ষষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষার্থী রিয়া বৈদ্যকে (১৪) তার আর দশজন সহপাঠীর থেকে আলাদা করার উপায় নেই। তবে রিয়ার পরিচিতজনেরা জানেন তার জীবনটা রুটিনে বাঁধা। এই বয়সেই হিসাব করে খাওয়া-দাওয়া করতে হয় তাকে। নিতে হয় ইনসুলিন। বইপত্রের সঙ্গে বহন করতে হয় গ্লুকোমিটার। রক্তের চিনির পরিমাণ বাড়লকি কমল সেটা পরীক্ষা করতে হয় প্রতিদিনই।
নগরের সদরঘাট এলাকার বাসিন্দা রিয়া লড়ছে ডায়াবেটিসের বিরুদ্ধে। দশ বছর বয়েসে ডায়াবেটিস ধরা পড়লেও চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, জন্মের কয়েক বছর পরই রিয়া এই রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণে বেশ দেরিতেই তার রোগটি ধরা পড়ে।
নগরের ফয়’স লেক এলাকায় অবস্থিত ডায়াবেটিস জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানান, গত কয়েক বছরে ওই হাসপাতালে নিবন্ধিত শিশুরোগীর সংখ্যা বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। বংশ ও পরিবেশগত কারণ ছাড়াও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অপুষ্টি, মায়ের গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের কারণে শিশুদের মধ্যে এ রোগে আক্রান্তের হার বাড়ছে ।
ডায়াবেটিস জেনারেল হাসপাতালের প্রধান পুষ্টি কর্মকর্তা হাসিনা আকতারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘২০০৭ সালে আমাদের হাসপাতালে নিবন্ধিত শিশুরোগীর সংখ্যা ছিল সাতজন। ২০১১ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৫ জনে। বর্তমানে এই হাসপাতালে ৪৬০ জন নিবন্ধিত শিশুরোগী আছে। এদের ৯০ শতাংশই টাইপ ওয়ান বা ইনসুলিননির্ভর ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।’ তিনি আরও জানান, ডায়াবেটিসজনিত জটিলতার কারণে ২০০৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত ডায়াবেটিক হাসপাতালে মারা গেছে তিন শিশু।
ঝুঁকি বাড়ছে: ডায়াবেটিস ও হরমোন বিশেষজ্ঞ মাসুদ করিম জানান, গর্ভাবস্থায় মায়ের ডায়াবেটিস অনেক সময় ধরা পড়ে না। এতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর শিশু ঘন ঘন রোগে আক্রান্ত হলে অগ্ন্যাশয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর এতে শিশুর শরীরে ইনসুলিন তৈরি বন্ধ হয়ে ডায়াবেটিস দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া দূষণসহ নানা পরিবেশ ও বংশগত প্রভাবক থাকে, যার কারণে শিশুরা ইনসুলিননির্ভর বা টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়। তবে ইদানীং শিশুদের মধ্যে টাইপ-টু ইনসুলিন অনির্ভর ডায়াবেটিসও দেখা যাচ্ছে, যা বড়দের হয়। এর কারণ হলো ফাস্টফুডে আসক্তি ও শারীরিক পরিশ্রমের অভাব।
বাড়ছে আক্রান্তের হার: ঢাকার বারডেম হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ কনসালট্যান্ট ও চেঞ্জিং ডায়াবেটিস ইন চিলড্রেন (সিডিআইসি) প্রকল্পের প্রধান বেদৌরা জেবিন বলেন, ‘সারা দেশে ঠিক কত শিশু ডায়াবেটিসে আক্রান্ত তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই আমাদের কাছে। তবে আমাদের বিভিন্ন গবেষণাপত্র থেকে যে তথ্য উঠে আসছে তাতে বলা যায়, প্রতি হাজারে চার দশমিক দুজন শিশু ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এ ছাড়া টাইপ ওয়ানের পাশাপাশি বাড়ছে টাইপ টু ডায়াবেটিস।
বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা: ঠিক সময়ে ধরা পড়লে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শিশু সুস্থ থাকতে পারে। ঢাকার বারডেম কর্তৃপক্ষের সহায়তায় সিডিআইসি প্রকল্পের মাধ্যমে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতাল শূন্য থেকে ২৩ বছর বয়সের শিশুদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা, ইনসুলিন ও গ্লুকোমিটার দিচ্ছে। মাসের নির্দিষ্ট সময়ে হাসপাতালে আসার জন্য দেওয়া হচ্ছে যাতায়াত খরচ। এ ছাড়া দরিদ্র রোগীদের শিক্ষা ব্যয়ও বহন করা হচ্ছে।
সচেতন হতে হবে: ঘন ঘন প্রস্রাব, খিদে লাগা ও দুর্বলতার লক্ষণ প্রকাশ পেলে শিশুর ডায়াবেটিস পরীক্ষা করাতে হবে। এ ছাড়া গর্ভাবস্থায় প্রত্যেক মায়েরও ডায়াবেটিস পরীক্ষা করানো উচিত। জানালেন ডায়াবেটিক হাসপাতালের চিকিৎসক মো. নুরুল আবসার খান।
বারডেমের চিকিৎসক বেদৌরা জেবিন বলেন, শিশুদের মধ্যে ইদানীং টাইপ টু ডায়াবেটিস বাড়ছে অভিভাবকদের সচেতনতার অভাবে। অনেক বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ না থাকায় শিশুরা খেলতে পারে না। শারীরিক পরিশ্রম ছাড়াই তারা বড় হচ্ছে। এ ছাড়া অভ্যস্ত হচ্ছে জাঙ্ক খাবারে। এসব বিষয়ে অবশ্যই অভিভাবকদের মনোভাব পরিবর্তন করতে হবে।
সূত্র - প্রথম আলো

