ওষুধ খেয়ে ননরেম ঘুমের গভীর ঘুম (ডেল্টা লেভেল ঘুম। ৩ ও ৪ স্তরের ঘুম) হয় না। ফলে ঘুমানোর পর শরীরে যে তরতাজা ভাব আসা উচিত তা আসে না। তাই ঘুমের ওষুধ খেয়ে যারা ঘুমান তাদের মধ্যে এক ধরনের ক্লান্তি সবসময় কাজ করে।
কেন ঘুম আসে না? এর কারণকে আমরা এভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি যে, ব্রেনের জাগৃতি কেন্দ্রকে পরিচালিত করে যে হরমোন তার নিঃসরণ মাত্রা হ্রাস না পাওয়া। হরমোন নিঃসরণ অব্যাহত রয়েছে, জাগৃতি কেন্দ্র সক্রিয় রয়েছে, আপনি জেগে থাকছেন। ঘুমানোর ইচ্ছা সত্ত্বেও ঘুম আসছে না। আরেকভাবে বলা যায়, ব্রেন কাজ করতে চাচ্ছে, আপনি ঘুমাতে চাইছেন। আর এই দ্বন্দ্বে ব্রেনের জাগৃতি কেন্দ্রই জয়ী হচ্ছে। কি করবেন তা হলে? এর জবাব লেখা আলিফ লায়লায়, সেই আলাদীনের গল্পে। গল্পে আছে আলাদীন যখন চেরাগ ঘষে দৈত্যকে নিয়ে আসে, তখন দৈত্য শর্ত দিয়েছিল, তাকে সারাক্ষণ কাজ দিতে হবে। কাজ দিতে না পারলে সে আলাদীনের ঘাড় মটকাবে। আলাদীন তাকে যে কাজ দেয়, দৈত্য তা সাথে সাথে সম্পন্ন করে। আলাদীন পড়ল মহা ফাঁপড়ে। এখন উপায়! দৌড়ে সে মায়ের কাছে গেল। মা তাকে বুদ্ধি বলে দিলেন। একটা কুকুর হাতে দিয়ে বললেন, দৈত্যকে বলো এই কুকুরের লেজ সোজা করে দিতে, কিন্তু লেজ যেন না ভাঙে। তারপরের ঘটনা আপনি জানেন। দৈত্য আলাদীনের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। অনিদ্রার দৈত্যকেও আপনি ইচ্ছা করলে এভাবে বশে আনতে পারেন অনায়াসে। ব্রেনকে এমন কাজ দেন যা অর্থহীন বোরিং, সমাপ্ত হওয়ার মত নয়। দেহমন ক্লান্ত হয়ে আসবে। হরমোন নিঃসরণ কমে যাওয়ায় জাগৃতি কেন্দ্র অচল হয়ে যাবে। আপনি ঘুমিয়ে পড়বেন। মনোবিজ্ঞানীরা সারা বিশ্বে এখন ওষুধের পরিবর্তে অনিদ্রার দৈত্যকে এই প্রক্রিয়ায় বশ করছেন। আপনিও প্রয়োজনে তা করতে পারেন।
সূত্র - কোয়ান্টামমেথড

