কেবল শিল্পবর্জ্যের ক্ষতিকর রাসায়নিকই নয়, কর্ণফুলী নদীর পানি ও মাটি দূষিত হচ্ছে নানা প্রজাতির প্রাণঘাতি জীবাণু দ্বারা। এতে নদীর আশপাশের বাসিন্দারা আক্রান্ত হচ্ছেন নানা রোগে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস ও সমুদ্রবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের শিক্ষদের গবেষণায় এই তথ্য বের হয়ে আসে।
সম্প্রতি জাপানে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের পরিবেশ পরিস্থিতি নিয়ে চতুর্থ আন্তর্জাতিক কর্মশালায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস ও সমুদ্রবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ অহিদুল আলম ‘কর্ণফুলীর পানি ও মাটিতে ক্ষতিকর সালমোনেলা ও ভিব্রিও ব্যাকটেরিয়া উপস্থিতি’ শিরোনামে একটি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। গবেষণা প্রতিবেদনে কর্ণফুলী নদী দূষণের এই চিত্র তুলে ধরেন তিনি।
গত কয়েক বছর ধরে কর্ণফুলী নদীর পানি ও মাটিতে ক্ষতিকর অণুজীবের দূষণ নিয়ে গবেষণা করছেন ওহিদুল আলম। তাঁর গবেষণার তত্ত্বাবধান করেন একই বিভাগের প্রয়াত জ্যেষ্ঠ শিক্ষক অধ্যাপক মোহাম্মদ জাফর। এ বিষয়ে তাঁদের দুজনের একটি যৌথ গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় আমেরিকার জার্নাল অব ব্যাকটেরিউলজি রিসার্চের ২০১৩ সালের জানুয়ারি সংখ্যায়।
‘স্পেটিয়াল অ্যান্ড টেম্পরাল ভেরিয়েশন অব ই.কলাই ইন ওয়াটার অ্যান্ড সয়েল অব কর্ণফুলী’ শীর্ষক গবেষণা প্রবন্ধটিতে উল্লেখ করা হয়, কর্ণফুলীর পানির চেয়ে মাটিতে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ই.কলাইয়ের পরিমাণ দুই থেকে তিন গুণ বেশি। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ই.কলাইয়ের পরিমাণও বৃদ্ধি পায়।
এ বিষয়ে অহিদুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ই.কলাইয়ের পাশাপাশি নদীর পানি ও মাটিতে ক্ষতিকর ভিব্রিও কলেরা, সালমোনেলা, স্ট্রেপটোকক্কাস ও স্টেফাইলোকক্কাস ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। নদীর পানি ও মাটি অ্যাগার মিডিয়ায় কালচার করে এ পাঁচ ধরনের জীবাণুর সন্ধান পান তাঁরা।
অহিদুল জানান, ২০১২ সালের শুরুর দিকে মাৎস্য ও সমুদ্রবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের কিছু শিক্ষার্থীকে সঙ্গে নিয়ে কর্ণফুলীর দুই পাড়ের পাঁচ কিলোমিটার এলাকার প্রায় ১০০ পরিবারের ওপর প্রাথমিকভাবে গবেষণা চালান তাঁরা। তাঁরা দেখতে পান, প্রায় প্রতিটি পরিবারের কেউ না কেউ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। এরপর তাঁরা কর্ণফুলীর বিভিন্ন অংশের পানি ও মাটি পরীক্ষা করে ক্ষতিকর জীবাণুর সন্ধান পান।
অহিদুল আলম বলেন, কর্ণফুলীর তীরের বাসিন্দারা এর পানি ও মাটি ব্যবহার করেন। এর ফলে নীরবে তাঁদের শরীরে প্রবেশ করছে জীবাণু। ক্ষতিকর এসব জীবাণু ডায়রিয়া, টায়ফয়েড, কলেরা ও নিউমোনিয়ার মতো রোগে সৃষ্টি করে।
তিনি জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, নদীর পানিতে সালমোনেলা বা ই.কলাই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেলেই দূষণ ঘটছে ধরে নিতে হবে।
এ দুটি ব্যাক্টেরিয়া মারত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। এ ছাড়া স্ট্রেপটোকক্কাস ও স্টেফাইলোকক্কাসও পাওয়া গেছে গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি।
নদীর চাক্তাই এলাকায় দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি বলে তিনি জানান। এখানে শিল্প বর্জ্যের পাশাপাশি জৈব বর্জ্যের পরিমাণ বেশি থাকায় বিভিন্ন জীবাণু বেশি মাত্রায় বংশবিস্তার করেছে।
এই দূষণ প্রতিরোধের উপায় কী? নদী তীরের বাসিন্দারাও কী করে এর প্রকোপ এড়িয়ে চলবেন? এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ওহিদুল বলেন, এ ক্ষেত্রে নদীর পানি ও মাটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে। পানি অবশ্যই ফুটিয়ে পান করতে হবে। পাশাপাশি দূষণ প্রতিরোধে সরকারকেও ব্যবস্থা নিতে হবে। নদীতে শিল্প ও জৈব বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা গেলে এ পরিস্থিতি পাল্টাবে।
সূত্র - প্রথম আলো

