মায়ের দুধে শিশুর জন্য অত্যন্ত জরুরি এবং উপকারী ১১০টি উপাদান আছে। শিশুর রোগপ্রতিরোধ, মেধা বিকাশ এবং বেড়ে উঠতে মায়ের দুধের কোনো বিকল্প নেই। অন্যদিকে বাজারে মায়ের দুধের বিকল্প যেসব খাদ্য বিক্রি হচ্ছে তা শিশুর জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু শিশুকে বিকল্প খাদ্য খাওয়ানোর বিষয়টি সামর্থ্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তাই মাতৃদুগ্ধ বিকল্প, শিশুখাদ্য, বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুতকৃত শিশুর বাড়তি খাদ্য ও তা ব্যবহারের সরঞ্জামাদি (বিপণন নিয়ন্ত্রণ) আইনটি বাস্তবায়নের পাশাপাশি সবার মধ্যে মায়ের দুধের পক্ষে সচেতনতা গড়ে তোলাও জরুরি।
আজ সোমবার বিকেলে ‘মায়ের দুধের বিকল্প নাই, নতুন আইনের প্রয়োগ চাই’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকেরা এসব কথা বলেন। প্রথম আলো এ বৈঠকের আয়োজন করে।
বৈঠকে আলোচকেরা বলেন, বিকল্প শিশুখাদ্য খাওয়ানো নিন্দাযোগ্য। বিকল্প শিশুখাদ্য প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর আগ্রাসন মোকাবিলায় গণমাধ্যমকেও এগিয়ে আসতে হবে। আইনটির প্রচারসহ সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমকে জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে।
কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ বৈঠক আয়োজনে সহযোগিতা করে জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশন এবং জাতিসংঘ শিশু তহবিল-ইউনিসেফ। এতে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম।
বৈঠকে জানানো হয়েছে, ১৯৮৪ সালের অধ্যাদেশ রহিত করে গত বছরের সেপ্টেম্বরে মাতৃদুগ্ধ বিকল্প, শিশুখাদ্য, বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুতকৃত শিশুর বাড়তি খাদ্য ও তা ব্যবহারের সরঞ্জামাদি (বিপণন নিয়ন্ত্রণ) নামের আইনটি পাস হয়েছে। বর্তমানে আইনটির বিধিমালা তৈরির প্রক্রিয়া চলছে। আইনের আওতায় জাতীয় উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বৈঠকে স্বাস্থ্যসচিব এম এম নিয়াজউদ্দিন বলেন, শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানোর জন্য গণসচেতনতা তৈরিতে রোড শো, শোভাযাত্রাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে হবে। যেসব জায়গায় মায়ের দুধের গুরুত্বের বিষয়টি পৌঁছেনি, সেখানে পৌঁছাতে হবে। এতে করে বাংলাদেশে মায়ের দুধ খাওয়ানোর যে হার আছে তার আরও অগ্রগতি হবে।
স্বাস্থ্যসচিব বৈঠকের সুপারিশের ভিত্তিতে তা বাস্তবায়নে অর্থ বরাদ্দ থেকে শুরু করে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেন। নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি এ ধরনের উদ্যোগ নেবেন বলে উল্লেখ করেন।
শিক্ষিত সমাজ এখন সন্তানকে মায়ের দুধ খাওয়ানোর বিষয়টিতে সচেতন, উল্লেখ করে স্বাস্থ্যসচিব বলেন, ‘আমার মেয়ের বাচ্চা হাতের কাছে যা পায় তা-ই খেতে চায়। কিন্তু আমার মেয়ে তাকে খেতে দেয় না। জানতে চাইলে মেয়ে বলে, ছয় মাস হওয়ার আগে বাইরের কিছু খেতে দেওয়া যাবে না।’
বিশিষ্ট শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম কিউ কে তালুকদার শিশুর ছয় মাস বয়স পর্যন্ত বুকের দুধই যথেষ্ট, এর বাইরে পানিরও দরকার নেই বলে জানান। তিনি বলেন, বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবেই বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত। শিশুর ছয় মাসের পর থেকে দুই বছর পর্যন্ত মায়ের দুধের পাশাপাশি বাড়ির হাঁড়ির তৈরি সম্পূরক খাবার খাওয়াতে হবে। এতে করে সেই সময় এবং এরপর জীবনব্যাপীই তার ভালো থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।
এম কিউ কে তালুকদার মায়ের দুধের বিকল্প খাদ্য প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর কোনো দায়িত্ববোধ আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ‘আপনারা ব্যবসা করেন। ব্যবসা হালাল জিনিস। কিন্তু আইন লঙ্ঘন করে না—এ কথা বলা কি অন্যায় হবে?’ জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে শালদুধ খাওয়ানোসহ পুরো প্রক্রিয়ায় মায়েদের সহায়তার জন্য ‘মা সহায়ক দল’ গঠনের বিষয়ে জোর দেন তিনি।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রাণ গোপাল দত্ত বলেন, দেশে বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনে শিশু এবং প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। তাঁরা দৈনিক ২০ জন রোগী দেখার হিসাবে বছরে এক কোটি ৮০ লাখ পরিবারের সঙ্গে কথা বলছেন। তাঁরা রোগী দেখার সময় যদি বিকল্প খাদ্যের অপকারিতা তুলে ধরেন, তার চেয়ে বড় প্রচারণা আর হতে পারে না।
বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন এস কে রায় নতুন আইনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, এ ধরনের শক্তিশালী আইন তৈরির জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের প্রশংসা করছে।
এস কে রায় জানান, বিভিন্ন গণমাধ্যম বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ আইনের লঙ্ঘন করে। ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে সেসব গণমাধ্যমকে চিঠি দেওয়া হলেও গণমাধ্যমগুলো তার উত্তর দেওয়ারও প্রয়োজন মনে করেনি।
বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশনের সচিব শিশু বিশেষজ্ঞ সুফিয়া খাতুন বলেন, নতুন আইনেই আছে, স্বাস্থ্যকর্মীকে মায়েদের বিকল্প শিশু খাদ্যের অপকারিতা সম্পর্কে জানাতে হবে। অনেক মা ভাবেন, মায়ের দুধ বেশি ভালো, কৌটার দুধ একটু কম ভালো। তাই শিশু বিশেষজ্ঞসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের বিশাল ভূমিকা আছে।
জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হেদায়েতুল ইসলাম বলেন, জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের একার পক্ষে নতুন আইনের বাস্তবায়ন ও নজরদারি করা সম্ভব না। জেলা পর্যায় পর্যন্ত আইনের বাস্তবায়ন কীভাবে সম্ভব, তা সরকারকে ভাবতে হবে।
শিশু বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ আইন মানেন না 
শিশু বিশেষজ্ঞ রুহুল আমিন বলেন, ‘কিছু বিশেষজ্ঞ যাঁরা শিশুদের চিকিত্সা করেন, তাঁরাই আইনটির প্রয়োগে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ান। তাই আইন লঙ্ঘন করলে যেসব শাস্তির বিধান আছে তার প্রচার বাড়াতে হবে।’
শিশু বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ সহিদুল্লা বলেন, ‘আইনটি বাস্তবায়নে শিশু বিশেষজ্ঞদের অনেক ভূমিকা আছে। তবে আমাদের মধ্যেও কেউ কেউ এ আইনটি মানছেন না। কেউ যদি আইনের লঙ্ঘন করেন, তাঁকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।’
গণমাধ্যমের ভূমিকা
ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার-এর নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ বদরুল আহসান বলেন, গণমাধ্যম অনেক সময় বিজ্ঞাপন হাতছাড়া করতে চায় না। তাই মায়ের দুধের পক্ষে গণমাধ্যমকেও একটি সুস্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। বেসরকারি টেলিভিশন এটিএন বাংলার বার্তা প্রধান শাহানাজ মুন্নি বলেন, মায়ের দুধের বিকল্প শিশুখাদ্য প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলো বাজার খুঁজবেই। ফলে তারা বিভিন্ন কৌশলেরও আশ্রয় নেয়। গণমাধ্যমকর্মীদের কাছেও অনেক সময় এ ধরনের আইন বা অন্যান্য তথ্য থাকে না। ফলে কোন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ আইনের লঙ্ঘন হচ্ছে, তা অনেক সময় গণমাধ্যমও বুঝতে পারে না। তাই গণমাধ্যমকর্মীদের সচেতন করতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে হবে।
গড়তে হবে নতুন সংস্কৃতি
ইউনিসেফের পুষ্টি বিশেষজ্ঞ মহসীন আলী বলেন, বিভিন্ন প্রচারণার ফলে বর্তমানে সিগারেট বা তামাক গ্রহণ আর স্মার্টনেস বলে বিবেচিত হয় না। অন্যদিকে বিকল্প শিশুখাদ্য একটি প্রেস্টিজ সিম্বল, সামর্থ্যের প্রতীক বলে বিবেচিত হচ্ছে। এ ধরনের সংস্কৃতিতে আঘাত হানতে হবে। কেউ সন্তানকে বিকল্প খাদ্য খাওয়ালে তা নিন্দনীয় হবে, সে ধরনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি সব স্তরে সচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি।
মা ও তরুণ প্রজন্মকে সচেতন করতে হবে
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোস্তফা কামাল আইনটির বাস্তবায়নে গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসার জন্য আহ্বান জানান। এ ছাড়া শিশুর মায়ের সচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়টিতে তিনি জোর দেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পুষ্টি এবং খাদ্যনিরাপত্তা বিভাগের টেমপোরারি ন্যাশনাল প্রোফেশনাল ফারজানা বিলকিস মা-সহায়ক দল গঠন এবং কিশোরীদের এ বিষয়ে সচেতন করার সুপারিশ করেন। ভিটামিন এ ক্যাম্পেইনের মতো যাতে মায়ের দুধের প্রচারণা টেকসই হয়, তার জন্য সরকারকে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশনের পরিচালক খুরশীদ জাহান বলেন, বিকল্প শিশুখাদ্য প্রস্তুতকারীরা তরুণ প্রজন্মকে টার্গেট করে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ ক্ষেত্রে মায়ের দুধের প্রচারণার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনতে হবে।
ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশনের পরিচালক (প্রোগ্রাম) আফরোজা বেগমও সার্বিকভাবে মায়ের দুধের পক্ষে প্রচার বাড়ানোর সুপারিশ করেন।
সূত্র - প্রথম আলো

